চার হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বিপুল অঙ্কের সেই প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠেছে। সেই প্রজেক্ট কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে তার সার্বিক মূল্যায়ন করতে পৃথক দরপত্র আহ্বান করা হয়। কার্যকরীভাবে প্রকল্পের কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেখানেও সরকারি ক্রয়নীতি অনুযায়ী যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়নি, বরং সর্বোচ্চ র্যাঙ্কধারী দরদাতার চেয়ে তিন গুণ বেশি দরদাতা পিএমআইডিকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এক অনিয়ম ঢাকতে করা হয়েছে আরেক অনিয়ম। এই কাজটি করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। প্যাকেজ S-6A (এস-সিক্সএ) বা ‘কনসালটেন্সি সার্ভিস ফর ফাইনাল ইমপ্যাক্ট ইভাল্যুয়েশন’ প্যাকেজেও অন্যান্য প্যাকেজের মতো ঘটেছে একই ঘটনা।
টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল প্রপোজাল বিচার বিশ্লেষণে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে কাজ পাওয়ার জন্য উপযুক্ত হয় সমাহার কনসালট্যান্টস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তবে কাজের জন্য সর্বনিম্ন দর দিয়েও কাজ পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। ‘রহস্যজনক’ কারণে সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিং প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে অ্যাওয়ার্ডেড করা হয়েছে তিন গুণের অধিক দর দেওয়া প্রতিষ্ঠান পিএমআইডিকে। গত ১৮ ডিসেম্বর এটি নিশ্চিত করা হয়। এতে সরকারের ক্ষতি হচ্ছে দেড় কোটি টাকার বেশি।
পিএমআইডিকে কাজ দেওয়ার জন্য লাইভস্টক সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে অবৈধ পথ অবলম্বনের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট মূল্যায়নের সময় থেকে শুরু করে কর্তৃপক্ষ অন্যায়ভাবে পিএমআইডিকে টেকনিক্যাল স্কোরে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৯৮ দশমিক ৪৩ নম্বর দেয়। লিটারারি রিভিউয়ের মতো চ্যাপ্টারে এত নম্বর দেওয়া বাস্তবভিত্তিক নয় এবং অসম্ভব। এভাবেই অবৈধভাবে অনেক নম্বর দিয়ে স্কোর বাড়িয়ে পিএমআইডিকে সামনে নিয়ে আসা হয়। তবে ফাইন্যান্সিয়াল প্রপোজালে পিএমআইডির দর সমাহার কনসালট্যান্টস লিমিটেডের চেয়ে দেড় কোটি টাকার বেশি হওয়ায় কিউসিবিএস পদ্ধতিতে সরকারি ক্রয়নীতিমালা অনুসারে পিএমআইডি কাজটা পায়নি। পিএমআইডি কাজটা না পাওয়ার ফলে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট বা পিএমইউ এবং মূল্যায়ন কমিটি নানাবিধ অপকৌশল নেয়, যা সরকারি ক্রয়নীতি বিরুদ্ধ।
এদিকে সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাজ না পাওয়ায় সরকার ও বিশ্বব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় অভিযোগ জমা দেয় সমাহার। তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়। এরপর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সমাহারকে ডেকে দরপত্র পুনরায় মূল্যায়নের নামে নানাবিধ হয়রানি শুরু করেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পটি (এলডিডিপি) বাস্তবায়ন হচ্ছে মোট ৪ হাজার ২৮০ কোটি ৩৬ লাখ টাকায়। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ হচ্ছে ৩ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা ও সরকারি কোষাগার থেকে খরচ ধরা হয় ৩৯৫ কোটি টাকা। প্রথমে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ৫ বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে সংশোধন করে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা বা আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। আর বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৭৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। বিপুল ব্যয়ের পরও নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ না হওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।
পার্বত্য তিন জেলা ছাড়া প্রকল্প এলাকা হচ্ছে ৬১টি জেলার ৪৬৫টি উপজেলা ও সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল উন্নত খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ, প্রাণিস্বাস্থ্য এবং কৃত্রিম প্রজনন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে খামারি পর্যায়ে বিদ্যমান প্রতিটি গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা ২০ শতাংশ বাড়ানো। সাড়ে ৬ হাজার প্রাণিজাত পণ্য উৎপাদনকারী সমিতি (প্রডিউসার অর্গানাইজেশন) গঠন এবং পণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে মার্কেট লিংকেজ ও ভ্যালু চেইন ব্যবস্থার উন্নয়ন। নিরাপদ প্রাণী ও প্রাণিজাত পণ্য উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উন্নত করা।
সার্বিক ব্যাপারে জানতে প্রকল্প পরিচালক ড. মো মোস্তাফা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে দায়িত্ব নিয়েছি। সার্বিক ব্যাপারে বলা মুশকিল। উপপ্রকল্প পরিচালক ড. মো. শাফিক-উল-আযমের সঙ্গে কথা বললে ভালো হয়।’
