চট্টগ্রাম বন্দরের দুটি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিদেশিদের। গত সোমবার ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডের দুই বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঢাকায় চুক্তিও সম্পাদিত হয়েছে। এতে চট্টগ্রামে বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একটি মহল এই চুক্তি সমর্থন করলেও আরেকটি পক্ষ শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা এলাকায় লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ডেনমার্কের এপি মোলার মায়ের্সক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। অপরদিকে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মেডলগ এসএ।
চুক্তি অনুসারে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং ৩০ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠানটি। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় এ টার্মিনাল নির্মাণের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ৫৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। চুক্তিটি স্বাক্ষরের পরপরই ২৫০ কোটি টাকা ‘সাইনিং মানি’ হিসেবে পেয়েছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান পানগাঁও নৌ টার্মিনালটি ২২ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। এ টার্মিনালে মোট ৪ কোটি ডলার বা প্রায় ৪৯০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে মেডলগ। এ ক্ষেত্রে সাইনিং মানি হিসেবে তারা বাংলাদেশকে দিয়েছে ১৮ কোটি টাকা।
চুক্তি দুটিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ, গ্রিন পোর্ট নির্মাণ, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বিবেচনায় বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটি পক্ষ এই চুক্তিকে সমর্থন করছে।
অপরদিকে আরেক পক্ষ বলছে, বছর খানেক আগে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিল সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কোনো সফলতা বা লাভের মুখ দেখাতে পারেনি। সোমবার অনুষ্ঠিত চুক্তির বিষয়ে সরকার গোপনীয়তা বজায় রেখেছে। চুক্তির শর্ত, দেশ কীভাবে আর কতটা লাভবান হবে; এসব বিষয় প্রকাশ করা হয়নি।
পাশাপাশি লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনালের অবকাঠামো নির্মাণ ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এনে সেগুলো বসানো বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তিন বছর লেগে যাবে এগুলো ব্যবহারের উপযোগী করতে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও সেবার কারণে বাড়তি অর্থও দিতে হবে ভোক্তাকে।
চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘আমরা সব সময় বন্দরের উন্নয়নের জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই। তবে এখানে যাতে কেউ ব্যক্তিগতভাবে লাভবান না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ এলে কীভাবে দেশ লাভবান হবে, তার একটা রূপরেখা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। বিদেশ থেকে যে বিনিয়োগকারীরা আসছেন, তারা শুধু চট্টগ্রাম বন্দর নয়, বিশ্বের অন্য দেশেও বিনিয়োগ করেছেন। এভাবে বিদেশি বিনিয়োগ এলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।’
শিপিং অ্যাজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘এই চুক্তি আমরা সমর্থন করি। এটা অবশ্যই ভালো সিদ্ধান্ত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে চুক্তির বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়নি। যেমন ৫০০-৭০০ লোক চাকরি করবেন। এরা কারা? দেশের নাকি বাইরের কেউ? চুক্তির মেয়াদ বাড়বে কি না, সাইনিং মানি কবে পাবে? ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? এসব বিষয় স্পষ্ট না। স্বচ্ছতা নেই। চুক্তির এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত ছিল। তাহলে চুক্তিতে কোনো দুর্বলতা থাকলে সে বিষয়ে সংশোধন করে দেওয়ার সুযোগ থাকত।’
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের বিভাগীয় সদস্য আনোয়ারুল আজিম রিংকু বলেন, ‘এই চুক্তি নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। এটা ভালো হবে বন্দরের জন্য, দেশের জন্য। তবে আমাদের মূল উদ্বেগ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে। কারণ এটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই টার্মিনালটি বিদেশিদের দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা সব সময় এর বিরোধিতা করেছি, করে যাব।’
সিঅ্যান্ডএফ অ্যাজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী ইমাম মাহমুদ বিলু খবরের কাগজকে বলেন, ‘এরা বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। এদের বিনিয়োগ সক্ষমতা ভালো। এরা দায়িত্ব নিলে বিনিয়োগও বেশি করতে পারবে। জেটি তৈরি করা, যন্ত্রপাতি বসানো, সবকিছু তারাই করবে। কিন্তু তারা যে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবে, সেগুলো বানানো থাকে না। এগুলো অর্ডার দিয়ে বানিয়ে আনতে এক বছরের বেশি সময় লাগবে। এটা দীর্ঘমেয়াদি ও সময়সাপেক্ষ বিষয়। আমরা ছোট দেশ। আমাদের বন্দর বেশি নেই। আমরা বন্দর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে যদি কাজগুলো করতে পারতাম, তাহলে ভালো হতো। কারণ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালও একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছিল। কোনো লাভ আমরা দেখিনি।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের কয়েকজন অর্থনীতিবিদের বক্তব্য নিতে চাইলে তারা কথা বলতে রাজি হননি।