আমেরিকান সিরিয়াল কিলার ডেনিস রাডারের কথা বলছি, যিনি ‘BTK’ কিলার নামে কুখ্যাত। "বিটিকে" ডাকনামটি তৈরি হয়েছিল তার হত্যাকাণ্ডের ধরণ "বাঁধো, নির্যাতন করো, এরপর হত্যা করো" থেকে।
এই আমেরিকান সিরিয়াল কিলার ১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে ক্যানসাসের উইচিতায় অন্তত দশটি ধারাবাহিক নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং কমপক্ষে ছয়টি হত্যা চেষ্টা করেন। ধরা পড়ার আগে কেউ ঘুণাক্ষরেও কোন দিন ভাবতে পারেনি এই ছাপোষা মানুষটি আসলে একজন ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার।
এমনকি ধরা পড়ার আগে নিজের স্ত্রী-সন্তানদের কাছে তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত স্বামী এবং পিতা। আর দশ পাঁচ সাধারণ নাগরিকের মতোই তিনি একটি চাকরি করতেন। এমনকি তিনি একটি গির্জা পরিচালনা কিমিটির সদস্য হিসেবেও ছিলেন আন্তরিকভাবে সক্রিয়।
কিন্তু এতগুলো খুন করেও বিটিকে কয়েক দশক কৌশলে গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হন। তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং মিডিয়াকে তার অপরাধের বিস্তারিত চিঠি দিয়ে কটূক্তি করতে খুব পছন্দ করতেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন অপতথ্য সরবরাহ করে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ভিন্ন পথেও পরিচালনা করতেন।
রাডারের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল ওটেরো পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে, যেখানে তিনি চার জনকে বেঁধে, নির্যাতন করে হত্যা করেন।
রাডার তার নির্বাচিত শিকারদের জন্য তাদের বাড়িতেই অপেক্ষা করতেন। শিকার বাড়িতে আসার পর, তাদের বেঁধে সীমাহীন নির্যাতন করে তারপর শ্বাসরোধ করে হত্যা করতেন।
এরপর তিনি প্রেস বা আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়ে এবং ফোন করে এসব হত্যাকাণ্ডের তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা উপভোগ করতেন। বেশিরভাগ সময় তিনি নিজেই পুলিশকে তার খুনের খবর দিতেন।
এভাবে তিনি উইচিটা বাসিন্দাদের আতঙ্কিত করে তুলতে ভালোবাসতেন। অথচ তারা ইতোমধ্যেই তাদের আশেপাশের এলাকায় একজন অজানা সিরিয়াল কিলারের ভয়ে ভীত ছিলেন।
প্রায়শই, অপরাধ সংগঠিত হওয়ার জায়গা থেকে জিনিসপত্র হারিয়ে যেত। যা ইঙ্গিত দিত যে, হত্যাকারী তার অপরাধের স্মৃতিচিহ্নগুলো সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিল।
এমনকি কিছুক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করতে এই সিরিয়াল কিলার ক্রাইম স্পটে বীর্য ফেলে যেতো। অথচ ময়নাতদন্ত করে জানা যায়, ভিক্টিমদের কোন ধরনের যৌন নির্যাতন করা হয়নি।
এরমধ্যে, ১৯৭৪ সালে খুন যত দ্রুত পরপর অনেকগুলো হত্যাকাণ্ড ঘটে, ১৯৭৯ সালে হুটকরে তা থেমে যায়।
এরপর, ২০০৪ সালে, অদ্ভুত উপায়ে উইচিটার ঈগল দিয়ে পাঠানো একটি চিঠিতে ১৯৮৬ সালের একটি হত্যার দায় স্বীকার করার পর তদন্ত পুনরায় চালু করা হয়।
এরমধ্যে রাডার তার প্রথম খুনের ত্রিশতম বার্ষিকীর আগে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে একটি নতুন বই প্রকাশের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
একই বছর, রাডার ক্যাথেরিন র্যামসল্যান্ড নামের একজন লেখককে অপরাধ সম্পর্কে একটি বই লেখার কাজে সহযোগিতা করছিলেন। সেই বই প্রকাশের পর, জানা যায় বইটির প্রায় ৮০ শতাংশই রাডারের নিজের ভাষায় ছিল।
"কনফেশন অফ আ সিরিয়াল কিলার: দ্য আনটোল্ড স্টোরি অফ ডেনিস রাডার, দ্য বিটিকে কিলার " বইটি ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।
এল ডোরাডো সংশোধনাগারে বন্দী অবস্থায় কারাগার থেকে একটি চিঠিতে, রাডার জানান, তিনি এই সহযোগিতাকে একজন সিরিয়াল কিলারের মনের মধ্যে আরও বেশি অন্তর্দৃষ্টি প্রদানের মাধ্যমে সমাজের প্রতি তার ঋণ পরিশোধের প্রচেষ্টা হিসাবে দেখেছিলেন।
বইটিতে বিটিকে হত্যাকাণ্ডের নতুন বিবরণ প্রকাশিত হলে ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে রাডার আবার খবরের শিরোনামে আসেন।
একজন তদন্ত কর্মকর্তা ২০০৪ সালে রাডারের জমা দেওয়া ফ্লপি ডিস্ক থেকে মুছে ফেলা তথ্য পুনর্গঠন করতে সক্ষম হন। এছাড়া, রাডারের পরিবারের একজন সদস্যের সঙ্গে অপরাধস্থলে থাকা ডিএনএর মিল পাওয়া যায়, যা তাকে গ্রেপ্তারের করতে সাহায্য করে।
এরপর, বিটিকের পাঠানো অন্যান্য চিঠিপত্র এবং তদন্তের পর, ২০০৫ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারী রাডারকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্যারোল ছাড়াই রাডারকে ১৭৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সুলতানা দিনা/