চট্টগ্রামের কুয়াইশ এলাকায় চট্টগ্রাম নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে ফুটো হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান পানি সঞ্চালন পাইপ তিন দিনেও মেরামত করা যায়নি।
প্রথমে একটি ফুটোর সন্ধান পাওয়া গেলেও সেখানে আরও বড় আকৃতির একটি ফুটো পাওয়া গেছে। এতে মেরামত কাজ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তিন দিন ধরে সেখানে লাগাতার মেরামত কাজ করতে হচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসাকে। গতকাল বুধবার বিকেল পর্যন্ত সেই কাজ শেষ হয়নি।
এদিকে পাইপলাইন মেরামত কাজ দীর্ঘ হওয়ায় শহরের ৩০ এলাকায় পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে চলমান পানিসংকট আরও তীব্র হয়েছে। ওয়াসা বলছে, পাইপলাইন নতুন কোনো জটিলতা সৃষ্টি না হলে পুরোপুরি মেরামত হতে আরও এক দিন সময় লাগবে। এরপর শহরে পানি সরবরাহ ঠিক হবে। এ ছাড়া এ ঘটনায় ওয়াসার ৩-৪ কোটি লিটার পানি নষ্ট হয়েছে। আর উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে প্রায় ১১ কোটি লিটার পানি।
এর আগে গত সোমবার দুপুরে ওয়াসা খবর পায়, নগরের কুয়াইশ এলাকায় পাইপ লাইন ফুটো হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে সিডিএর কর্মীরা এ ঘটনা ঘটান। ওয়াসার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিডিএর লোকজন সেখানে ভেকু মেশিনের (মাটি খোঁড়ার যন্ত্র) মাথায় ড্রিল লাগিয়ে খনন করেন। এতে ড্রিলের আঘাতে তাদের প্রধান পানি সঞ্চালন লাইন ফুটো হয়ে যায়। এরপর থেকে পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ভেকু মেশিনের আঘাতে ১ হাজার ২০০ মিলিমিটার ব্যাসের পাইপে বড় দুইটি ফুটো হয়ে যায়। ওই পাইপে প্রতি মুহূর্তে ২৫ লাখ লিটার পানি চলাচল করে। সেটা তাৎক্ষণিক নষ্ট হয়ে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনের কারণে শহরের উত্তর হালিশহর, দক্ষিণ হালিশহর, আগ্রাবাদ, জামালখান, লালখানবাজার, মাদারবাড়ি, জিইসি, মুরাদপুর, কদমতলী, ধনিয়ালাপাড়া, নয়াবাজার, আনন্দবাজার, ২ নম্বর গেট, বায়েজিদ, অক্সিজেন, রৌফাবাদ, রুবি গেইট, হিলভিউ, মোমেনবাগ, বহদ্দারহাট, চকবাজার, নন্দনকাননসহ অন্তত ৩০টি এলাকায় পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা মো. নাছির উদ্দিন বলেন, ‘সোমবার থেকে আমাদের বাসায় পানি নেই। কী যে কষ্ট হচ্ছে, সেটা বলে বুঝাতে পারব না। না পারছি রান্না করতে, না পারছি গোসল করতে। এর মধ্যে ভ্যাপসা গরম পড়ছে।’
হালিশহরের বাসিন্দা আরাফাত ইলাহী বলেন, ‘পানির সংকট প্রায় সময় থাকে। তার ওপর সোমবার থেকে পানি একদম নেই। দোকান থেকে কিনে পানি খাচ্ছি।’ লালখান বাজারের বাসিন্দা মামুন হোসেন বলেন, ‘আমরা কয়েকজন ব্যাচেলর এক সঙ্গে থাকি। পানি না থাকায় সবকিছু বন্ধ। বলার ভাষা নেই।’
এ বিষয়ে জানতে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফেরদৌস আহম্মেদ ও সিডিএর পক্ষে প্রকল্প পরিচালক আহম্মেদ মঈনুদ্দিনকে কল করা হলেও তারা দুইজনই সাড়া দেননি।
জানা গেছে, সিডিএ ‘চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় কুয়াইশ এলাকায় একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছিল। ভেকু মেশিনের ড্রিলের আঘাতে পাইপ ফুটো হওয়ার পর থেকে কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-১ থেকে পানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে।
ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সিডিএকে পাইপলাইনের অবস্থান ও নকশা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি কুয়াইশ এলাকায় ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী নিজে গিয়ে পাইপের অবস্থান দেখিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এত কিছুর পরও এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমাদের এই পাইপটি অনেক বড় আকৃতির। প্রথমে দেখি একটি ফুটো হয়েছে। সেই অনুযায়ী কাজ শুরু করি। কিন্তু পরে ঢালাই ভেঙে দেখি আরও একটি ফুটো আছে। এরপর কাজ আরও বেড়ে গেছে। বর্তমানে ঢালাই ভাঙার পর মাটি খনন করে পাইপটি মেরামত করা হচ্ছে এবং আর এক দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। এখন শহরের মধ্য এলাকা থেকে ৫৫ স্কয়ার কিলোমিটারের মধ্যে পানি নেই।’
এদিকে পানি না থাকায় চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। তারা জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে। ওয়াসার কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-১ ও ২ থেকে দৈনিক মোট ২৮ কোটি লিটার, মদুনাঘাট থেকে ৯ কোটি লিটার, মোহরা থেকে ৯ কোটি লিটার এবং গভীর নলকূপ থেকে ৪ কোটি লিটার পানি পাওয়া যায়। ওয়াসার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ৫০ কোটি লিটার হলেও, বর্তমানে কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-১ বন্ধ থাকায় ১৪ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না।