উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা দেশের নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। ফলে সঞ্চয় করার মতো অবস্থা নেই অধিকাংশ মানুষের। বরং সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন তারা। এতে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অনুপাতে মোট জাতীয় সঞ্চয়ের হার অব্যাহতভাবে কমছে। গত চার অর্থবছরের ব্যবধানে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ তথ্য জানা গেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা মহামারির পরপরই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পড়ে দেশের মানুষ, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এতে মানুষ সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে। মানুষের জীবনযাপন আরও কঠিন হচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে উল্লেখ করে তারা বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া মূলত মানুষের সঞ্চয়ই বিনিয়োগের প্রধান উৎস। সে জন্য সঞ্চয় কমে গেলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের ঘাটতি হতে পারে।’
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি এম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘একসময় অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বিনিয়োগের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু এখন সেটা কমে গেছে। তিনি মনে করেন, ২০২০-২১ সালে শুরু হওয়া করোনার প্রভাব ও ২০২২ সালের শুরু থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ শুরু হওয়ায় মানুষ নতুন করে সঞ্চয় করতে পারছে না। বরং আগে করা সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে।’ ন্যূনতম ভোগব্যয় করতেই এখন মানুষ চাপে পড়ছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া মূলত মানুষের সঞ্চয়ই বিনিয়োগের প্রধান উৎস।’ সে জন্য সঞ্চয় কমে গেলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের ঘাটতি হতে পারে। সেই সঙ্গে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের যে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সেটা যদি পূরণ না হয় তাহলে সরকারের বাজেট ঘাটতিও বেড়ে যাবে। এ জন্য বর্তমান সরকারকে কাঙ্ক্ষিত হারে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন তিনি।
বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অনুপাতে মোট জাতীয় সঞ্চয়ের হার দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ০১ শতাংশ, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৩০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সেই হিসাবে চার অর্থবছরের ব্যবধানে সঞ্চয়ের হার কমেছে ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় সঞ্চয়ের হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমে হয়েছিল ২৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে অবশ্য সঞ্চয়ের হার কিছুটা বেড়ে হয়েছিল ২৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আবার কমে হয়েছিল ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। আর বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এর পরিমাণ কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ০১ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, জাতীয় সঞ্চয়ের তুলনায় অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার আরও বেশি কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার দাঁড়ায় জিডিপির ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে যা ছিল ২৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ চার অর্থবছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার। এ ছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার কমে হয়েছিল ২৫ দশমিক ২২ শতাংশ। পরের অর্থবছর অবশ্য এই হার কিছুটা বেড়ে হয়েছিল ২৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও কমে হয়েছিল ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে দেশে বিনিয়োগও কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে জিডিপির ২৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৩১ দশমিক ০২ শতাংশ। অর্থাৎ, চার অর্থবছরের ব্যবধানে দেশের জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার অনেকটাই স্থবির অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ। এর আগের দুই বছরের পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সেটা আরও কমেছে।
বিবিএসের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার ছিল ৩২.০৫ শতাংশ। এ ছাড়া গত ৩০ জুন শেষ হওয়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেশের প্রাক্কলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। বিগত সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার হতে হবে ৩৬.৫৯ শতাংশ, যা অর্জন এখন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাতিল করেছে।
বিনিয়োগ এবং সঞ্চয় হ্রাসের ধারা দেখে বোঝা যায়, বিনিয়োগের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান হয়নি এবং মজুরিও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে একই হারে বাড়েনি।
জানা গেছে, করোনার অভিঘাতে ২০২০ সালে অনেক মানুষের আয় কমে গিয়েছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পরপরই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বেড়ে যায় জ্বালানি তেলের দাম। এ কারণে ২০২১-২২ অর্থবছরজুড়েই ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা এখনো বহাল রয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও পণ্যের দাম কমছে না। সেই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মানুষের আয় বাড়ছে না। মজুরি বৃদ্ধির হারও মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। এ ছাড়া ব্যাংক আমানতের সুদহারও মূল্যস্ফীতির অনেক নিচে রয়েছে। মানুষের ভরসার জায়গা ছিল সঞ্চয়পত্র, কিন্তু তার সুদও দফায় দফায় কমানো হয়েছে। এতে আনুষ্ঠানিক খাতে সঞ্চয় কমছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের হিসাব কারও কাছে নেই।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই কমছে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ। মূলত কম মুনাফার হার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংক ও ট্রেজারি বন্ডে বেশি লাভজনক বিকল্পের কারণে এই খাতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। সরকার চলতি অর্থবছর থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার আরও কমিয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হয়েছে ১ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙানোর প্রবণতা বেশি।
কেবল পরিসংখ্যান নয়, সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষই বলছে, বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে জীবন যাপন করাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় সঞ্চয় করার মতো অবস্থা সাধারণ কোনো মানুষেরই নেই। এ প্রসঙ্গে বেসরকারি চাকরিজীবী আখলিমা আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। সব মিলিয়ে ভালো বেতন পাচ্ছি। কিন্তু তারপরও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা আর সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সঞ্চয়ের হার কমার অন্যতম কারণ আয় বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া। আয় বৃদ্ধির হার কমলেও যদি ব্যয় বৃদ্ধির হার সেই তুলনায় বেশি হলে তো সঞ্চয়ের হার কমে যাবে। ব্যয় বৃদ্ধির হার না কমার অন্যতম কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। আর আয় বৃদ্ধির হার কমেছে কারণ প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার কমে গেছে। কর্মসংস্থানেও তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। তবে আশার দিক হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে; যার ফলে আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়ের হার কিছুটা বেড়েছে।
এদিকে আজ ৩১ অক্টোবর সারা বিশ্বে সঞ্চয় দিবস। ইতালীয় অধ্যাপক ফিলিপো রাভিজ্জা ১৯৩৪ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক সঞ্চয় ব্যাংক কংগ্রেসে ‘বিশ্ব সঞ্চয় দিবস’ বা ‘বিশ্ব মিতব্যয় দিবস’-এর ধারণাটির প্রস্তাব করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল অর্থ সঞ্চয় করার অনুশীলনকে উৎসাহিত করা এবং যৌক্তিক ব্যয় করা। এরপর থেকে প্রতিবছর ৩১ অক্টোবর সঞ্চয় এবং সঞ্চয়ের অভ্যাসকে গড়ে তুলতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘বিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস’ পালিত হয়। স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মতো দেশগুলো অনেক উৎসাহের সঙ্গে বিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস উদযাপন করে। ব্যক্তি, পরিবার ও জাতির কল্যাণের জন্য মানুষকে সঞ্চয়ী হওয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে এ দিবস উদযাপিত হয়। কোনো কোনো দেশে এ দিবসে সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর দিবসটি পালন করা হয়। তবে চলতি বছর জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর দিবসটি পালন করবে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেননি সংস্থাটির মহাপরিচালক রওশন আরা বেগম। তিনি খবরের কাগজকে জানান, দিবসটি পালন করা হবে কি না, তা তিনি জানেন না। তবে খোঁজ নিয়ে জানাবেন বললেও পরে তিনি আর ফোন ধরেননি। এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোতে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, সাধারণত সঞ্চয় অধিদপ্তরের আয়োজনেই দেশে দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে।