একসময় বরিশাল নগরের ব্যস্ত মোড়গুলোতে লাল, হলুদ আর সবুজ বাতির ঝলকানি ছিল আধুনিকতার প্রতীক। যান চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে ১৯৯৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় শহরের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসানো হয়েছিল ট্রাফিক সিগনাল বাতি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই বাতিগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। এখন সেগুলো অনেকের কাছে শুধুই স্মৃতি, আর নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় রূপকথার গল্প।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে বরিশাল শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে ২৮টি ট্রাফিক সিগনাল লাইট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে নগরের নথুল্লাবাদ, রূপাতলী, জেলখানা মোড়, কাকলী মোড়, জিলা স্কুল মোড়, সিঅ্যান্ডবি রোডের চৌমাথা এবং লঞ্চঘাট এলাকায় সাতটি সিগনাল বাতি স্থাপন করা হয়েছিল। তবে প্রকল্পটি আর পূর্ণতা পায়নি। পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ-সংযোগ সংকটে একে একে সিগনালগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, সে সময় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতার নতুন অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছিল এই সিগনাল বাতিগুলো। অথচ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, অবহেলা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো বরিশাল নগর থেকে হারিয়ে যায়। পরবর্তী দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সরকার এসেছে, নগর প্রশাসনের পরিবর্তন হয়েছে—কিন্তু সিগনাল বাতিগুলো আর ফিরে আসেনি।
নগরবাসীর বক্তব্য
বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিচুর রহমান খান স্বপন বলেন, ‘গত তিন দশকে নগরের অবকাঠামো ও প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে। পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়েছে। গঠন করা হয়েছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। বেড়েছে সড়ক ও যানবাহনের সংখ্যাও। কিন্তু আধুনিক নগর ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ট্রাফিক সিগনাল আর ফিরে আসেনি।’
বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাবেক সভাপতি শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘একসময়ের ২৪ দশমিক ৯১ বর্গকিলোমিটারের পৌরসভা এখন ৫৮ বর্গকিলোমিটারের সিটি করপোরেশন। জনসংখ্যাও কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। ফলে নগরের প্রধান সড়কগুলোতে যানজট এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।’
নগরের কাউনিয়া এলাকার বাসিন্দা সুব্রত পাল বাপ্পী স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘সাইকেলে কলেজে যাওয়ার সময় জেলখানা মোড়ে লাল, সবুজ আর হলুদ বাতি জ্বলতে দেখতাম। লাল বাতি জ্বললে দাঁড়িয়ে যেতাম, সবুজ জ্বললে চলতাম। তখন সড়কে একটা শৃঙ্খলা ছিল। কিন্তু প্রায় তিন দশক ধরে বরিশালের মানুষ সেই দৃশ্য আর দেখে না।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন জানিয়েছেন, যানজট ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ওভারব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক ট্রাফিক সিগনাল ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশি-বিদেশি আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে নগরে আধুনিক ট্রাফিক সিগনাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’