গোপনে একজন প্রবাসীর স্ত্রীর গোসলের ভিডিও ধারণ করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি রাজধানীর কদমতলী এলাকার একটি বাড়িতে ভিডিও ধারণের এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। ওই বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে সন্তানসহ বসবাস করতেন ভুক্তভোগী।
ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে ডিএমপি কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তদন্তে ঘটনার সত্যতা মেলে। এমনকি জড়িতদের নামও প্রকাশ পায়। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী নারী মামলা করতে গেলে গড়িমসি শুরু করে থানা পুলিশ। জড়িতদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো এজাহার থেকে তাদের নাম বাদ দিতে চাপ দেন থানার একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই)।
ভুক্তভোগী ও তার স্বজনদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে গোপনে বাথরুমের ‘ভেন্টিলেটর’ দিয়ে গোসলের ভিডিও ধারণ করেছেন বাড়ির মালিক বা তার পরিবারের সদস্যরা। বাড়ির মালিক জাহানারা বেগম, ছেলে ঝন্টু, তার স্ত্রী তানিয়া আক্তার এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তারা ভিডিও ধারণের কিছুদিন পরেই ভুক্তভোগীর কাছে ও তার ইউরোপ প্রবাসী স্বামীকে ফোন করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন।
উপায় না দেখে ভুক্তভোগী নারী কদমতলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর ১৪৪০) করেন। সেই জিডির তদন্তে নেমে অভিযোগের সত্যতা পায় ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটের সিটি সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ। পরে তারা একটি তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে থানাপুলিশকে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশনা দেয়। কিন্তু থানাপুলিশ বাড়ি মালিক তথা ‘ব্ল্যাকমেইল’ চক্রের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়ে ভুক্তভোগীর অভিযোগকে আর তেমন আমলে নিচ্ছে না বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এই অপরাধী চক্রকে মদদ দিয়ে যাচ্ছেন কদমতলী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবদুল আউয়াল। কেননা, সিটিটিসির তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ভুক্তভোগী জড়িতদের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করতে গেলেও এসআই আউয়াল তাদের নাম ছাড়াই অভিযোগ দিতে চাপ দেন। এমনকি বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেও তার আগেই এসআই আউয়াল বিষয়টি নিয়ে ওসির কাছে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেন। যদিও সেই ওসি অতি সম্প্রতি বদলি হয়েছেন অন্য থানায়।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কদমতলী থানার এসআই আবদুল আউয়াল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আসামিদের নাম তো তদন্ত করলে এমনি চলে আসত। তাই নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাত আসামি হিসেবে মামলা করতে ভুক্তভোগীকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কোনো চাপ বা আসামিপক্ষের সঙ্গে আমার সখ্যের বিষয় নেই। তাছাড়া আমি আসামিদের বাড়িও চিনি না, কোনো দিন কথাও হয়নি।’
থানা সূত্রে জানা যায়, ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার ওই নারী কদমতলী থানায় গত ১৯ অক্টোবর একটি জিডি করেন। তদন্তে সহায়তার জন্য ২৩ অক্টোবর ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটের কাছে আবেদন করেন জিডির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আবদুল আউয়াল। ভুক্তভোগীর ফোন পরীক্ষা, নম্বর অনুসন্ধান ও প্রযুক্তিগত তদন্তে সিটিটিসি অভিযোগের সত্যতা পায়। জিডির অজ্ঞাত তিন নম্বরের ব্যবহারকারীসহ সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র শনাক্ত করে সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ।
