রাজস্ব আহরণ ও বিনিয়োগের কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনৈতিক কর্মকৌশল প্রণয়ন করেছে। মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনা ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে। ছয় মাস রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রণীত এই কর্মকৌশলে ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক- দুই ধরনের অর্থনীতিকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্রে এসব জানা গেছে।
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত প্রায় ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এই কর্মকৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এখানে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও রাজস্ব বাড়ানোর নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক উন্নত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের নীতিনির্ধারক মহল মনে করছে, গত ছয় মাসে আর্থিক খাতে গৃহীত বেশ কিছু পদক্ষেপের ফলে দেশের অর্থনীতি অধিকতর অবনমনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। কর্মকৌশলে বলা হয়েছে, সরকারের নির্দেশনা পেশাদারত্বের সঙ্গে দক্ষভাবে অনুসরণ করলে অর্থনীতি চাঙা হবে। সরকারের আয় বাড়বে এবং বেসরকারি খাতও লাভবান হবে। এই কর্মকৌশলে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন খাত উন্মোচন হবে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
কর্মকৌশলে মোটাদাগে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল মনে করছে, কর্মসংস্থান মসৃণ করতে পারলে এমনিতেই বেসরকারি খাত স্ফীত হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত চিহ্নিত করে সেগুলো বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এই কর্মকৌশলে। এ ক্ষেত্রে সরকার আর্থিক খাত বিশ্লেষণে গত ছয় মাসের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছে। আর্থিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলো এই সময়ে চিহ্নিত হওয়ায় কর্মকৌশলে খুব নিশ্চিতভাবেই সেগুলোর প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কর্মকৌশলে দুর্নীতিগ্রস্ত লোকসানি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার জোরালো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কর্মকৌশলে সুপারিশ করা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে হলে খাদ্যসহ অন্য পণ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য স্থানীয় সরবরাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
কর্মকৌশলে স্বীকার করা হয়েছে যে, নিরীহ বিনিয়োগকারীরা বছরের পর বছর ধরে শেয়ার বাজারে ঢুকে পুঁজি হারিয়েছেন। সে কারণে ইতোমধ্যে সরকার কারসাজি বন্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। এ বিষয়ে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা এসেছে কর্মকৌশলে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি জানিয়ে বলা হয়েছে, দাম নিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে অসন্তোষ রয়েছে।
সরকারের ঋণনির্ভরতা কমাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানো দরকার উল্লেখ করে কর্মকৌশলে বলা হয়, রাজস্ব আদায় বাড়লে বেসরকারি খাতে আরও বেশি ঋণ দেওয়া সম্ভব হবে। দেশে কর ফাঁকির সংস্কৃতির কারণে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হচ্ছে। ঘুষপ্রথা চলমান থাকায় কর কমালেও ব্যবসায়ীরা কর দিতে আগ্রহী হন না। এনবিআরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনতে হবে। আগামী বাজেট আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক খাতে নির্ধারিত হার যৌক্তিক করতে হবে।
কর্মকৌশলে রাজস্ব খাতের সংস্কারে কমিশনের জমা দেওয়া প্রাথমিক রিপোর্টকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। নীতি ও আদায় ভিন্ন দুই কর্তৃপক্ষের ওপর ছেড়ে দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে তত্ত্বাবধানে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সংযুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, বিগত সরকারের কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা- এসব পেয়েছি। অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিতে গতি আনতে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। গত ছয় মাসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সামনের দিনগুলোর জন্য আরও ভালো কিছু করার পরিকল্পনা করছে।
কর্মকৌশলে বিনিয়োগ সম্পর্কিত পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন বাজার শনাক্ত করতে হবে এবং জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বর্তমানে জিডিপির মাত্র শূন্য পাঁচ শতাংশ। যেখানে বৈশ্বিক গড় ৩ থেকে ৪ শতাংশ। দেশের মধ্যে এ হার বাড়ানোর সুযোগ আছে।
অর্থনৈতিক কর্মকৌশলে ১৯টি শিল্প খাতকে সর্বোচ্চ সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহিত করা হয়েছে। এসব খাতের মধ্যে আছে মৌলিক পোশাক, ফার্মাসিউটিক্যালস (এপিআই ছাড়া), কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, আইটি-সক্ষম সেবা, উন্নত টেক্সটাইল এবং নবায়নযোগ্য শক্তি। আরও আছে অটোমোটিভ পার্টস, ফুটওয়্যার, চামড়া, ইভি ব্যাটারি, মেডিকেল ডিভাইস, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, খেলনা, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস, সেমিকন্ডাক্টর এবং প্লাস্টিক খাতও আছে অধিক সম্ভাবনাময় খাতের তালিকায়।
কর্মকৌশল প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কীভাবে আরও বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আনা যায়, তার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখানে করা হয়েছে। অর্থাৎ কর্মকৌশল ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ বৃদ্ধির একটি নির্দেশনা, একটি রূপরেখা, যা বিনিয়োগ বাড়াতে কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেবে। এ ক্ষেত্রে ১৯টি সম্ভাবনাময় খাতে এফডিআই ও দেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
কর্মকৌশলে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; রাজনৈতিক অস্থিরতা, আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা, ডলারসংকট, বারবার বিনিয়োগনীতির পরিবর্তন, সংস্থাগুলোর সক্ষমতার অভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কর কাঠামোতে বারবার পরিবর্তন, বিদ্যুৎ-জ্বালানিসংকট এবং ঋণের উচ্চ সুদহার। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনের দিনগুলোতে বিরাজমান এসব সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্টদের জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশি কিংবা বিদেশি সব ধরনের বিনিয়োগ স্থবির রয়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আর অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতার বিষয়ে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আস্থার ঘাটতিতে রয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করে কাজ করতে হবে। এমন সব পরিকল্পনা নিতে হবে যা অন্তর্বর্তী সরকারের পরে নির্বাচিত সরকার যেন বাস্তবায়ন করতে পারে।’
কর্মকৌশলে বলা হয়েছে, ‘সরকার পরিবর্তনের পরপরই শিল্পাঞ্চলে যে অস্থিরতা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, তা কিছুটা কমে এসেছে। এ অবস্থার আরও উন্নতি করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সন্তোষজনক না হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা আসবে না।’
এ বিষয়ে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়াতে সরকার আন্তরিক। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার বিষয়ে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করেছে।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সরকারকে প্রথমে ঠিক করতে হবে আগামী ছয় মাস ও একবছরে কী করা প্রয়োজন, তা নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা করা দরকার। সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো কী এবং তা থেকে উত্তরণের পথ কী হতে পারে সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’