চট্টগ্রাম নগরীর ঝাউতলা এলাকার বিহারিপল্লিতে হাতের নিপুণ নকশা তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। সারা বছর ব্যস্ততা থাকলেও বিয়ে ও উৎসবের মৌসুমে যেন কর্মযজ্ঞে রূপ নেয় পুরো এলাকা। সরু গলি আর টিনশেড ঘরে বসে হাতের নিপুণ নকশায় তৈরি হচ্ছে কারচুপি ও জারদৌসি কাজের পোশাক। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে সুই-সুতা, জরি ও পাথর, চুমকি বসানোর সূক্ষ্ম কাজ। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বিহারিপল্লিতে এখন তুমুল ব্যস্ততা। সকাল থেকে গভীর রাত– কোথাও যেন বিরাম নেই। শ্রমিকদের কারও দম ফেলার সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্ডার সরবরাহ করতে দিন-রাত কাজ করছেন তারা।
গত শনিবার দুপুরে ঝাউতলা বিহারিপল্লিতে গিয়ে দেখা যায়, লেহেঙ্গা, গাউন, স্কার্ট, থ্রি-পিস, ফ্রক, পাঞ্জাবি, বোরকা সেলোয়ারসহ নানা ধরনের পোশাকে লাগানো হচ্ছে জরি, চুমকী, স্প্রিং। কাপড়ে সুই-সুতায় হাতের নিপুণ কারুকাজে মোহনীয় নকশা ফুটিয়ে তোলেন এখানকার কারিগররা। কেউ কাপড়ে জরি বসাচ্ছেন, কেউ চুমকি ও কেউ পুঁথি এবং স্প্রিং। এভাবে সকাল থেকে সাহরি খাওয়ার আগ পর্যন্ত চলছে কাজ। এ কাজের মাধ্যমে পোশাক আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দশক ধরে এই পল্লির বাসিন্দারা কারচুপি ও জারদৌসি শিল্পের সঙ্গে জড়িত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে এই দক্ষতা। একটি ভারী বিয়ের লেহেঙ্গা বা শেরওয়ানিতে নকশা সম্পন্ন করতে সময় লাগে ১০ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত। বিয়ের শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় এক মাস। ত্রিশ থেকে ৪০ হাজার টাকার একটি পোশাক তৈরি হওয়ার পর চলে যায় বিদেশেও। বিশেষ করে অনলাইনেও অর্ডার দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা ডিজাইনের পোশাক তৈরি করে দেন কারিগররা।
তারা জানান, মৌসুমে কাজের চাপ এত বেশি থাকে যে অনেক সময় বিশ্রামের সুযোগ মেলে না। অধিকাংশ কারিগর পিস রেটে (পিস হিসেবে) কাজ করেন। কাজের ধরন ও নকশার জটিলতার ওপর আয় নির্ভর করে। সপ্তাহিক হিসেবে বেতন পান তারা।
এই শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। অনেকে ঘরে বসে ছোট নকশার কাজ করে বাড়তি আয় করছেন। তবে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য তাদের লাভ কমিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তারা বলছেন, যত দিন যাচ্ছে, শৈল্পিক এই পেশাটি ততই যেন ছোট হয়ে আসছে। যন্ত্রে তৈরি নকশাদার পোশাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে পারছে না হাতের কাজের পোশাক। বছরে দুই ঈদের সময় কিছুটা ব্যস্ততা থাকলেও অন্য সময়ে কাজই থাকে না তাদের।
এ পেশার সঙ্গে জড়িতদের ভাষ্য, স্বাধীনতার পরপরই বন্দর নগরীর ঝাউতলা, জালালাবাদ, ফিরোজ শাহ ওয়্যারলেস এলাকায় মূলত বিহারিরা এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানকার বুটিক হাউসের মালিক ও কারিগররা জানান, একসময় ঝাউতলা বিহারি কলোনি এলাকায় শতাধিক কারখানা ছিল। কাজ করতেন কয়েক হাজার কারিগর। এখন ঈদের মৌসুমে কাজ চলে ২০ থেকে ২৫টি কারখানায়। বছরের অন্য সময় সচল থাকে তার অর্ধেক।
বাজারে কমদামি ভারতীয় পোশাকের দাপটের কারণেই মূলত এই পেশা হারাতে বসেছে বলে মনে করেন এর সঙ্গে জড়িতরা। ঝাউতলা স্টেশনের আনুশা বুটিকস ফ্যাশনের মালিক মোহাম্মদ শহিদ বলেন, ‘বাজারে থাকা পোশাকগুলো মেশিনে তৈরি। কিন্তু আমাদের কাজ হাতের। এ কারণে সেগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠা সম্ভব হচ্ছে না। ভারতে কাঁচামাল ও কাপড়ের দাম কম, শ্রমিকদের বেতনও কম দিতে হয়। কিন্তু সেটা আমাদের এখানে সম্ভব হবে না। হাতের কাজের অনেক পরিশ্রম। সব মানুষতো আর কাজের গুণগত মান বোঝে না। ইন্ডিয়ান পোশাকগুলোর দাম কম হওয়ায় বেশির ভাগ মানুষ সেগুলোর দিকে ছুটছে। কিন্তু মালামালের দাম, মজুরিসহ সব মিলিয়ে আমাদের কাপড়গুলোর দাম পড়ে বেশি।’
চয়েস কারচুপি হাউসের কারিগর মোহাম্মদ সাদ্দাম বলেন, দীর্ঘ ২২ বছর ধরে এ কাজের সঙ্গে জড়িত। বিদেশি ডিজাইনের পোশাক তৈরি করি। আমাদের প্রস্তুত করা পোশাক বিদেশেও যায়। আমার বয়স যখন ১৪ বছর তখন বাবা-মা আমাকে এখানে কাজে দিয়েছিল। ঈদের আগে সাধারণত আমাদের কাছে থ্রি-পিস, গাউন, ওড়না, শাড়ি, ব্লাউজের কাজই বেশি আসছে।
কারিগর মোহাম্মদ আসিফ বলেন, একসময় এ বিহারিপল্লিতে জৌলুস ছিল। এখন সেটি নেই। ধীরে ধীরে অনেক কারিগর পেশাও বদলে ফেলেছেন। ঈদে শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবির কাজ হলেও অন্যসময়গুলোতে এসব কারখানায় শুধু বোরকার কাজ হয়।