দুই দিকে দুটি ঘর। মাঝখানে রেলপথ। দূর থেকে এভাবেই দেখা যাচ্ছিল। কাছে গিয়ে দেখা গেল রেলসেতুর নিচে নির্মাণ করা হয়েছে ঘর দুটি। হঠাৎ দেখায় মনে হবে বসতঘরের টিনের চালের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে রেললাইন।
এমনটি দেখা গেছে সিলেট-ছাতক রেলপথের কামালবাজার এলাকার বাসিয়া নদীর রেলসেতুতে। রেলপথ সংস্কারে অবৈধ স্থাপনা দখলমুক্ত করার চার মাসের মাথায় নতুন করে এ রকম দখলযজ্ঞ কেবল রেলসেতুতে নয়, রেলওয়ের আশপাশ এলাকাতেও হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, রেলপথ সংস্কার প্রকল্পের কাজ চলাকালে এসব দখলযজ্ঞে নির্বিকার রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সহসা কোনো পদক্ষেপের কথা না জানিয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রয়োজনে আবার দখলমুক্ত করা হবে।
সিলেট-ছাতক রেলপথ বেশ পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে শিল্পশহর হিসেবে পরিচিত ছাতকের সঙ্গে সিলেট রেললাইন সম্প্রসারিত করা হয়েছিল বাণিজ্যিক কারণে। এরপর পরিকল্পনা ছিল সেখান থেকে সুনামগঞ্জ জেলা শহর (তৎকালীন মহকুমা) পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারিত করার। আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলমন্ত্রী থাকাকালে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে রেল মন্ত্রণালয় থেকে তিনি সরে গেলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। নতুন পরিকল্পনায় রেললাইনে ছাতককে বাদ দিয়ে গোবিন্দগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জে নেওয়ার কথা বলা হয়। এর প্রতিবাদ জানান সেই সময়ের স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক। এ নিয়ে তখন মন্ত্রী-এমপির দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতায় গত বছরের ২৩ নভেম্বর খবরের কাগজে ‘মন্ত্রী-এমপি নেই, তবু দ্বন্দ্বে বন্ধ সিলেট-ছাতক রেলপথের কাজ’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।
রেলওয়ে প্রকৌশল শাখার একটি সূত্র জানায়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় রেলওয়ে মহাপরিচালক গত ৩ জানুয়ারি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে মহাপরিচালকের ঘোষণা অনুযায়ী গত ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে সংস্কারকাজ শুরু করতে দখলমুক্ত অভিযান শুরু হয়েছিল। রেলপথ সংস্কারকাজে বাধা এড়াতে গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত রেলওয়ের ডেপুটি কমিশনার ভূমি ও ইমারত (উপসচিব) এবং বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন মাহমুদের উপস্থিতিতে রেলওয়ের জমি দখলমুক্ত করা হয়।
সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার কামালবাজার, খাজাঞ্চি, আফজালাবাদ রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্ট এবং আশপাশ এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল। ওই অভিযানে আধা পাকা, কাঁচা, খোলাবাজারসহ সহস্রাধিক পাকা স্থাপনা ও দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল উচ্ছেদ অভিযান, সেই সব এলাকায় নতুন করে স্থাপনা তৈরি হয়েছে। ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জে উচ্ছেদ করা জায়গায় একটি পাকা রেস্টুরেন্টসহ ১৫টি টংঘর আবারও নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট সদরের উপকণ্ঠ কামালবাজার রেলসেতুতে ভর দিয়ে দখলযজ্ঞের ঘরও উঠেছে।
গত শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর বাজার অংশের তীরে রেলসেতুর দুই দিকে টিনের চালার একাধিক কক্ষবিশিষ্ট ঘর নির্মাণ করা। ঘরের খুঁটি কোনোটি পাকা। একপাশের টিন রেলসেতুর ওপর এবং রেললাইনে ঠেস দেওয়া। স্থানীয়রা বলেছেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে কামালবাজার থেকে খাজাঞ্চি পর্যন্ত রেলের জমি থেকে ৫৭টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল। ওই সময় রেলসেতুতে ভর করে কোনো স্থাপনা বা ঘর ছিল না। রেলপথে সংস্কারকাজে বর্ষাকালীন বিরতি দেওয়ার সুযোগে রাতারাতি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের হিড়িকের মধ্যে রেলসেতুতে ভর দেওয়া ঘরটিও নির্মাণ হয়। ঘরটিতে কয়েকজনের সাক্ষাৎ পেলেও তারা নিজেদের নির্মাণকর্মী পরিচয় দিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে আশপাশ এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তারা একক কোনো মালিক পাননি। একসঙ্গে একাধিক ঘর নির্মাণ করে বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিতেই সংঘবদ্ধ চক্রের সক্রিয়তায় এটি হয়েছে।
সংস্কারকাজ চলাকালে রেলসেতুসহ নতুন দখলযজ্ঞ সম্পর্কে অবহিত নন সিলেট রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পূর্ত) রেজাউল হক। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, এ বিষয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্ট (ভূসম্পত্তি বিভাগ) ব্যবস্থা নেবে। প্রয়োজনে আবারও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।
সংস্কারকাজ বন্ধ রাখার বিষয়ে তিনি জানান, রেলপথ সংস্কারকাজ সম্পন্নের মেয়াদ দেড় বছর। ঈদের আগে কিছু লাইন খুলে মাটি বসানোর কাজ হয়েছিল, তিনটি ব্রিজের কাজও করা হচ্ছে। ঈদের ছুটি শেষে শ্রমিকরা সাইটে এলেও বৃষ্টিপাত এবং অনেক জায়গায় পানি থাকায় কাজ এগোচ্ছে না। বৃষ্টিপাতের মৌসুম শেষে জোরেশোরে কাজ হতে পারে।
এদিকে রেলপথ ও স্টেশন সংস্কারে ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকার সংস্কার প্রকল্পেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পকাজ সম্পন্নের কথা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ছাতকবাজার সেকশনের ক্ষতিগ্রস্ত রেলওয়ে ট্র্যাক, বাঁধ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো পুনর্বাসন, সিলেট থেকে ছাতক বাজার সেকশনে রেল যোগাযোগ পুনরুদ্ধারকরণ, বিভাগীয় গতি বাড়ানো, ভ্রমণের সময় কমানো, ভবিষ্যৎ ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত জলপথের কাঠামো নির্মাণ, রেলপথের বাঁধ বাড়ানো, কমিউটার ট্রেন বাড়ানো, পণ্য ট্রেন চালু করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আরিফ জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ১ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। মাটির অনেক কাজ রয়েছে। এখন বর্ষাকাল হওয়ায় কাজের অগ্রগতি কম। আগামী অক্টোবর থেকে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। প্রকল্পকাজ সম্পন্নের মেয়াদ ১৮ মাস। আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুন মাসের দিকে কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক।