কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী খাল এখন মাদক পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। মাছ শিকারের আড়ালে এক শ্রেণির মাদককারবারি বৈধ মাছ ব্যবসাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে মায়ানমার থেকে বোটে করে নিয়মিতভাবে নৌপথে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের বড় বড় চালান দেশে আনছে।
জানা যায়, কয়েক বছর আগে কায়ুকখালী বোটঘাটে মাত্র ৪০-৫০টি বোট ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে কিছু চিহ্নিত মাদককারবারি নামে-বেনামে বিপুলসংখ্যক বোটের মালিক হয়ে যান। এসব বোট মাদক পরিবহনের কাজে ব্যবহার হচ্ছে। প্রশাসনের নজর এড়িয়ে মাদককারবারিরা এ ঘাটকে মাদক পাচারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার চেষ্টা করছে। আর এতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। কারণ এলাকার কিশোর-তরুণসহ অনেকেই এসব মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সদস্যরা বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে মাদকসহ কারবারিদের আটক করেছেন। বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক খবরের কাগজকে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ১২ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে কোস্টগার্ড স্টেশন টেকনাফের একটি দল পৌরসভার কায়ুকখালী বোটঘাট এলাকার একটি ফিশারিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় মাছ সংরক্ষণের কক্ষের ভেতর অভিনব কায়দায় লুকানো অবস্থায় ৯ হাজার ৮০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার এবং এক মাদক পাচারকারীকে আটক করে।
সিয়াম-উল-হক জানান, ২ অক্টোবর শাহপরী আউটপোস্টের সদস্যরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নাফ নদে বিশেষ অভিযান চালিয়ে একটি মাছ ধরার বোট থেকে ২০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেন।
এর আগে চলতি বছরের ১০ এপ্রিল মধ্যরাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্টগার্ড আউটপোস্ট শাহপরীর দ্বীপ এবং র্যাব-১৫ সিপিসি-১-এর একটি যৌথ দল টেকনাফের ময়দানের ঘোলাসংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানের সময় একটি ইঞ্জিনচালিত কাঠের বোট সন্দেহজনক আচরণ করলে থামার সংকেত দেওয়া হয়। কিন্তু সংকেত অমান্য করে বোটটি পালিয়ে যায়। প্রায় এক ঘণ্টা ধাওয়া করে গভীর সমুদ্র থেকে বোটটি আটক করা হয়।
পরবর্তী সময়ে তল্লাশিতে জালের ভেতরে একটি বস্তায় বিশেষভাবে লুকানো ৫০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি সাত মাদক পাচারকারী মাঝিমাল্লাকে আটক করা হয়। আটক ট্রলারটি কায়ুকখালী ঘাটের বলে জানা যায়।
এদিকে উখিয়া ৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জসীম উদ্দীন জানান, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী খালের ফিশারিঘাট এলাকায় বিজিবির ৬৪ ও ২ নম্বর ব্যাটালিয়নের যৌথ অভিযানে একটি মাছ ধরার বোট থেকে ১ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। বোটটির মালিক রশিদ উল্লাহ ওরফে কালা পুতিয়ার। তিনি রোহিঙ্গা হলেও টেকনাফ পৌরসভার কলেজপাড়ায় বসবাস করেন এবং তার একটি মাদকের সিন্ডিকেট রয়েছে। এ অভিযানে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী বোট মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমেদ বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মাদক ও মানব পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বোট মালিকদের বিরত রাখার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছি। আমাদের সমিতির আওতাধীন প্রতিটি ফিশিং বোট মালিকের কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়েছে। তাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, যদি কোনো বোট মাদক চোরাচালান বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট মালিক দায়ী থাকবেন এবং সব দায়ভার তিনিই বহন করবেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বোট মালিক বলেন, ‘বউয়ের স্বর্ণের অলংকার বিক্রি করে একটি বোট কিনেছি সংসার চালানোর জন্য। কিন্তু কিছু মাদক কারবারি রোহিঙ্গা মাঝিদের সহযোগিতায় মাছ ধরার নামে নৌপথে মায়ানমার থেকে ইয়াবা আনছে। এতে বৈধ ব্যবসা ধ্বংসের মুখে পড়ছে।’
কক্সবাজার র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসান বলেন, ‘আমরা মাদকবিরোধী মিটিং ও কনফারেন্সে জেলেদের নিবন্ধনের বিষয়ে আলোচনা করে থাকি। আমরা মাছ ধরার বোট ও ট্রলারগুলোতে জিপিএস ট্র্যাকার বসানোর চিন্তা করছি। এতে এগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে। মাছ শিকারে যাওয়া ট্রলার সীমান্ত পার করলে আমাদের কাছে নোটিফিকেশন যাবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে না ফিরলে তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এসব উদ্যোগ গ্রহণ করলে মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে আশা করছি।’
স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল আলম বলেন, ‘কিছু অসাধু মানুষের কারণে বৈধ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া যুবসমাজ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক, এটাই আমাদের দাবি।