দেশের অর্থনীতিতে সংকট চলছে। শিল্প-বিনিয়োগে ধস নেমেছে। রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি। আশানুরূপ বিদেশি ঋণ ও অনুদান পাওয়া যাচ্ছে না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বেড়ে যায় ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময়মূল্য। দুই বছরের বেশি হলো যা কমেনি, আরও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতির সংকট আরও বাড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা।
একই মত জানিয়ে শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে জ্বালানি খাতসহ অনেক আমদানি পণ্যের সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে এ সংকট আরও বাড়বে। এ ছাড়া প্রবাসী আয়ের বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার থেকে। যুদ্ধের কারণে এখানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট আমদানি করা পণ্যের ৩০ শতাংশই হচ্ছে জ্বালানি তেল, খাদ্য ও সার। এ পণ্যগুলোর অধিকাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি হয়।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিভিন্ন দেশে যায়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। এই প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রাতারাতি বেড়ে যাবে। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ বা ২০১৭ সালে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলার সময় তেলের দাম অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। এর প্রভাব পড়বে দেশের বাজারেও। শুধু জ্বালানি নয়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও সংকটে পড়বে। এই প্রণালি বন্ধ না হয়ে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্ববাণিজ্য ব্যাহত হবে।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মো. হাতেম বলেন, ‘এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হবে পোশাক খাতে, যা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি রপ্তানিনির্ভর। তৈরি পোশাক খাত বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস। পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি বা বাজার হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বেশির ভাগ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক বর্তমানে নেতিবাচক প্রবণতায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি জনশক্তি রপ্তানি হয় ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। যুদ্ধের কারণে জনশক্তি রপ্তানি কমবে। এ ছাড়া পাটসহ রপ্তানি আয়ের অনেক খাতের ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম বাজার ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধ চলতে থাকলে অনেক অর্ডার বাতিল হবে। ফলে এসব ব্যবসায়ে ধস নামবে। অনেক কাঁচামাল আমদানিতেও সংকট দেখা দেবে। এসব কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে সংকট বাড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, ইরান বাংলাদেশের শীর্ষ ৩০টি প্রবাসী আয়ের উৎস দেশের মধ্যে না থাকলেও হরমুজ প্রণালির পাশের দেশ ওমান বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের ষষ্ঠ বৃহত্তম উৎস। যুদ্ধপরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণ খাত, পরিষেবা খাত ও আবাসন খাত স্থবির হয়ে যেতে পারে। ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের হঠাৎ করে কাজ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।’
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এম কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুধু দুই দেশের মধ্যে হলেও প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বব্যাপী। এ যুদ্ধ ইতোমধ্যে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০২২ সালে দেশে ডলারের সংকট ও মূল্যস্ফীতিজনিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়, তার অন্যতম কারণ ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতে এখন ইরান-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে অনেক পণ্য বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে, যা অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে যে দামে বিক্রি করা উচিত, তার চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি করছেন। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে অনেক পণ্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেশি দামে আমদানি করতে হবে। আশঙ্কা করছি, আগের মতো একই ধরনের অজুহাত দেখাবেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে।’
অর্থনীতির এ বিশ্লেষক বলেন, ‘দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকবে না। দারিদ্র্য বেড়ে যাবে।
বাংলাদেশ জ্বালানি-আমদানিনির্ভর অর্থনীতি। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষত এলএনজি ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়বে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি ও খুচরা বাজারে। এতে দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং ভোক্তাপর্যায়ে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।’
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাবে। যেহেতু বাংলাদেশ জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই পণ্যটির দাম বাড়লে অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।’
গত শুক্রবার ইসরায়েলের হামলার পরপরই ইরানের আকাশ দিয়ে চলা বিমানের সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে আসে। বাংলাদেশের অনেক বিমান ইরানের আকাশসীমা ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে এ খাতেও।