রাজধানীসহ সারা দেশের অনেক আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের গুদাম। অনেক রাসায়নিকের গুদামে আগুন লেগে গত ১৪ থেকে ১৫ বছরে শতাধিক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে হাজারের বেশি। প্রতিবার আগুন লাগার পর আবাসিক এলাকায় কেন রাসায়নিকের গুদাম- তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে। সরকার চাপে পড়ে এসব গুদাম সরানোর উদ্যাগ নেয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়ন হয় না।
অভিযোগ পাওয়া যায়, রাসায়নিকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগই প্রভাবশালী। এরা বিগত দিনে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক লেনেদেন করে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর প্রক্রিয়া থামিয়ে রাখেন। সবচেয়ে বেশি রাসায়নিকের গুদাম পুরান ঢাকায়। এখানে বিভিন্ন অলিগলি ছাড়াও তেজগাঁও এবং মিরপুরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে রাসায়নিকের গুদাম। এগুলোতে ফসফেট, ক্লোরিন, ব্লিচিং পাউডারসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ মজুত করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জনবসতির মধ্যে রাসায়নিকের গুদাম থাকায় ঝুঁকিতে আছে সাধারণ মানুষ। জনবসতি থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর দায়িত্বে আছে শিল্প মন্ত্রণালয়। শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, এত দিন কী হয়েছে তা জানি না। আগে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের গুদাম কেন সরানো হয়নি তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এবারে আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরাতে সরকার কঠোর অবস্থানে।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরাতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশে আবাসিক এলাকার মধ্যে কোথায় রাসায়নিকের গুদাম আছে তার তালিকা করা হচ্ছে। এরপর এসব গুদাম সরকার নির্ধারিত জায়গায় স্থানান্তর করা হবে। এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা আছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, কোনো অবস্থায় জনবসতির মধ্যে রাসায়নিকের গুদাম রাখা যাবে না। সরকারের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হচ্ছে। আশা করি এতে কাজ হবে।
গত ১৪ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুরের গার্মেন্টস কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জন মারা যায়। হতাহত হয়েছেন অনেকে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। ১৬ বছর আগে নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মৃত্যু হয় ১২৪ জনের। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার আগুনে পুড়ে ৭১ জনের মৃত্যু হয়। এরপর পুরান ঢাকা থেকে সব রাসায়নিক গুদাম অস্থায়ী ভিত্তিতে সরিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কের শ্যামপুরে অবস্থিত উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরির জমিতে নতুন করে গুদাম নির্মাণের উদ্যোগ নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। ২০১৯ সালের ২১ নভেম্বরে ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড নামের বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গুদাম নির্মাণের কাজ শুরু করে।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনা সংকটসহ নানা কারণে নির্মাণকাজে বিলম্ব হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে সব কাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গুদামটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।
শিল্প সচিব বলেন, এরই মধ্যে শ্যামপুরে অবস্থিত উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে ৪১টির মতো রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে রাসায়নিকের গুদাম সরাতে শিল্পপার্ক করা হচ্ছে। এ শিল্পপার্কের কাজ জোরদার করা হয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে বাকি রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের চিত্রকোট ও কামারকান্দা এলাকায় ৩১০ একর জমিতে বিসিক কেমিক্যাল শিল্পপার্ক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থার কেমিক্যাল শিল্পপার্ক) নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকার বাইরে রাসায়নিক কারখানাগুলো সরিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে ২০১৯ সালে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয় এবং এর নাম দেওয়া হয় ‘মুন্সীগঞ্জ বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’। এখানে রাজধানীসহ রাজধানীর বাইরের রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলো স্থানান্তর করা হবে।
বিভিন্ন সময়ে স্থপতি ও নগরবিদরা অভিযোগ করে বলেছেন, নগরীতে আইন-কানুন, নিয়ম বিধিবিধান থাকা সত্ত্বেও এর বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষীয় তদারকিতে অবজ্ঞা, অবহেলা ও ব্যাপক দুর্নীতি রয়েছে। তাছাড়া জবাবদিহি না থাকার কারণে এই কার্যক্রমের লাগাতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এই ধাহ্য বস্তুর বিপণন, মজুত ও ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু দিনে দিনে অবৈধ রাসায়নিকের গোডাউন ছড়িয়ে পুরো শহরটাকে টাইমবোমা বানানো হয়েছে।