চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মীয়প্রীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও একাধিক পরিবারের ডজনের বেশি সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তর, বিভাগ ও হলে কর্মরত থাকার তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পরেও এ নিয়ে কেউ মুখ খোলেনি। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ সম্পর্ক অস্বীকার করলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একই পরিবার বা আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ বহু ব্যক্তি বছরের পর বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিতে যুক্ত রয়েছেন।
মো. শফির তার নিজের কর্মসংস্থান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইটি সেকশনে। তার পরিবারের প্রায় ডজনখানেক আত্মীয়-স্বজনের কর্মসংস্থানও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে।
তার আপন ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম চাকরি করেন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ইউনিয়ন অফিসে। আপন দুই ভগ্নিপতি একজন কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ চাকসুতে, অন্যজন সমাজবিজ্ঞান অনুষদে। শফির আপন মামা আবুল কাশেম কর্মরত আছেন আলাওল হলে, আপন খালাতো ভাই আহমেদ কবির বাল্লা আছেন বিজ্ঞান ওয়ার্কশপে। এদিকে বোন জামাতার ভাই (তালতো ভাই) মোহাম্মদ আইয়ুব কর্মরত আছেন পরিবহন দপ্তরে, আইয়ুবের ভাতিজা কর্মরত আছেন নিরাপত্তা দপ্তরে। শফির নিকট আত্মীয় মো. আফসার হোসেনও রয়েছেন নিরাপত্তা দপ্তরে। তারই আরেক খালাতো ভাই ফজল করিম আছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে। আপন চাচাতো ভাই মোরশেদ আছেন নিরাপত্তা দপ্তরে।
অভিযোগ রয়েছে, সম্পর্ক গোপন করেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্মরত রয়েছেন শফির বেশ কয়েকজন স্বজন।
এ সংক্রান্ত বিষয়ে শফীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসকল তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন।
এছাড়াও পারিবারিকভাবে অনেকেই কর্মরত রয়েছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। পরিবারের দুই ভাই মো. আবুল কাশেম ও মো. জাফর দুজনই রয়েছেন পরিবহন দপ্তরে। জাফরের ছেলে নাঈম উদ্দিন মানিক আছেন শারীরিক শিক্ষা বিভাগে। আবুল কাশেমের পুত্র সাকিফ আছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে।
এছাড়াও আরেক পরিবারের চার ভাই হোসেন বাবু একাউন্টিং বিভাগে, সালাউদ্দিন ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসে, আলাউদ্দিন পদার্থবিদ্যা বিভাগে, সানি সাংবাদিকতা বিভাগে কর্মরত আছেন। তাদের আপন ভাগিনা আকিলও (ভিসি অফিস থেকে বদলিকৃত) কর্মরত রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে।
এদিকে আপন তিন ভাই মো. তাজুল ইসলাম, মো. কামাল উদ্দিন, মো. জামাল উদ্দিন, যথাক্রমে শাহজালাল হল, লাইব্রেরী ও শিক্ষা অনুষদে কর্মরত আছেন। সাম্প্রতিককালে জামাল উদ্দিনের মৃত্যু হলে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তার পুত্র।
মোহাম্মদ ফয়েজ আহমেদ (মৃত) ছিলেন নিরাপত্তা দপ্তরের প্রহরী। তিনি সহ তার পরিবারের ৯ সদস্য কর্মকর্তা রয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। চার পুত্র ও এক পুত্রবধূ, এক মেয়ের জামাতা, এক বোনের ছেলে ও এক নাতি কর্মরত আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফয়েজ আহমেদের পুত্র মোহাম্মদ লোকমান আছেন নিরাপত্তা দপ্তরে, তার স্ত্রী নিলুফার ইয়াসমিন আছেন প্রীতিলতা হলে। আরেক পুত্র মো. ইমরান হোসেন আছেন বিজ্ঞান অনুষদে অফিসার হিসাবে। ফয়েজ আহমেদের আরেক পুত্র মো. ওসমান কর্মরত আছেন কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিন অফিসে, খালেদা জিয়া হলের মালি হিসাবে আছেন আরেক ছেলে মো শাহজাহান। ফয়েজ আহমেদের মেয়ের জামাতা মো. জাফর কর্মরত আছেন ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসে। তার নাতি ও জাফরের পুত্র মোহাম্মদ জামশেদ কর্মরত আছেন নিরাপত্তা দপ্তরে। ফয়েজের আপন বোনের পুত্র বখতিয়ার আছেন আলাওল হলে।
এ বিষয় সম্পর্কে জানতে ফয়েজ আহমেদের পুত্র ইমরানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিবারের সদস্যদের চাকরির বিষয়টি স্বীকার করলেও ভাগিনা হিসেবে জামশেদকে অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে জামশেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নিজেকে ফয়েজ আহমেদের নাতি ইমরানের ভাগিনা হিসাবে পরিচয় দেন।
