খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একের পর এক বদলি-পদায়নে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক পদে চলতি দায়িত্বে যোগ দেওয়ার পর ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন ২০ ঘণ্টার মধ্যে দপ্তরের হিসাবরক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, প্রধান সহকারী, উচ্চমান সহকারীসহ ১৫ জনকে বদলি ও পদায়ন করে সমালোচনার জন্ম দেন। এতে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বদলির আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য দপ্তরের একাধিক কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের ‘পিএ’ পরিচয় দেওয়া মুকুল হোসেন বর্তমানে বদলি-পদায়নের ফাইল নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই সিন্ডিকেটে আরও রয়েছেন পরিচালকের পারসোনাল সিকিউরিটি পরিচয় দেওয়া ইমদাদুল ইসলাম, পরিচালকের দপ্তরে হিসাবরক্ষকের চলতি দায়িত্বে যোগ দেওয়া শাহারিয়ার আলম রাসেল এবং পরিচালকের দপ্তরে প্রেষণে দায়িত্বে যোগ দেওয়া খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সফিউর রহমান। মুকুল ও ইমদাদুল স্বাস্থ্য দপ্তরের কোনো কর্মচারী নন। এই দুজনের বেতন-ভাতা পরিচালকের নিজের পকেট থেকে দেওয়া হয়।
কর্মচারীরা জানান, গত ১৯ মে পরিচালক কর্মস্থলে যোগ দিতে এলে এই চারজনও একই সঙ্গে অফিসে আসেন। পরদিন ২০ মে তারা একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশ নেন। ওই বৈঠকের পরই একসঙ্গে ১৫ জনকে বদলি ও পদায়নের আদেশ দেওয়া হয়।
এর মধ্যে অবসরের ছয় কর্মদিবস আগে প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহাতাব হোসেনকে প্রেষণে জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। এছাড়া বিভাগীয় পরিচালকের দপ্তরের হিসাবরক্ষক বাবুল হোসেনকে চিতলমারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, প্রধান সহকারী শওকত হোসেনকে দাকোপ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, উচ্চমান সহকারী মাসুম বিল্লাহকে ডুমুরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং প্রধান সহকারী মাছুম বিল্লাহকে চুয়াডাঙ্গায় বদলি করা হয়।
বিভাগীয় পরিচালকের দপ্তরে কর্মরত দুই আউটসোর্সিং কর্মী, নিরাপত্তা প্রহরী সাগর হাওলাদার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী শাওন কুমার বিশ্বাসকে সরকারি কর্মচারীদের মতো দাপ্তরিক স্মারক ও অফিস আদেশে বদলি করা হয়।
বহিরাগতরা নিয়ন্ত্রণ করছে অফিস
গত ১৩ জুন সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ থেকে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক দপ্তরের ঠিকানায় মুকুলের কাছে কুরিয়ারে বদলির সুপারিশসংবলিত একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে অফিসজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসাফুর রহমান বলেন, ‘মুকুল স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মচারী না হলেও বদলির বিষয়টি তিনিই দেখছেন। চিঠিতে নড়াইল থেকে একজন মেডিকেল অফিসারকে সাতক্ষীরায় বদলির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। পরিচালকের মাধ্যমে তিনি কাজটি করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।’
সরেজমিনে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরে গেলে পরিচালকের সঙ্গে মুকুল ও ইমদাদুলকে একই গাড়ি থেকে নামতে দেখা যায়। ইমদাদুল ইসলাম জানান, তিনি পরিচালকের পারসোনাল সিকিউরিটি। তিনি সব সময় তার সঙ্গে থাকেন। প্রতি মাসের বেতনও তিনি দেন।
জানা গেছে, খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের অধীনে পোর্ট হেলথ অফিস, বিভাগীয় পরিচালকের অফিস, মেডিকেল সাব-ডিপো ও বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ৪৬ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী রয়েছেন। সিন্ডিকেটের কারণে কয়েকজনকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কারো কাছে বেতনের অর্ধেক টাকা ঘুষ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। আবার মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নতুন লোক নিয়োগের চেষ্টারও অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মচারীরা বলছেন, এভাবে বহিরাগতরা খুলনা স্বাস্থ্য দপ্তর নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে দপ্তরের গোপন নথি ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের দাবি, স্বাস্থ্য দপ্তরে চাকরি করতে হলে মুকুল ও ইমদাদুলের সঙ্গে সখ্য রেখে চলতে হয়। সুসম্পর্ক না থাকলে রোষানলে পড়ে বদলি হতে হয়।
নিজস্ব বলয় তৈরির অভিযোগ
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে নিজস্ব বলয় তৈরির অভিযোগও উঠেছে। তিনি এর আগে পোর্ট হেলথ অফিসার হিসেবে খুলনার খালিশপুরে কর্মরত ছিলেন।
নিজস্ব বলয় তৈরি করতে ফকিরহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক শাহারিয়ার আলম রাসেলকে বিভাগীয় পরিচালক দপ্তরে হিসাবরক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। একইভাবে খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সফিউর রহমানকে পরিচালকের দপ্তরে প্রেষণে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া খুলনা বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রধান সহকারী শামীম আহসানকেও একইভাবে পরিচালকের দপ্তরে পদায়ন করা হয়। পরিচালকের যোগদানের পর হঠাৎ বদলি ও পদায়নে খুলনার স্বাস্থ্য খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সদ্য অবসরে যাওয়া স্বাস্থ্য দপ্তরের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহাতাব হোসেন বলেন, ‘নতুন পরিচালক যোগ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের বদলি করা হয়। একদিন বদলির চিঠি গোপন রেখে ২১ মে বদলি আদেশের সঙ্গে ছাড়পত্রও দেওয়া হয়। প্রথা অনুযায়ী চাকরির এক বছর থাকতে কাউকে বদলি করা হয় না। কিন্তু মাত্র ছয় কর্মদিবস বাকি থাকতে আমাকে হয়রানিমূলকভাবে বদলি করা হয়েছে।’
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘যারা বিগত দিনে অনিয়ম-দুর্নীতি করেছে, তাদের বদলি করা হয়েছে। আর আউটসোর্সিং কর্মীকে বদলির বিষয়টি ভুল হয়েছে। অফিসে কাজ করলে ভুল হতেই পারে। ভুল ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করা হয়েছে।’