‘অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য’খ্যাত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর অবশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। গতকাল সোমবার ভোরে সেখানে অভিযান শুরু হলে দুপুর ২টার মধ্যে পুরো এলাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে।
চট্টগ্রাম পুলিশের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সেখানে র্যাব ও পুলিশের দুটি ক্যাম্প বসানো হবে। ক্যাম্প দুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। অভিযানে ১৪ জনকে আটক ও বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানালেও ডিআইজি পরে বলেন, সব টিমের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে সঠিক তথ্য পরে জানানো হবে।
এদিকে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল সেখান প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তা অর্জন হওয়ার পর এই এলাকা ঘিরে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। অতীতে যেসব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করা হবে।
ভোর থেকেই অভিযান শুরু
গতকাল জঙ্গল সলিমপুরে ৩ হাজার ২০০ সদস্যের সমন্বয়ে বিশেষ অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। ফজরের নামাজের সময় এ অভিযান শুরু হয়। সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বিজিবির সদস্যরা এ অভিযানে অংশ নেন। ভোর থেকে জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে যৌথ বাহিনী। এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে বসানো হয় তল্লাশি চৌকি। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে অভিযানে অংশ নেন। এর মধ্যে ৫৫০ জন সেনাবাহিনীর সদস্য, ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন, ৪০০ র্যাব, ১২০ বিজিবি, ১৫ এপিসি, তিনটি ডগ স্কোয়াড ও তিনটি হেলিকপ্টার অংশ নেয়।
অভিযানে প্রতিবন্ধকতার চেষ্টা
অভিযানের সময় সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টা করে। এক জায়গায় বড় একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়। এ ছাড়া সড়কের মাঝে ট্রাক রেখে চলাচল বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে এসব বাধা অতিক্রম করে অভিযান চালিয়ে যায় যৌথ বাহিনী।
বোরকা পরে পালিয়েছে ইয়াসিন
এদিকে গুঞ্জন উঠেছে–সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণকর্তা শীর্ষ সন্ত্রাসী ও র্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মো. ইয়াসিন অভিযান শুরুর আগেই বোরকা পরে পালিয়ে যায়। ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের একটি গোপন পথ ব্যবহার করে সে নারীবেশে সটকে পড়ে বলে এলাকায় চাউর হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন প্রতিবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের খবর টের পেয়ে বোরকা পরে পালিয়ে যায়। কখনো কখনো সিএনজিচালিত অটোচালকের বেশেও পালায় সে।
সরকারি ভূমি দখলে রাখতেই অপরাধের সাম্রাজ্য
প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এলাকাটি অপরাধীদের কাছে নিরাপদ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়িতে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস। যাদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে বসতি গড়েছেন। চার দশক ধরে জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে প্লট-বাণিজ্য চলে আসছে। আর এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকাটিতে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী। পাহাড়খেকো, মাটি ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু, অস্ত্র ব্যবসায়ী, খুনি, চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্য সলিমপুর সব সময় আলোচনায় থাকে। অত্যন্ত সুরক্ষিত এই পাহাড়ি এলাকাটিতে কোনো গণমাধ্যমকর্মী দূরে থাক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছোটখাটো দলও প্রবেশ করতে পারত না।
গত জানুয়ারিতে সেখানে অভিযানে গিয়ে র্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় আসে জঙ্গল সলিমপুর। এরপর সবার ধারণা ছিল সেখানে যৌথ বাহিনীর অভিযান চালানো হবে। অভিযান না চালালেও সে সময়ে ওই ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করে র্যাব। এতে প্রধান আসামি করা হয় মোহাম্মদ ইয়াসিনকে। মামলায় ইয়াসিন, নুরুল হক ভান্ডারীসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাত আসামি করা হয় ২০০ জনকে। মামলার এজাহারে বলা হয়, র্যাব সদস্যরা আসামি ধরতে গেলে তাদের ওপর সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ইয়াসিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানো হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় আটক এক আসামিকে। চার র্যাব সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যায় আসামিরা। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।
মামলার পর ইয়াসিন নিজ এলাকায় সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলেছিল, সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঢুকতে হলে তার অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি না নিলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তার দায় প্রশাসনকে নিতে হবে।
পুলিশ ও জঙ্গল সলিমপুরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে দুটি সন্ত্রাসী পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছে মোহাম্মদ ইয়াসিন ও অন্য পক্ষে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীতাকুণ্ডের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিল।
স্থাপন করা হবে দুটি ক্যাম্প: ডিআইজি
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এসেছে দাবি করে ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, বিস্তীর্ণ এই এলাকার নিরাপত্তায় র্যাব ও পুলিশের দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। গতকাল দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি বলেন, ‘র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও এপিবিএনের মোট ৩ হাজার ২০০ সদস্য এই অভিযানে অংশ নেন। ভোর থেকেই অভিযান চলে। প্রধান লক্ষ্য ছিল, এই বিশাল এলাকায় আমাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং আমরা তা পেরেছি। আজ থেকে এলাকার নিরাপত্তায় পুলিশ ও র্যাবের দুটি ক্যাম্প চালু হবে। পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় ক্যাম্পের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুর একটি অপরাধপ্রবণ এলাকা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম শহর ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের অপরাধীরা বিভিন্ন জায়গায় অপরাধ করে এটিকে একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে। যেহেতু এটি একটি জঙ্গলাধীন এলাকা। এ ছাড়া এখানকার যে ভূমির অবস্থা, তা কেন্দ্র করে কিছু ভূমি অপরাধী তৈরি হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে আমরা যৌথ বাহিনী একটি কর্মপরিকল্পনা করে এখানে অভিযান পরিচালনা করেছি।’