ড. মো. শাফিক-উল-আযমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সর্বোচ্চ র্যাঙ্কধারী দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি বিশ্বব্যাংকের টাকায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সব নিয়ম মেনেই টেন্ডার আহ্বান করে সব কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্প মূল্যায়নের কাজটিতে সর্বোচ্চ র্যাঙ্কধারী দরদাতা হয় সমাহার কনসালট্যান্টস লিমিটেড। তবে তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে পারেনি।’
এ বিষয়ে সমাহারের প্রধান নির্বাহী মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই ক্রয়সংক্রান্ত সব নীতিমালা অনুসরণ করে দরপত্রে অংশগ্রহণ করি। শাফিক-উল-আযমের বক্তব্য সত্য নয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। টেকনিক্যাল এবং ফাইন্যান্সিয়াল প্রপোজাল মূল্যায়ন করে ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পরে শুধু এককভাবে সমাহারের কাছ থেকে নতুন করে কোনো কাগজপত্র চাওয়ার সরকারি নিয়মানুযায়ী কোনো সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও নিয়মবহির্ভূতভাবে হয়রানি করার জন্য কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে।’ তিনি উল্টো প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আমরা কাগজপত্র দিতে না পারলে দরপত্র প্রক্রিয়ার শুরুতে শর্ট লিস্টে এলাম কী করে? কাগজপত্র ঠিক না থাকলে টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল মূল্যায়নে সর্বোচ্চ র্যাঙ্কধারী প্রতিষ্ঠান হলাম কী করে? তারপরও অনৈতিকভাবে ও বেআইনিভাবে আমাদের কাজ দেওয়া হয়নি। সে কারণে আমরা অভিযোগ করেছি। বিশ্বব্যাংকের চাপে প্রাণিসম্পদ কর্তৃপক্ষ আমাদের ডেকে পুনর্মূল্যায়নের নামে হয়রানিমূলক আচরণ করে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘পিএমইউ-২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট S-6A-এর চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য একটি নেগোসিয়েশন সভায় সমাহার কনসালট্যান্টস লিমিটেডকে আমন্ত্রণ জানায়। আমন্ত্রণপত্রে সমাহার প্রস্তাবিত সব বিশেষজ্ঞ এবং প্রাসঙ্গিক নথিপত্র নিয়ে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আমরা সেখানে যথাযথভাবেই উপস্থিত হই। কর্তৃপক্ষ সেখানে যাচাই-বাছাই করে। পিএমইউ টিম এবং প্রকিউরমেন্ট কনসালট্যান্ট মূল বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি ও নথিপত্র যাচাই করে এবং নিশ্চিত করে যে সব নথিপত্র ঠিক আছে।
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় নীতিমালার ধারা ৬০ অনুসারে, প্রস্তাব (প্রপোজাল) মূল্যায়ন কমিটি চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য নেগোসিয়েশন সভায় বাস্তবায়ন কৌশল, কর্মপরিকল্পনা এবং প্রশিক্ষণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চুক্তিভিত্তিক পরামর্শদাতার সঙ্গে প্রাক-চুক্তিভিত্তিক আলোচনা করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ওই সভায় নেগোসিয়েশন প্রক্রিয়া পরিচালনা করার পরিবর্তে ক্রয় পরামর্শদাতা হঠাৎ করে বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় নিয়মের ধারা ৬০ লঙ্ঘন করে আগ্রহ প্রকাশের (EOI) নথি মূল্যায়নে নেমে পড়েন। কারণ EOI প্রক্রিয়াটি পূর্বেই যাচাই-বাছাই করা হয়েছে এবং ক্রয় প্রক্রিয়ার শুরুতে সংশ্লিষ্ট কমিটি কর্তৃক যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এটি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এবং অন্যান্য পিএমইউ কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে সভার ফলাফলকে হেরফের করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়, যাতে তারা পূর্বনির্ধারিত ফার্মকে (পিএমআইডি) অ্যাওয়ার্ডেড করতে পারে। এটি অসাধু ও নীতি-বিরুদ্ধ আচরণ, যা সরকারি ক্রয় নীতিমালার ধারা ৬০ এবং ‘বিশ্বব্যাংকের নির্দেশাবলি’-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, “সভায় উপস্থিত পিএমইউ প্রতিনিধিরা পিপিআর মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের অংশগ্রহণকে দুর্বল করে তুলেছেন। তারা আমাদের যোগ্য পরামর্শদাতাদের অসম্মান করেছেন। তারা নিশ্চিত করে বলেছেন যে তারা পিপিআর দ্বারা আবদ্ধ নন এবং ‘বিশ্বব্যাংকের নির্দেশাবলি’ মেনে কাজ করছেন। যদি পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন হতো, তবে এটি একটি নবগঠিত পিইসি দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত ছিল এবং সব প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ন্যায্যভাবে প্রয়োগ করা উচিত ছিল, বেছে বেছে নয়।”
এদিকে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সব প্রস্তাবের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করেছে এবং বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় বিধিমালায় বর্ণিত মান ও ব্যয়ভিত্তিক নির্বাচন (কিউসিবিএস) পদ্ধতি অনুসারে সমাহার কনসালট্যান্টস লিমিটেডকে সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিং ফার্ম হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। তাই ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট নেগোসিয়েশন সভার পর, সমাহার কনসালট্যান্টস লিমিটেডকে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো ছিল বাধ্যতামূলক। তবে অবৈধভাবে পিএমআইডিকে কাজ দেওয়ার জন্য অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে, যা ‘বাংলাদেশ সরকারের ক্রয় নীতিমালা’ এবং ‘বিশ্বব্যাংকের অ্যান্টিকরাপশনবিষয়ক নির্দেশাবলি’-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।