চট্টগ্রামের লালদিয়া টার্মিনাল এবং পানগাঁও নৌ-টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের কাছে হস্তান্তরে নানা মহল থেকে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার এই দুটি টার্মিনালের প্রথমটি হস্তান্তরে ডেনমার্কের এপি মোলার মায়ের্সক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস-এর সঙ্গে এবং দ্বিতীয়টি সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ-এর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে বাংলাদেশ। কিন্তু তড়িঘড়ি করে সই করা এই চুক্তির ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং সংশ্লিষ্ট মহল। এ নিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাসহ বিভিন্ন জায়গায় মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ করে এর নিন্দা জানিয়েছে রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট পক্ষ।
ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডের কাছে বাংলাদেশের এই দুটি টার্মিনাল হস্তান্তরে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ চুক্তির অসঙ্গতি বা বিতর্কিত বিষয়গুলো তুলেছে ধরেছেন। তাদের মতে, এই চুক্তিটি গোপনে করায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং সঠিক যাচাই-বাছাই ছাড়া অস্বাভাবিক দ্রুততায় চুক্তি সম্পন্ন করায় এতে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া এই চুক্তির কারণে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং বিদ্যমান বন্দর জেটি অকার্যকর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞ, বন্দর ব্যবহারকারী এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকে সমালোচনার পাশাপাশি চুক্তিটি বাতিল করার দাবি উঠেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে- এই চুক্তি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে, বন্দরের সক্ষমতা বাড়াবে এবং এতে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে। তবে চুক্তির বিষয় ও অসঙ্গতি নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এ নিয়ে গতকাল ঢাকায় বাংলাদেশ জাসদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এবং চট্টগ্রামে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ মশাল মিছিল করে বিক্ষোভ জানিয়েছে। হেফাজতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও সরকারের এই পদক্ষেপে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
এ নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, চুক্তির এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বাংলাদেশের বন্দর খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। এতে সরকারের মূলধনী ব্যয় কমবে। তিনি জানান, বন্দরটির মালিকানা থাকবে সিপিএর হাতে। তবে নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস ও তাদের স্থানীয় অংশীদার। বর্তমানে ৩৩টি দেশে ৬০টির বেশি টার্মিনাল পরিচালনাকারী এপিএম টার্মিনালস বিশ্বব্যাপী শীর্ষ টার্মিনাল অপারেটরদের অন্যতম। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তালিকায় বিশ্বের সেরা ২০টি বন্দরের মধ্যে ১০টিতেই তারা কাজ করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র চট্টগ্রামের লালদিয়া এবং পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের কাছে হস্তান্তরে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। এতে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিদেশিদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে বলে মনে করেন তিনি। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাইলে এ ধরনের কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনাল হস্তান্তরের কারণ হিসেবে বেশ কিছু ঘাটতি বা চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়। পানগাঁও টার্মিনালটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় ছিল। উচ্চ পরিবহন খরচের কারণে ব্যবসায়ীরা টার্মিনালটি বাদ দিয়ে সড়কপথে মালামাল পরিবহন করেছেন। টার্মিনাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো কোনো সময় নৌপরিবহন খরচ রেলপথের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি ছিল। এ ছাড়া আমদানি করা পণ্য খালাসে কাস্টমস-সংক্রান্ত জটিলতা এবং দীর্ঘসময় লাগার কারণে ব্যবসায়ীরা এই বন্দর ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হতেন। পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা ও আধুনিকীকরণের অভাবেও বন্দরটি পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। এতে প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং অন্য অবকাঠামোগত সুবিধার ঘাটতি ছিল। পণ্য পরিবহনে বিলম্ব, কাস্টমস হয়রানির কারণে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে পানগাঁও বন্দর ব্যবহারের প্রতি আস্থার অভাব তৈরি হয়েছিল। অনেক শিপিং এজেন্ট তাদের নিয়মিত রুটিন নেটওয়ার্কে পানগাঁওকে গন্তব্যস্থল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেননি, যার ফলে আমদানিকারকদের পণ্য খালাসের জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার সময় নথিপত্রে পরিবর্তন আনতে হতো। প্রতিষ্ঠার এক দশকেরও বেশি সময় টার্মিনালটির ধারণ ক্ষমতার মাত্র ২০ ভাগের কম ব্যবহৃত হচ্ছিল।
বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা গোপনে টার্মিনাল হস্তান্তরের চুক্তি করায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক দ্রুততায় বিদেশি কোম্পানির হাতে কনটেইনার টার্মিনাল তুলে দেওয়া জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি। কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে জিটুজি পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই যেভাবে এই চুক্তি করা হয়েছে তাতে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চার সভায় বাম নেতারা গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বলেন, শেখ হাসিনার রায়ের দিন মানুষের দৃষ্টিকে ব্যস্ত রেখে তাড়াহুড়ো করে গোপনে ডেনমার্কের সঙ্গে বন্দর ইজারা চুক্তি করেছে সরকার। এ ঘটনা দেশ-জাতি ও রক্তস্নাত ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। দেশের স্বার্থের বিপরীতে স্বদেশকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের লীলাভূমিতে পরিণত করতে চায় সরকার। এ ধরনের চাতুর্যপূর্ণ প্রতারণার ক্ষেত্রে ইউনূস সরকার অতীতের সব স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্টকে হার মানিয়েছে।
বন্দর রক্ষায় মশাল মিছিল ও সড়ক অবরোধ
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটিসহ) কোনো অংশ বিদেশিদের হাতে তুলে না দেওয়ার দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
গতকাল সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মহানগরের বড়পুল থেকে নয়াবাজার এলাকায় ‘বন্দর রক্ষা পরিষদ’ নামক ব্যানারে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালিত হয়। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- ‘সিসিটি-এনসিটি বিদেশিদের হাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল কর, করতে হবে।’