চা-শ্রমিকদের সংগ্রামী জীবনে ঘরে-বাইরে শত অভাব-অনটন। তবে বছরের কোনো একটি সময়ে তারা এসব ভুলে যান। পরিবার-পরিজনকে নিয়ে উৎসবে মেতে ওঠেন। এ রকম উপলক্ষগুলোর একটি ফাগুয়া উৎসব। আর এই উৎসবে একে অন্যের মুখে রং লাগিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে চলে শুভেচ্ছা বিনিময়। লাল, সবুজ, নীল হলুদ রঙের ছড়াছড়িতে চা-জনগোষ্ঠীর সবাই এখন মাতোয়ারা।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের অদূরে ফুলছড়া চা-বাগানের মাঠে আয়োজন করা হয় এই ফাগুয়া উৎসবের। গত শনিবার বিকেলে ফুলছড়া মাঠে নানা বয়সী হাজারো নারী-পুরুষ রঙের খেলায় মেতে ওঠেন। এই বর্ণিল উৎসব চলে রাত পর্যন্ত।
জেলা প্রশাসন ও ফাগুয়া উৎসব উদযাপন পরিষদের আয়োজনে এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আয়োজিত উৎসবে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এ সময় তিনি বলেন, ‘চা-শ্রমিকদের অবদান আমাদের জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখাই আমাদের দায়িত্ব।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন, শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম, বালিশিরা চা-বাগানের মহাব্যবস্থাপক মো. সালাউদ্দিন, ফাগুয়া উৎসব উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক প্রীতম দাশ ও সদস্যসচিব অনিল তন্তুরায়, শ্রমিক নেতা পরিমল বাড়াইক প্রমুখ। চা-জনগোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্য জানান, শত দুঃখ-কষ্ট, শত অভাব-অনটনের মধ্যেও উৎসবের কয়েকটি দিন চা-জনগোষ্ঠী পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দে কাটানোর চেষ্টা করে। শ্রমিকেরা এই আনন্দ ভাগাভাগি করেন প্রতিবেশীদের সঙ্গে। এ সময় দূর-দূরান্তের চা-বাগান থেকে মেয়েরা নাইওর আসেন জামাইসহ।
দেশের চা-বাগানগুলোতে নানা জনগোষ্ঠীর বসবাস। ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে এসে আবাস গড়া চা-শ্রমিকদের যেমন নিজেদের পৃথক ভাষা আছে, তেমন রয়েছে পৃথক সংস্কৃতিও। আয়োজকেরা জানান, এই উৎসবে কেবল রঙের হোলিই নয়, ছিল ভিন্ন সংস্কৃতির নানা পরিবেশনা। এর মধ্যে দিনব্যাপী চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী ও বর্ণিল আয়োজনে ছিল ভোজপুরীদের গুরুবন্দনা ও হোলিগীত, বাড়াইকদের ঝুমুর নৃত্য, উড়িয়াদের পত্রসওরা ও চড়াইয়া নৃত্য, তেলেগুদের কাঠিনৃত্য, হাড়িনৃত্য, বিরহা, হোড়কা বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে ঝুমুর এবং গড় সম্প্রদায়ের হোলিগীত উল্লেখযোগ্য।
একসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির নানা পরিবেশনা উপভোগ করতে পেরে যেমন আনন্দে ভেসেছেন চা-শ্রমিকরা, তেমন অভিভূত হয়েছেন উৎসবে আসা নাগরিক সমাজও। এদিকে ধীরে ধীরে চা জনগোষ্ঠীর অনেক ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী সালাউদ্দিন শুভ বলেন, ‘চা-জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি সুন্দর ও প্রাণবন্ত। এটা চাক্ষুষ না দেখলে বোঝা যাবে না।’
উৎসবে আসা শিক্ষক নিপা দাশ বলেন, ‘একসঙ্গে নৃত্যগীতের এত বৈচিত্র্যপূর্ণ আয়োজন দেখে অন্যদের মতো আমিও অভিভূত। সবাই নাচছে, গাইছে, আনন্দ করছে। চা-বাগানের মানুষের কৃষ্টি সংস্কৃতি এত সুন্দর যে, না দেখলে বুঝতে পারতাম না।’
উৎসব উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক প্রীতম দাশ বলেন, ‘চা-শ্রমিকদের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্যই এ উৎসবের আয়োজন। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে চা-জনগোষ্ঠীর শিল্পীরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি তুলে ধরেছেন।’