আবুল কালাম (অবসর প্রাপ্ত) কর্মরত ছিলেন নিরাপত্তা দপ্তরে, তার দুই ছেলে মোহাম্মদ ফরিদ, মো. নজরুল ইসলাম কর্মরত আছেন শহীদ আব্দুর রব হলে, কালামের আরেক পুত্র আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী কর্মরত আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুলে।
আবুল কালামের ভাই তাজুল ইসলাম অবসরপ্রাপ্ত কর্মরত ছিলেন শাহজালাল হলে। তার পুত্র মাহবুব আলম কর্মরত আছেন জীববিজ্ঞান শিক্ষক লাউঞ্জে।
আবুল কালামের বোন জামাই আব্দুল আহাদ কর্মরত ছিলেন নিরাপত্তা দপ্তরে, সঙ্গে তার দুই পুত্রের একজন মিলাদ হোসেন কর্মরত আছেন নিরাপত্তা দপ্তরে, আর এক পুত্র মোহাম্মদ আলী কর্মরত আছেন ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদে, আব্দুল আহাদের শ্যালক আবু তাহের কর্মরত আছেন জীববিজ্ঞান (শিক্ষক লাউঞ্জে) আবু তাহেরের ছেলে কর্মরত আছেন শাহ্জালাল হলে।
খলিল, জলিল, সাদিক, সৈয়দ আপন চার ভাই যথাক্রমে কর্মরত আছেন পরিসংখ্যান বিভাগ, চাকসু ও আলাওল হলে। সৈয়দের স্ত্রী আছেন কর্মরত আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে।
রহিম, জসিম আপন দুই ভাই আছেন সংগীত বিভাগ ও ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসে, রহিমের স্ত্রী আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে।
আব্দুল মোনাফ আছেন বিজ্ঞান অনুষদে ভাই আব্দুল হালিম বড় ভাইয়ের সঙ্গে আছেন বিজ্ঞান অনুষদে, আরেক ভাই আব্দুস সালাম আছেন সোহরাওয়াদী হলে, ফরহাদ হলে আছেন আরেক ভাই আব্দুল আজিজ ।
লোকমান, মাবুদ, শাহ আলম আপন তিন ভাই যথাক্রমে কর্মরত আছেন ইঞ্জিনিয়ারিং অফিস, আইন অনুষদ ও নিরাপত্তা দপ্তরে।
শাহ আলমের এক পুত্র কর্মরত আছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে।
এ যাত্রায় পিছিয়ে নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ উপাচার্যগণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল আজিম আরিফ তার পুত্রবধূ, দুই শ্যালক সহ নিয়োগ দিয়েছেন বেশ কয়েকজন নিকট আত্মীয়কে। দুই শ্যালিকা শাহনাজ ও ইসরাত যথাক্রমে কর্মরত আছেন রেজিস্টার অফিস ও ডে কেয়ার সেন্টারে। ছেলের বউ কর্মরত আছেন বাণিজ্য অনুষদের ডিন অফিসে।
সাবেক উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামসুদ্দীনের আপন দুই ভাই গাজী নুরুদ্দিন কর্মরত আছেন কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে, আরেক ভাই গাজী সালাউদ্দিন কর্মরত আছেন রেজিস্টার অফিসে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচিত আরেক উপাচার্য প্রফেসর অধ্যাপক ড. এম বদিউল আলমের আপন ভাই মাহবুব হারুন চৌধুরী কর্মরত আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
ছেলে ফাহিম শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ছেলের বউ মৌসুমী শিক্ষক ছিলেন একই বিভাগে।
অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন যিনি উপ-উপাচার্য এবং ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তার আপন ভাইয়ের ছেলে মজনু কর্মরত আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ২৪ হলে। আপন শ্যালক হাফিজ কর্মরত আছেন শারীরিক শিক্ষা বিভাগে।
কর্মক্ষেত্রে ভালোবাসার বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে স্ত্রীকে সবসময় পাশে রাখার চেষ্টা করেছেন যারা তাদের মধ্যে মো. নাজিম উদ্দিন কর্মরত আছেন ডেপুটি রেজিস্টার হিসেবে শহীদ আব্দুর রব হলে, তার সহধর্মিনী আছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে। একই অফিসে কর্মরত আছেন শাহানুর ও তার সহধর্মিনী।
নুরুল আফসার আছেন আইন অনুষদে তার স্ত্রী আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী মো ইউনূস, ও তার সহধর্মিনী কর্মরত আছেন খালেদা জিয়া হলে।
সারোয়ার হোসেন খোকন কর্মরত আছেন স্যার এ এফ রহমান হলে, তার স্ত্রী কর্মরত আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব নিয়ামক দপ্তরে।
মো. আব্দুর রহিম কর্মরত আছেন সংগীত বিভাগে, স্ত্রী আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে।
মোহাম্মদ লোকমান হোসেন কর্মরত আছেন নিরাপত্তা দপ্তরে, তার স্ত্রী আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের খালেদা জিয়া হলে।
মোহাম্মদ আবু তৈয়ব আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় স্টোরে তার স্ত্রী কর্মরত আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে।
মো. জাহাঙ্গীর আলম ডেপুটি রেজিস্টার হিসেবে কর্মরত আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে, তার স্ত্রী আছেন একই অনুসদের পরিসংখ্যান বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য, রেজিস্টার উপাচার্য ও উপ উপাচার্য (প্রশাসন) প্রশাসনিক কাজে চীনে অবস্থান করায়, উপ-উপাচার্য ড. শামীম উদ্দিন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
আল আরাফ/মাহফুজ