রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে রোগীর ছেলে রিফাতের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে।
স্বজনদের দাবি, একপর্যায়ে অভিযুক্ত রিফাত হোসেনকে কান ধরে ওঠবস করানোর পর মায়ের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয়ে ঘটনাটি ঘটে। এর আগে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালে জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
রোগীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোরে রংপুর নগরের নিউ জুম্মাপাড়া এলাকার মাহবুবুর রহমানের স্ত্রী নুর নাহার বেগমকে (৫৫) রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় অক্সিজেন দেওয়ার কথা বললে চিকিৎসকরা ভর্তির কাজ সম্পন্ন করে আসার পরামর্শ দেন। এর মধ্যেই রোগীর মৃত্যু হয়।
এ সময় চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মৃতের ছোট ছেলে রিফাত। একপর্যায়ে রিফাত ও চিকিৎসকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় ডা. নাঈম বকশীকে মারধর করার অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। একপর্যায়ে শনিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন তারা।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, নুর নাহার বেগমের মৃত্যুর পরও তার মরদেহ হাসপাতালের আইসিইউতে আটকে রাখা হয় এবং রোগীর স্বজনদের দেখতে দেওয়া হয়নি। পরে মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে বাড়িতে নেওয়ার সময় কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থী বাধা দেন। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্স থেকে মরদেহ নামিয়ে হাসপাতালের মর্গে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন রোগীর স্বজনেরা।
শনিবার দুপুরে হাসপাতালের মর্গের সামনে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের দেখা যায়। এ সময় তারা চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার দাবি করেন।
তবে মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেন ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আসিফ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি। তবে কোনো মরদেহ আটকে রাখা হয়নি।”
একপর্যায়ে চিকিৎসককে মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত রিফাত হোসেন হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে অবস্থান করছেন- এমন খবর পান চিকিৎসকরা।
পরে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা পরিচালকের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। এ সময় অভিযুক্ত রিফাত হোসেনকে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করানোর দাবিতে তারা স্লোগান দিতে থাকেন। পরবর্তীতে পরিচালকের কার্যালয়ের ভেতরে রিফাতকে কান ধরে ওঠবস করানোর পর তার মায়ের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অন্যদিকে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের দাবিতে স্বজনরা মহাসড়ক অবরোধ করেন।
এ সময় নুরুজ্জামান রিন্টু বলেন, “ভোরবেলা থেকে এখন পর্যন্ত মায়ের মুখটা দেখতে পারলাম না। মারা যাওয়ার পরও মা কষ্ট পাবেন, এটা ভাবতে পারিনি। আমি আমার মায়ের লাশ দাফন করতে পারছি না। সরকারি মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে এসে যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে মানুষ কীভাবে আসবে? আমি আমার মায়ের লাশ চাই।”
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, “হাসপাতালে যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক। রোগীটিকে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আনা হয়। আনার পরই তিনি মারা যান। সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছি, সেখানে ডাক্তারের কোনো ভুল ছিল না। কোনো কারণ ছাড়াই সামনে থাকা ডাক্তারকে মারধর করা হয়েছে।”
মরদেহ আটকে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মরদেহ আটকে রাখার বিষয়টি সঠিক নয়। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে সেখানে অনেক লোকজন ছিল, ফলে মরদেহটি গাড়িতে তোলা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। সবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কিছু সময় মরদেহটি মর্গে রাখা হয়। পরে আমরা মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছি।”
তিনি আরও বলেন, “এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা অভিযোগ করব, এজাহার দেব। অভিযুক্তকে পুলিশের দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে।”
শনিবার রাত ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের বলেন, “এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।”
সেলিম সরকার/আজহার