দেশজুড়ে হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই বরিশালে বাড়ছে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা। তীব্র গরম, দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ধারণক্ষমতার চেয়ে অধিক হারে রোগী ভর্তি হওয়ায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সদর হাসপাতালে অনেক রোগীকেই মেঝে ও বারান্দায় থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সংক্রামক রোগের এই বহুমুখী চাপ জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
বরিশাল সদর হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুন থেকে ১১ জুন পর্যন্ত আট দিনে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ১৪২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে ১৭ থেকে ২১ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। যদিও অনেক রোগী চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন, তবুও নতুন আক্রান্তের ধারাবাহিকতা উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।
বরিশাল সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ডায়রিয়া রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা মাত্র চারটি। রোগীর চাপ সামাল দিতে অতিরিক্ত ছয়টি শয্যা যুক্ত করে মোট ১০টি বেড চালু করা হয়েছে। তবে শয্যার তুলনায় প্রতিদিন রোগী বেশি আসায় অনেককেই হাসপাতালের মেঝে, বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে রোগীর স্বজনদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
চিকিৎসা নিতে আসা আশিকুর রহমান বলেন, ‘হঠাৎ পাতলা পায়খানা ও বমি শুরু হয়। শরীর দুর্বল হয়ে পড়লে হাসপাতালে আসি। এখানে এসে দেখি অনেক রোগী ভর্তি। এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়নি। হাসপাতাল থেকেই বেশির ভাগ ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাচ্ছে।’
তাসলিমা বেগম নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘আমার শ্বশুর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে ওয়ার্ডে জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমের কারণে আশপাশের অনেক মানুষও অসুস্থ হচ্ছেন।’
সদর হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ৪ জুন ভর্তি হন ১৩ জন, ৫ জুন ২০, ৬ জুন ১৩, ৭ জুন ১৯, ৮ জুন ২১, ৯ জুন ১৮, ১০ জুন ১৭ এবং ১১ জুন ২১ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে।
বরিশাল সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল বলেন, ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং নিরাপদ খাদ্য গ্রহণে অসচেতনতার কারণে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত স্যালাইন, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রয়েছে। পরিস্থিতি আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্ম ও বর্ষার শুরুতে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। দূষিত পানির মাধ্যমে রোগজীবাণু সহজে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ফুটানো বা বিশুদ্ধ পানি পান, খাবার ঢেকে রাখা, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং খোলা খাবার এড়িয়ে চলার বিকল্প নেই।
এদিকে দেশে হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. লোকমান হাকিম বলেন, ‘হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতেও প্রতিদিন ৫০ জনের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর চাপ আরও বাড়বে।’
তিনি বলেন, ‘জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা এখন খুবই জরুরি, নইলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।’
ডা. লোকমান হাকিম আরও বলেন, ‘ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। পর্যাপ্ত স্যালাইন গ্রহণ ও পানিশূন্যতা প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’