যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের আওতায় ইকোনমিক এক্সিলারেশন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ফর নিট (আর্ন) প্রকল্পের আওতায় এনজিও (সার্ভিস প্রোভাইডার) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্কুল-কলেজের ঝরে পড়া ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী জনগোষ্ঠী, যারা বর্তমানে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত নয়–এমন কয়েক লাখ শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের আওতায় আর্ন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা যুবকদের, বিশেষ করে নারীদের দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর।
প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ এই প্রকল্পে এনজিও ও ফার্ম নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক এনজিওর শীর্ষ কর্মকর্তারা। প্রকল্পটি ২০২৩-এর জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু আড়াই বছর চলে গেলেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি। এ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। আর্ন প্রকল্পে সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে এনজিও নিয়োগের জন্য সারা দেশকে ১০টি প্যাকেজে ভাগ করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। আর্ন প্রকল্পের আওতায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ও প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিজি ও পিডি তাদের পছন্দের বিভিন্ন এনজিওকে রেসপন্সিভ করার পাশাপাশি যোগ্য অনেক প্রতিষ্ঠানকে নন-রেসপন্সিভ করেছেন। সরকারি ক্রয়নীতি অনুযায়ী উন্মুক্ত টেন্ডারে কোয়ালিটি অ্যান্ড কস্টবেজড সিলেকশন (কিউসিবিএস) পদ্ধতিতে এনজিও নিয়োগ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রতিটি এনজিও সমযোগ্যতাসম্পন্ন, যা বিশ্বব্যাংক ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের করা সংক্ষিপ্ত তালিকা অনুমোদনের মাধ্যমে স্বীকৃত হয়েছে। তাই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সবার জন্য সমদৃষ্টির মাধ্যমে টেকনিক্যাল প্রপোজাল মূল্যায়নের কাজটি করার সরকারি নিয়ম থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে সরকারি ক্রয়নীতিকে অবজ্ঞা করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ১০টি প্যাকেজের জন্য ২৮টি এনজিওকে যোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে শর্টলিস্ট করে বিশ্বব্যাংক ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। দ্বিতীয় ধাপে প্রতিটি এনজিওর টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল প্রপোজাল যাচাই-বাছাই করা হয়। ইভালুয়েশন শিটে পাস করা বহু এনজিওকে ফেল দেখিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই কাজটি করেছেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি)।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইভালুয়েশন প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণদের মধ্যে রয়েছে টিএমএসএস, ভিওএসডি, রিক, ডর্প, সমাহার, কারিতাসসহ আরও বেশ কয়েকটি এনজিও। তবে এই এনজিওগুলো ইভালুয়েশন প্রক্রিয়ায় পাস করলেও ফেল দেখিয়ে চিঠি দেওয়া হয়। ইভালুয়েশন কমিটির পাঁচ সদস্যই ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ফলাফল মূল্যায়ন প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেন। মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় পাস মার্ক সর্বনিম্ন ৭০ রাখা হয়। সেখানে দেখা গেছে ৯.৩ প্যাকেজে উত্তীর্ণ হয় সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল (৭১.৪৭ নম্বর), সমাহার (৭০.১৭ নম্বর) ও আহছানিয়া মিশন (৭৬.৯৯ নম্বর)। তবে রেজাল্ট শিটে পাস করার পরও বেশ কয়েকটি এনজিওকে অনুত্তীর্ণ দেখিয়ে চিঠি দেওয়া হয়। এই প্যাকেজের ক্ষেত্রে সমাহারকে ৬৪ দশমিক ৬৭ নম্বর দিয়ে অনুত্তীর্ণ দেখিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে প্যাকেজ ১৩-এর ক্ষেত্রেও। সেখানে উত্তীর্ণ হয় ব্র্যাক (৭৪.৪৪ নম্বর), সমাহার (৭১.১৭ নম্বর) ও সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল (৭২.৮১ নম্বর)। এই প্যাকেজেও রেজাল্ট শিটে পাস করার পরও সমাহারকে ৬৮ দশমিক ১৭ নম্বর দিয়ে অনুত্তীর্ণ দেখিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে একই ঘটনা ঘটেছে প্যাকেজ ১১ ও ১২-এর ক্ষেত্রেও।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বলেছে, বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় তারা এ কাজ করেছে। তবে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে কখনো অন্যায় যুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার নজির নেই। প্রস্তাব মূল্যায়ন করে প্যাকেজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের ইচ্ছামতো ফল পরিবর্তন করে রেজাল্ট শিট তৈরি করে বিশ্বব্যাংকের ওপর দায় চাপিয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংক সব সময়ই যেকোনো ধরনের অনিয়মের বিরোধী।
এই টেন্ডারে কর্তৃপক্ষ নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে পছন্দের এনজিওগুলোকে কাজ দিতে অনৈতিকভাবে বাজেট প্রস্তাব খুলে দেখেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী এনজিওদের সামনে বাজেট উন্মুক্ত করার কথা ছিল। তবে যোগ্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাজকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে ভেবেই অনেক প্রতিষ্ঠানকে আগেই অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। টেন্ডরে প্রতি প্যাকেজে সাত-আটটি এনজিও টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল প্রপোজাল জমা দেয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ পছন্দের দু-তিনটি এনজিওকে রেসপন্সিভ করে বাকি সবগুলো যোগ্য এনজিওকে নন-রেসপন্সিভ করে দিয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ডিজি ও পিডি সমন্বিতভাবে এই অপকর্ম করেছেন। টেকনিক্যাল প্রপোজাল মূল্যায়নে প্রতিটি এনজিও ৮৫-৯২ নম্বর পর্যন্ত পায়। অভিযোগ রয়েছে, অনৈতিকভাবে মূল্যায়নের ফলাফলকে অবজ্ঞা করে ভালো এনজিওগুলোকে নন-রেসপন্সিভ করা হয়। নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করলে এর সত্যতা পাওয়া যাবে।
এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিব কাজী মোকলেসুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রথম মূল্যায়নে বিশ্বব্যাংকের গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়নি। প্রকল্প আগে শুরু হলেও কাজ তেমন হয়নি। আমি প্রকল্পের দায়িত্বে নতুন হওয়ায় অসাবধানতাবশত ও অনিচ্ছাকৃতভাবে এই ভুল হয়েছে।’ কাজের অগ্রগতির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সার্ভিস প্রোভাইডার নিয়োগই প্রথম কাজ। আমরা এটি করেছি। বিভিন্ন প্যাকেজে টেকনিক্যাল মূল্যায়নের কাজটি হয়েছে। আসল কাজ হয়েছে। তারা কাজ শুরু করে। দেরি যা হওয়ার হয়ে গেছে। আর হবে না। এ পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি ২ শতাংশ হয়েছে।’