বাঙ্গালী নদী খননে পাওয়া বিপুল পরিমাণ বালি চুরি হয়ে গেছে। চুরি হওয়া বালির বাজারমূল্য ৩২০ কোটি টাকা বলে অভিযোগ করা হয়েছে। গতকাল রবিবার বগুড়ার টিটো মিলনায়তনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মাদ আবদুল মোমেনকে গণশুনানির সময় এ তথ্য দেন স্থানীয় সাংবাদিক তানজিজুল ইসলাম স্বরন। দুদক চেয়ারম্যান বিষয়টি অনুসন্ধান করার নির্দেশ দেন এবং এ সম্পর্কে তানজিজুলকে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। তানজিজুল ইসলাম স্বরন বলেন, ‘প্রাথমিক হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যে হিসাব দিয়েছে তাতে ২১৫ কোটি টাকা মূল্যের বালি লোপাট হয়েছে।’
বগুড়া জেলা জলমহাল এবং বালু ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সাইফুল ইসলাম কয়েক মাস আগে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে এর সত্যতা স্বীকার করে বলেছিলেন, বিভাগীয় সমন্বয় সভায় বিষয়টি উত্থাপনের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি চেয়েছিলেন কিন্তু তাকে কোনো নিদের্শনা দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডব্লিউডিবি) ২০১৭ সালে বাঙ্গালী নদীতে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি নদীর প্রশস্ততা ও গভীরতা বৃদ্ধি করতে ২ হাজার ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বাঙ্গালী-করতোয়া-ফুলজোড়-হুরাসাগর নদী সিস্টেম ড্রেজিং ও পুনঃখননসহ তীর সংরক্ষণ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাখালী থেকে সিরাজগঞ্জের শাহজাহাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ি পর্যন্ত ২১৭ কিলোমিটার নদী ৩০ মিটার থেকে ১৫০ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করার পাশাপাশি এলাকাভেদে আরও ২ মিটার থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত গভীরতা বৃদ্ধি করতে তিন বছরমেয়াদি এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। কাজ শেষ না হওয়ায় সময় আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হলেও এখনো প্রায় ১০ শতাংশ কাজ বাকি আছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বগুড়া সার্কেলের একটি সূত্র জানায়, এই নদী খনন এবং নদীর ওপরে থাকা ২৮টি ব্রিজের সুরক্ষায় প্রায় ১ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকার চুক্তির পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৯০ শতাংশ কাজ শেষ করেছে। নদী খননে পাওয়া বালির মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল ২৭২ লাখ ঘন মিটার বালি। কিন্তু পাওয়া গেছে ১ লাখ ঘন মিটার বালি। যাদের জমিতে বালি রাখা হয়েছিল তাদের দেওয়া হয়েছে ৫০ শতাংশ আর বিধি অনুযায়ী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক কাজে দেওয়া হয়েছে আরও কিছু বালি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে বুঝে পাওয়া বালি বিক্রি করা হয়েছে ২০ কোটি ৩৭ লাখ টাকায়।
সারিয়াকান্দি উপজেলার জোরড়গাছা গ্রামের মো. মকবুল হোসেন মুকুল জানান, বেশ কয়েক বছর আগে ওই এলাকায় নদী খনন শুরু হওয়ার পর টানা দেড় বছর বালি তোলা হয়। মো. মকবুল হোসেন মুকুল বলেন, ‘বালির স্তূপের উচ্চতা কোনো কোনো এলাকায় দাঁড়ায় ৬০ ফুটেরও বেশি এবং সেই বালি দিনরাত বিক্রি হয়। কিন্তু কারা বালি কিনেছেন, কে বিক্রি করেছেন, তা আমরা জানতে পারিনি। আমরা জানতাম, বালি সরকারের।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই বালি বিক্রির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাদের নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হতো। স্থানীয় লোকজন এবং গৃহবধূরা অভিযোগ করেছেন, বালি তোলা শুরু হওয়ার পর তাদের নদীতে নামতেও দিতেন না বালি উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। মো. মকবুল হোসেন মুকুল আরও অভিযোগ করেন, তার ১৫ বিঘা জমি ভাড়া নিয়ে বালি রাখা হলেও সময় মতো টাকা দেওয়া হয়নি। বালির নিচে জমি চাপা পড়ে থাকায় এখনো অনেক জমিতে চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। এতে বছরে লাখ লাখ টাকার লোকসান হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছে অন্তত ১০০ মানুষ। আর বালির নিচে তাদের জমি চাপা পড়েছে অন্তত ২০০ একর। একইভাবে সোনাতলা ও ধনুটে অবৈধভাবে বিক্রি করা হয়েছে কমপক্ষে ৩০ কোটি সিএফটি বালি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, ৬৮ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার ফলে নদী থেকে বিভিন্ন ধরনের ও মানের বালি পাওয়া যায় প্রায় ১৭২ কোটি সিএফটি, যার বাজারমূল্য কমপক্ষে ৪৫০ কোটি টাকা।
অনুসন্ধান করে জানা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০-২৫টি প্রতিষ্ঠানকে এ প্রকল্পে সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ দেয়। তার মধ্যে অন্যতম মেসার্স এসএ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কন্ট্রাকশন লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির মালিক এমএম শাহাব উদ্দিন আহম্মেদ জানান, তাকে ২০০ কোটি টাকার কাজ দেওয়ার কথা বলেন আলী হায়দার রতন নামে এক ব্যক্তি। মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে সাব-কন্ট্রাক্টরদের কাছে পরিচিত মধ্যস্থতাকারী আলী হায়দার রতন তাকে ২০০ কোটি টাকার কাজ দেওয়ার কথা বলে সাড়ে ৫ কোটি টাকা নেন কিন্তু পরে তিনি আর কোনো কাজ দিতে পারেননি। এ অবস্থায় ব্যক্তিগত চেষ্টায় এমএম শাহাব উদ্দিন আহম্মেদ ১০ কোটি টাকার কাজ পান এই প্রকল্পে। এমএম শাহাব উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘এ কাজ করার জন্য ৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি।’ তিনি জানান, টাকা আদায় করতে আলী হায়দার রতনের বিরুদ্ধে ঢাকায় কোর্টে মামলা করা হয়েছে। সাব-কন্ট্রাক্টরদের বিরুদ্ধে বালি চুরি করে বিক্রির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে জানান, তার প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অনৈতিক কাজ কখনোই করেনি, এমনকি অন্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে তার কিছু জানা নেই।