আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে আগামী বাজেটে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানিতে বসানো হচ্ছে নতুন কর। এ ক্ষেত্রে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হবে। বেশ কিছু ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের কারণে সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চিকিৎসায় খরচ কমাতে ও এই খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্বাস্থ্য কমিশনের অনেক সুপারিশ আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন। তবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ বাস্তবায়নের মধ্যে বেশ কয়েকটি ইস্যুতে আপাতত বৈপরীত্য রয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য কমিশনের অনেক প্রস্তাবই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব জানা যায়।
এনবিআরের তদন্তে বিভিন্ন সময়ে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, চিকিৎসকদের অনেকেই সঠিক হিসেবে আয়কর জমা দেন না। তবে আগামী অর্থবছরের বাজেটেও তা আটকাতে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি কমাতে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করে অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার বিষয়েও নতুন কোনো প্রস্তাব রাখা হয়নি।
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির চাপে জীবনযাত্রার ব্যয় চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এখনই চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি। আগামী অর্থবছরের বাজেটে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদিতে অগ্রিম কর বসানো হলে হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিকদের আমদানির আগেই এসব পরিশোধ করতে হবে। ডলারসংকটের কারণে কয়েক বছর ধরে হাসপাতাল ও রোগীকে সেবা দিতে অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। যার সবটা রোগীর সেবার সঙ্গে আদায় করা হয় না। এমন পরিস্থিতিতে আবারও খরচ বাড়ানো হলে তা আমাদের পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব হবে। অনেকে হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন।’
সাবেক তত্ত্বধবায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ক্লিনিক-হাসপাতালের মালিকরা অগ্রিম করের ব্যয় রোগীর খরচের সঙ্গে যোগ করে থাকবেন বলে ধরে নেওয়া যায়। এতে অবশ্যই চিকিৎসা খরচ বাড়বে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে চিকিৎসায় বাংলাদেশে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ৭৪ শতাংশ। এটি প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ওষুধে ব্যয় হয় ৪৪ শতাংশ। গত এক বছরে হাসপাতালগুলোতে রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষার ফি, চিকিৎসকের পরামর্শ ফি ও ওষুধের ব্যয় বেড়েছে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতে জনবলের সংকটও এক বড় অন্তরায়। প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য শূন্য দশমিক ৭ জন চিকিৎসক এবং শূন্য দশমিক ৪৯ জন নার্স ও মিডওয়াইফ রয়েছেন। আবার এই স্বল্প জনবলের মধ্যে ২৪ শতাংশ পদ শূন্য (২০২১ সাল)। ডব্লিউএইচওর নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় ৭৪ শতাংশ কম চিকিৎসক, নার্স এবং মিডওয়াইফ রয়েছেন।
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয় ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ১৬ হাজার ৮৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ খাতে ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। সে বছর এই খাতে বরাদ্দ ১ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ২২ শতাংশ বাড়লেও মোট বাজেটের তুলনায় তা কমেছে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে খাতটিতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে তা ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।