“মাত্র ৩০ সেকেন্ডের জন্য আমার দুই বাচ্চা (মাইলস্টোনের শিশু শিক্ষার্থী) প্রাণে বেঁচে গেছে। স্কুল ছুটি হতেই ওদের হাত ধরে এগোচ্ছিলাম। প্রধান ফটক থেকে মাত্র ১০-১৫ গজ সামনে এগিয়েছি। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। পেছন ফিরেই দেখি এক বিভীষিকা অবস্থা। স্কুল ক্যাম্পাসে ছিন্নভিন্ন শরীর পড়ে আছে। অনেকে রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছে। কেউ আবার আগুনের স্ফুলিঙ্গ ভেদ করে বের হওয়ার চেষ্টা করছিল। ঝলসানো শরীর নিয়েই প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে দেখা যায় অনেককে। বিকট শব্দে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সময়ই হাত থেকে আমার বাচ্চারা ছুটে যায়। চোখের সামনে তখন এমন এক পরিস্থিতি, বলে বোঝানো যাবে না।
তাৎক্ষণিক দৌড়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০ শিশুকে উদ্ধার করে বাইরে আনি। এরই মধ্যে দেখি, এক পাশে আমার বাচ্চারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ভয়ে কাঁপছিল। এতটা আতঙ্কগ্রস্ত যে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিল না। সেই আতঙ্ক তাদের এখনো কাটেনি। তাদের সেই ট্রমা (মনোদৈহিক চাপ) কাটাতে স্কুলে আয়োজিত ‘কাউন্সেলিং’ (মানসিক স্বাস্থ্যগত পরামর্শ ও চিকিৎসা) করাতে এনেছিলাম।”
রবিবার (২৭ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে এসব কথা বলেন তাবাসসুম পারভীন ও তানভীর হোসেন আব্দুল্লাহ নামে দুই শিক্ষার্থীর বাবা বিল্লাল হোসেন। তাবাসসুম মাইলস্টোনের সপ্তম ও আব্দুল্লাহ প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। গতকাল এ দুই শিক্ষার্থী ছাড়াও প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থীকে মাইলস্টোন ক্যাম্পাসে আনা হয় কাউন্সেলিংয়ের জন্য। গতকাল প্রধান ফটকে কোনো কড়াকড়ি ছিল না। ফলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সেই ঘটনাস্থলটি এক নজর দেখতে গতকালও ছিল উৎসুক জনতার ভিড়। তবে ভেতরে ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণে নিষেধাজ্ঞা ছিল।
বিল্লাল হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘অল্পের জন্য বেঁচে গেছে আমার ছেলেমেয়ে। কিন্তু ওরা এত ভয় ও মানসিক আঘাত পেয়েছে যে কারণ ছাড়াই কান্নাকাটি করছে। ঠিকমতো খাচ্ছে না। স্কুলসংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানতে পেরে বাচ্চাদের মানসিক বিষয়গুলো নিয়ে কাউন্সেলিংয়ের জন্য এখানে নিয়ে এসেছিলাম। চিকিৎসকরাও বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।’
বিল্লাল আরও বলেন, ‘বাচ্চাদের কথা কী বলব, আমার নিজের মানসিক অবস্থাও ভালো না। চোখের সামনে যা দেখেছি, যে ভয়াবহতা, তা কখনো ভুলতে পারব না।’
মাইলস্টোনের দশম শ্রেণির সাজিদ এবং পঞ্চম শ্রেণির সাবির আপন দুই ভাই। সাজিদ সেদিন বাসায় থাকলেও সাবির ছিল স্কুলে। এমনকি যে ভবনে (হায়দার আলী ভবন) বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল, তার ঠিক পাশের কক্ষেই আটকে ছিল সাবির।
গতকাল কথা হয় সাজিদ ও সাবিরের বাবা রবিউল ইসলামের সঙ্গে। সাবিরের স্কুলব্যাগ নিয়ে বের হচ্ছিলেন তিনি। বাবার হাত ধরে থাকা সাবিরের চোখেমুখে ছিল ভয় বা আতঙ্কের ছাপ।
আলাপকালে বাবা রবিউল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর সাবির হাদার আলী ভবনে আটকে ছিল। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির অন্য শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসে। তা না হলে কী হতো, তা ভাবতে গেলেও চোখে পানি আসে।’
রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার আকস্মিকতায় স্কুলব্যাগসহ অন্য সরঞ্জাম সেখানে ফেলেই চলে এসেছিল সাবির। সেগুলো নিতেই আজ ক্যাম্পাসে আসা। ছেলেটি (সাবির) ঘটনার পর থেকে অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত। আগেও কম কথা বলত, এখন আরও কম বলছে। স্কুলে যাওয়ার কথা বললেই ভয় পাচ্ছে। আমরা পরিবারের সদস্যরা সাবিরকে অনেক বেশি সময় দিচ্ছি। ওর সঙ্গে গল্প করার চেষ্টা করছি, ঘোরাফেরা ও আনন্দের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছি। কেননা ট্রমা কাটাতে বাচ্চাদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো উচিত।’
উত্তরা-১১ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা ও একজন শিক্ষার্থীর মা শিমু আফরোজ বলেন, ‘প্রায় প্রতিটা বাচ্চা মানসিকভাবে আতঙ্কগ্রস্ত। বাচ্চাদের সঙ্গে আমরাও বিপর্যস্ত। যারা তাদের প্রিয় সন্তানকে হারিয়েছেন, তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমাদের জানা নেই। নিজের সন্তানকে নিয়ে হিসাব করলেই বোঝা যাবে এই ঘটনাটি কতটা বেদনাবিধুর। এই অবস্থায় আমরা বাচ্চাদের মানসিক অবস্থার দিকেই প্রধান গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় মাইলস্টোনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সদস্য খাদিজা আক্তার গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ব্র্যাকের সহযোগিতায় মাইলস্টোন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এতে অংশ নিয়েছেন। এই কার্যক্রমটি আরও কয়েক দিন চলমান থাকবে। পাঠদানের জন্য আপাতত স্কুল খোলা হচ্ছে না। শিশু শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা আগে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে হবে। স্কুল খোলার বিষয়ে আরও কয়েক দিন পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এদিকে ঘটনার ষষ্ঠ দিনেও গতকাল বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার স্থানটি ঘিরে মানুষের বেশ জটলা চোখে পড়েছে। ‘মৃত্যুপুরী’ কাছ থেকে দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মাইলস্টোনে আসেন অনেকে। উৎসুক জনতার পাশাপাশি সেদিন অল্পের জন্য বেঁচে ফেরা শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ঘটনাস্থল দেখতে আসে।
গতকাল দুপুরে আরও দেখা যায়, মাইলস্টোন স্কুলের ‘হায়দার আলী’ ভবনের সামনে বিমানবাহিনীর সদস্যরা বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ বা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহের জন্য তল্লাশি চালাচ্ছিলেন। ‘মেটাল ডিটেক্টর’ দিয়ে ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালানো হয়। সেখান থেকে কিছু আলামত সংগ্রহ করে নিয়ে গেলেও তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।
প্রসঙ্গত, গত সোমবার দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান আকস্মিকভাবে বিধ্বস্ত হয়। ভয়াবহ ওই বিভীষিকায় গতকাল পর্যন্ত ৩৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। দগ্ধ ও আহত হয়েছেন দেড় শতাধিক। যাদের বেশির ভাগই শিশু শিক্ষার্থী। মর্মান্তিক এই ঘটনায় স্বজন, শিক্ষক, সহপাঠীসহ বিভিন্ন মহলে এখনো বিরাজ করছে শোকের ছায়া।