দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ কিংবা মূলধন সংকটে সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন ও সেবা দিতে পারছে না এমন শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান আবার সচল করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার (৫ জুন) এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ নামে চালু হওয়া এ তহবিলের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় কিন্তু আর্থিক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বল্পসুদে অর্থ দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এ তহবিলের মাধ্যমে দেশের শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে ২০ হাজার কোটি টাকার এ স্কিম পরিচালিত হবে। এ স্কিমের মেয়াদ হবে ৩ বছর। সব তফসিলি ব্যাংক এতে অংশ নিতে পারবে। তবে স্কিমে অংশগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।
যারা পাবে ঋণ সুবিধা
সার্কুলারে বলা হয়েছে, স্কিমের আওতায় বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের এমন প্রতিষ্ঠান ঋণ সুবিধা পাবে, যেগুলো আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কিংবা কার্যকর মূলধনের সংকটে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন ও সেবা দিতে পারছে না। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী ও উচ্চ রপ্তানি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ প্রদানে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কোনো উদ্যোক্তা অধিগ্রহণ (টেকওভার) বা ভাড়া চুক্তির মাধ্যমে বন্ধ প্রতিষ্ঠান চালু করলে তাকেও অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে ঋণ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা, উৎপাদন সক্ষমতা, মূলধনের প্রয়োজনীয়তা এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা বা বিপণন সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কেবল কার্যকর মূলধনের ঘাটতি পূরণের জন্য এই ঋণ দেওয়া যাবে না।
শিল্প বা সেবা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা প্রমাণে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে। তবে প্রয়োজন হলে ব্যাংক নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতেও ঋণ অনুমোদন করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত গ্রাহক, অর্থ পাচার, জালিয়াতি, ঋণ তছরুপ বা ঋণের অর্থ অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ স্কিমের সুবিধা পাবে না।
বিদ্যমান ঋণ সমন্বয় নয়
সার্কুলারে বলা হয়েছে, স্কিমের অর্থ শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, কাঁচামাল সংগ্রহ, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য উৎপাদন ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে। তবে এ অর্থ দিয়ে কোনো বিদ্যমান ঋণ সমন্বয় বা পরিশোধ করা যাবে না। এতে আরও বলা হয়েছে, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন করা যাবে না। ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য প্রত্যেক শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বেতন-ভাতা বাবদ সর্বোচ্চ চার মাসের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করা যাবে।
২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নয়
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের অনুকূলে এ স্কিমের আওতায় ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি হবে না। প্রতিটি ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর। তবে তহবিলের প্রাপ্যতা ও গ্রাহকের সন্তোষজনক লেনদেনের ভিত্তিতে ঋণ নবায়নের সুযোগ থাকবে।
সুদহার
স্কিমের আওতায় ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে ৪ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করবে। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণ বিতরণের প্রথম ৬ মাস সুদ পরিশোধে ছাড় থাকবে। এরপর থেকে সুদ আদায় ও পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হবে।
আদায় ও তদারকি
নীতিমালায় আদায় ও তদারকির বিষয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রাক-অর্থায়নের বিপরীতে গৃহীত অর্থের সুদ বা মুনাফা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে পরিশোধ করতে হবে। ঋণ আদায়, সমন্বয় বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সর্বশেষ ত্রৈমাসিকের সুদসহ পুরো অর্থ ফেরত দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত চলতি হিসাব থেকে অর্থ সমন্বয় করা হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার সময়ের জন্য অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদ আরোপ করা হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, ঋণসংক্রান্ত সব ধরনের ঝুঁকি সংশ্লিষ্ট ব্যাংককেই বহন করতে হবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ আদায়ের সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্বও ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকের ওপর থাকবে। কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের ঋণ আদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা সম্পর্কিত করা যাবে না। গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী তা খেলাপি ও প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে।
ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতি ত্রৈমাসিকে কারখানা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও যেকোনো সময় সরেজমিনে ঋণ কার্যক্রম যাচাই করতে পারবে। এ জন্য ঋণ মঞ্জুরের পূর্বশর্ত হিসেবে ঋণগ্রহীতার সম্মতি গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট সব তথ্য ও কাগজপত্র পৃথকভাবে সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে বলা হয়েছে, ঋণগ্রহীতা নির্বাচন, ঋণ মঞ্জুরি, বিতরণ, দলিল সম্পাদন, ঋণের ব্যবহার ও তদারকির বিষয় ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হবে। ঝুঁকি কমাতে ব্যাংক প্রয়োজনে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের বিপরীতে জামানত নিতে পারবে। একই সঙ্গে একক গ্রাহক বা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ঋণসীমাসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান বিধান কার্যকর থাকবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, যোগ্য প্রতিষ্ঠানের অবলোপনকৃত ঋণ থাকলেও নির্দিষ্ট শর্তে পুনঃতফসিল বা নীতি-সহায়তার আওতায় নতুন সুবিধা দেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা খেলাপি হিসেবে গণ্য হবে না এবং হিসাব এসএমএ হিসেবে থাকবে। তবে টানা ছয়টি মাসিক বা দুটি ত্রৈমাসিক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণ পুনরায় মন্দ ও ক্ষতিজনক হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হবে।
অন্যদিকে ঋণের অপব্যবহার, মিথ্যা তথ্য প্রদান, জালিয়াতি, অনিয়ম বা খেলাপির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতার তথ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে পাঠানো যাবে এবং আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে। কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, এই তহবিলের মাধ্যমে বন্ধ শিল্প-কারখানা ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় উৎপাদনে ফিরবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরে আসবে।