অনুসন্ধানে উঠে আসে জিডিতে থাকা অভিযুক্ত দুটি মোবাইল ফোন নম্বরের একটি তানিয়া আক্তার নামে একজনের এবং অন্যটি তার শ্বশুর মৃত দুলাল মিয়ার নামে নিবন্ধিত। তাদের এই সিম এই অপরাধে ব্যবহার করা হয়েছে। এরপর সিটিটিসি কর্মকর্তারা অভিযুক্তদের ওই মোবাইল নম্বরে ফোন করেন এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বিষয়টি নিয়ে কথা বললেই সতর্ক হয়ে যায় চক্রটি। পরে সিটিটিসির তদন্ত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেন এসআই আবদুল আউয়াল। এরই মধ্যে ভুক্তভোগী ও তার স্বজনরাও সবকিছু জেনে যান। সে অনুসারে ভুক্তভোগী নারী সুবিচার পাওয়ার আসায় থানায় গিয়ে একাধিকবার আসামিদের নাম উল্লেখ করে মামলা করতে চাইলেও টালবাহানা শুরু করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আবদুল আউয়াল।
ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করে খবরের কাগজকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন থানায় পৌঁছালেও এসআই আবদুল আউয়াল তিন সপ্তাহ তা গোপন রাখেন এবং মামলা নিতে বিভিন্ন অজুহাত দেখাতে থাকেন। পরে থানার অন্য কর্মকর্তার মাধ্যমে নিশ্চিত হই, সিটিটিসির তদন্ত প্রতিবেদন থানায় পৌঁছেছে। তাকে ফোন করে প্রতিবেদন ‘রিসিভ করার’ বিষয়ে বললেও তিনি অস্বীকার করেন। এ কারণে তদন্ত কর্মকর্তা থানায় এসে আমার সঙ্গে অপেশাদার আচরণ করেন। পরে চাপের মুখে তিনি প্রতিবেদন বের করলেও অভিযুক্তদের নাম বাদ দিয়ে মামলায় কেবল মোবাইল নম্বর ও অজ্ঞাতনামা আসামি উল্লেখ করতে চান। এতে আপত্তি জানালে তিনি অপেশাদার আচরণ করেন।
সিটিটিসি সূত্রে জানা গেছে, জিডির অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতিবেদন দেয় সিটিটিসি। ওই প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম-পরিচয়, ভুক্তভোগীর স্বজনদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠানো মানহানিকর ছবি ও ভিডিওর প্রমাণ মিলেছে। অবশ্য সেই তদন্ত প্রতিবেদনের একটি কপি খবরের কাগজের কাছেও সংরক্ষিত আছে।
ভুক্তভোগীর স্বজনরা জানান, ভুক্তভোগীর স্বামী ইউরোপ প্রবাসী। ২০২৪ সালের অক্টোবরে কদমতলী থানার ধোলাইপাড়ের ধনিয়া এলাকার ওই ভাড়া বাসায় ওঠেন ভুক্তভোগী নারী। ঘটনা সম্পর্কে তারা জানান, চলতি বছরের জুনের শুরুতে বাড়ির মালিক জাহানারা বেগম ভুক্তভোগীর ফ্ল্যাটের বাথরুম সংস্কার করার কথা জানান। এ কারণে ভুক্তভোগী পাশের এলাকায় তার বোনোর বাসায় চলে যান। জুলাইতে কাজ শেষ হলে তাকে আবার ফ্ল্যাটে উঠতে বলা হয়। কিন্তু ফ্ল্যাটের ‘সংস্কার’ করা বাথরুমে কয়েক দিন পানি ব্যবহার করা যাবে না বলে জানান বাড়িওয়ালা। একপর্যায়ে ভুক্তভোগীকে বাড়িওয়ালা তার নিজের ফ্ল্যাটের বাথরুম ব্যবহার করার কথা বলেন। সেই সময়েই টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে ভুক্তভোগী নারীর গোসলের ভিডিও ধারণ করেন বাড়িওয়ালা পরিবারের সদস্যরা। এরপর বাড়িওয়ালা পরিবারের আচরণ পাল্টে যেতে থাকে। একপর্যায়ে গত সেপ্টেম্বরে ভুক্তভোগী নারী বাসাটি ছেড়ে দেওয়ার কথা জানিয়ে দিলে তখনই শুরু হয় ব্ল্যাকমেইলিং। ভুক্তভোগীর হোয়াটসঅ্যাপে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে দেড় লাখ টাকা দাবি করা হয়; অর্থ না দিলে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। ওই ভিডিও দেখে ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন, ভিডিওটি বাড়িওয়ালার বাসার বাথরুমে। এভাবে পরে ভুক্তভোগীর স্বামীসহ আরও একাধিক স্বজনের কাছে ভিডিও-ছবি পাঠিয়ে টাকার জন্য চাপ দিতে থাকেন অভিযুক্তরা।
এ বিষয়ে জানতে ওই বাড়িওয়ালা পরিবারের একটি নম্বরে ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।