সিলেটের বিশ্বনাথে চাউলধনী হাওরে ইজারাদারি প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে গুলি করে স্কুলছাত্র সুমেল আহমদকে (১৫) হত্যা মামলার রায়ে হাওরের প্রভাবশালী ওয়াটার লর্ডসহ (ইজারাদার) আট আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া ১৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দওয়া হবে।
বুধবার (৩০ জুলাই) সিলেটের অতিরিক্ত দায়রা জজ (প্রথম) আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক সৈয়দা আমিনা ফারহিন এ মামলার রায় দেন।
সিলেটের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি মো. কামাল হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- হাওরের প্রভাবশালী ‘ওয়াটার লর্ড’ (ইজারাদার) যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাইফুল আলম, নজরুল আলম, সদরুল আলম, সিরাজ উদ্দিন, জামাল মিয়া, মো. শাহিন উদ্দিন, মো. আব্দুল জলিল ও আনোয়ার হোসাইন।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্তরা হলেন- ইলিয়াছ আলী, আব্দুন নুর, জয়নাল আবেদীন, আশিক উদ্দিন, মো. আশকির আলী, মো. অলিদ মিয়া ওরফে ফরিদ মিয়া ও আকবর মিয়া। তাদের প্রত্যেককে যাবজ্জীবান কারাদেণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনাদায়ে আরও দুই বছর করে কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দুবছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রাপ্তরা হলেন- লুৎফুর রহমান, ময়ুর মিয়া, মামুনুর রশিদ, কাউসার রশিদ, দিলাফর আলী, পারভেজ মিয়া, ওয়াহিদ মিয়া, দিলোয়ার হোসেন, আজাদ মিয়া, মুক্তার আলী, আব্দুর রকিব, আঙ্গুর আলী, জাবেদ ইসলাম, শফিক উদ্দিন, মো. মখলিস মিয়া, ফিরোজ আলী, ফখর উদ্দিন।
বিশ্বনাথের চাউলধনী হাওরটি প্রায় ২০ বছর ধরে একাধিক ভুয়া মৎস্যজীবী সমিতির নামে লিজ নিয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাইফুল আলম হাওর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন।
অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাজ্যে বসবাসের সূত্র ধরে সাইফুল নিজেকে হাওরের ইজারাদারিকে ‘ওয়াটার লর্ড’ ঘোষণা দিয়ে হাওর এলাকায় ৩০টি গ্রামের কৃষকদের রেকর্ডিয় জমি, খাল, নালা, ডুবা জোর করে দখল করে লিজের শর্ত অমান্য করে বেআইনিভাবে সেচ দিয়ে মাছ যুক্তরাজ্যে রপ্তানি করে বিক্রি করে। মিঠা পানির মাছের বংশ ও পরিবেশ ধ্বংস করে দেওয়ায় হাওরপারের কৃষকরা আপত্তি করলে তাদেরকে মারপিট, হত্যার হুমকিসহ নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছিল।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১ মে চাউলধনী হাওরের ইজারা ব্যবস্থার জন্য রাস্তার পাশ থেকে মাটি কাটা নিয়ে ওয়াটার লর্ড সাইফুল আলম ও চৈতননগর গ্রামের নজির উদ্দিনের পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় সাইফুল আলমের হাতে থাকা বন্দুকের গুলিতে স্কুলছাত্র সুমেল আহমদ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। সে বিশ্বনাথের শাহজালাল (রহ.) উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এ ঘটনায় ৩ মে বিশ্বনাথ থানায় হত্যা মামলা করেন নিহত সুমেলের চাচা ইব্রাহীম আলী সিজিল।
মামলায় ২৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১৬ জনকে আসামি করা হয়। ওয়াটার লর্ড সাইফুকে প্রধান আসামি করা হয়। আসামিরা মামলাটিকে ভিন্নখাতে নিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এ সময় চাউলধনী হাওর এলাকায় আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। সাইফুল ক্ষমতার দাপটে পুলিশকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। হত্যাকাণ্ড সহযোগিতা ও আলামত নষ্ট করার দায়ে বিশ্বনাথের তৎকালীন ওসি শামিম মুসা, এসআই নুর ও ফজলুল হককে ক্লোজ করা হয়।
তৎকালীন বিশ্বনাথ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) রমা প্রসাদ চক্রবর্তী দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৩২ জনের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর এ মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করেন।
গত ১৩ জুলাই মামলাটি যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করা হয়। ওইদিন আদালত ৩০ জন আসামিকে জেলে পাঠান। মামলায় মোট ২৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত রায় দেন।
আসামিদের মধ্যে মামুনুর রশিদ নামের এক আসামি ছাড়া সবাই রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। মামুনুর রশিদ ঘটনার পর থেকেই পলাতক। ঘটনার পর পালিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে গেলেও প্রধান আসামি ওয়াটার লর্ড সাইফুল আদালতে আত্মসমর্পনের পর থেকে প্রায় পৌঁনে চার বছর ধরে কারাবন্দি রয়েছেন।
আলোচিত এ ঘটনার পরপরই চাউলধনী হাওর এলাকায় ৩০ গ্রামের মানুষজনকে নিয়ে ‘চাউলধনী হাওর রক্ষা ও কৃষক বাঁচাও আন্দোলন’ নামের একটি অরাজনৈতিক মোর্চা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল। ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর সংগঠনটি সিলেটে সংবাদ সম্মেলন করে স্কুলছাত্র হত্যার বিচার দাবি ও চাউলধনী হাওর ইজারামুক্ত করার দাবি জানিয়েছিল।
রায় ঘোষণার পর সংগঠনটির আহ্বায়ক আবুল কালাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘নিহত স্কুলছাত্র সুমেলের পরিবার রায়ে সন্তুষ্ট। তার চাচা নজির উদ্দিন দ্রুত রায় কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন। আর আমাদের দাবি হচ্ছে, হাওরটি ইজারামুক্ত হোক। ১৭৮ দশমিক ৯৮ একর আয়াতনের জলমহাল ভুয়া মৎস্যজীবীর নামে ইজারা বন্দোবস্ত বাতিল করা। সাইফুল যুক্তরাজ্য প্রবাসী হওয়ার সুবাদে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ওয়াটার লর্ড সেজেছিলেন। সেই ওয়াটার লর্ড ব্যবস্থাপনা ভেঙে চাউলধনী হাওরটি মুক্ত দেখতে চাই আমরা। এ জন্য উচ্চ আদালতেও লড়ছি আমরা।’
পপি/