বছরের পর বছর ভোটাধিকার প্রয়োগ না করে সিলেকশনের মাধ্যমে পরিচালক নির্বাচন, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তিতে অস্বচ্ছতা এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির পদত্যাগে স্থবির হয়ে পড়েছে খুলনার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (কেসিসিআই)।
সেই সঙ্গে বিগত প্রায় ১৪ বছর (টানা ৬ মেয়াদে) কোনো নির্বাচন ছাড়াই আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কমিটি চেম্বার দখল করে রেখেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়।
এদিকে নির্বাচনের মাধ্যমে তফসিল প্রণয়নসহ নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও ভুয়া ভোটার বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। প্রকৃত ব্যবসায়ীদের পরিবর্তে পছন্দের লোকদের ভোটার করার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান নির্বাচন-প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে নানা ষড়যন্ত্র চলছে বলেও অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
জানা যায়, চেম্বার অব কমার্সের নির্বাচন প্রস্তুতির মাঝে গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১২৫টি সদস্য আবেদন যাচাই-বাছাই করে ৯০টি প্রতিষ্ঠানই অস্তিত্বহীন বলে প্রমাণ মিলেছে। তাদের সদস্যপদ বাতিলের চেষ্টা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনকে টার্গেট করে গত এক বছরে সদস্য হতে আবেদন করেছেন ১ হাজার ৭০ জন। এর মধ্যে অনেকেই সদস্য হয়েছেন, যাদের সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে ভোটার বানানো হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর এ বিষয়ে যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
জানা যায়, খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক নেতারা বর্তমানে অনেকেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে বা নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। সর্বশেষ খুলনা চেম্বার অব কমার্সের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শরীফ আতিয়ার রহমান ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পদত্যাগ করেন। সংগঠনের প্রভাবশালী সাবেক সভাপতি কাজী আমিনুল হক মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তিনি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত ১৪ বছর ধরে নির্বাচন না হওয়া খুলনা চেম্বারের বিগত পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ নেতাই আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক ছিলেন, তারা বর্তমান প্রেক্ষাপটে গা ঢাকা দিয়েছেন বা নির্বাচন-প্রক্রিয়া ব্যাহত করার চেষ্টা করছেন।
খুলনা চেম্বারের সাবেক পরিচালক ও মহানগর বিএনপির সাবেক শিল্পবিষয়ক সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, প্রায় ১৪ বছর যারা ব্যবসায়ীদের সংগঠনটি কুক্ষিগত করে রেখেছেন, তারাই আবার ভুয়া ভোটারসহ নানা ইস্যু তুলে নির্বাচনকে বিলম্বিত করতে চান। তিনি বলেন, চেম্বারের সদস্য হতে গেলে আগে ৬০০-১০০০ টাকা ফি দিতে হতো। কিন্তু এখন সদস্য ফি করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। এত টাকা ব্যয় করে ভুয়া ভোটার হতে চাইবেন না কেউ। কারও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তন হতেই পারে, এ জন্য তাকে অস্বিত্বহীন বলা যায় না। আর অস্বিত্ব না থাকলে চেম্বার থেকে সদস্যপদ বাতিলের চিঠি তাকে কীভাবে কোন ঠিকানায় দেওয়া হচ্ছে।
একইভাবে চেম্বারের সাবেক পরিচালক তারিকুল ইসলাম জহির বলেন, বিগত দিনে ব্যবসায়ীদের এ সংগঠনটি রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালিত হয়েছে। এখনো নানাভাবে নির্বাচন-প্রক্রিয়া ব্যাহত করার প্রচেষ্টা চলছে। ভুয়া ভোটার করা হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নেই। এ কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের অনেকেই চেম্বারের নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছেন না। যদি চেম্বারের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসে, নির্বাচন-প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও স্বাভাবিক হয়, তবেই তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে মত ব্যক্ত করেন। চেম্বারের সাবেক সভাপতি সাহারুজ্জামান মোর্ত্তজা ও মো. মুনীর আহমেদ এখনো নির্বাচনের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে সক্রিয় হননি।
তবে সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, চেম্বারের নেতৃত্বে প্রকৃত ব্যবসায়ীরাই ফিরুক। যারা এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং সদস্যদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবেন। সেই সঙ্গে বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূর, নতুন বিনিয়োগ, শিল্প বিকাশে ব্যবসায়ী এবং সরকারের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করবেন।
চেম্বার অব কমার্স থেকে জানা গেছে, অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নূরুল হাই মোহাম্মদ আনাছকে খুলনা চেম্বার অব কমার্সের প্রশাসক নিয়োগ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পরবর্তী সময়ে ওই বছরের ৩০ ডিসেম্বর প্রশাসক নিয়োগ করা হয় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিতান কুমার মণ্ডলকে। তাকে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর পরই চেম্বার নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়। বর্তমানে চেম্বার অব কমার্সের ১ হাজার ৮৪ জন সাধারণ শ্রেণির এবং ২৭৮ জন সহযোগী শ্রেণির সদস্য নবায়ন রয়েছে। নতুন করে আবেদন জমা রয়েছে ১ হাজার ৭০টি। নতুন এই আবেদন যাচাইয়ের জন্য কয়েক দফা আবেদন করেছে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। তারা প্রথম দফায় ৬৭টি এবং পরবর্তী সময়ে ৫৮টি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের তালিকা জমা দেয় এবং আরও ৪০০টি প্রতিষ্ঠান ভুয়া রয়েছে বলে জানায়।
চেম্বার অব কমার্সের প্রশাসক বিতান কুমার মণ্ডল বলেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে ১২৫টি আবেদন যাচাই করা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তাদের বাতিল করা হবে। তবে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য নির্বাচনি কার্যক্রম বন্ধ রাখা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আবেদন করতে পারেন। মন্ত্রণালয় যদি যাচাই-বাছাই শেষে তফসিল দিতে বলে আমরা সেটাই করব।’