রাজধানীর মুগদা থানার মান্ডা এলাকা থেকে উদ্ধার ৮ টুকরা করা মরদেহটি সৌদি প্রবাসী মোকাররম মিয়ার (৩৭) বলে জানিয়েছে র্যাব। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে র্যাব-৩ হেলেনা বেগম (৪০) নামে এক নারী ও তার ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে গ্রেপ্তার করেছে। এ ছাড়া জড়িত সন্দেহভাজন প্রেমিকা তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনা (৩১) এখনো পলাতক।
র্যাব জানায়, পরকীয়ার জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।
সোমবার (১৮ মে) বিকেলে র্যাব-৩ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
তিনি জানান, গত ১৪ মে মোকাররমকে হত্যার পর মরদেহ গুম করতে খণ্ড-বিখণ্ড করে ভাড়া বাসার বেজমেন্টের নিচে ফেলে রাখা হয়। এ ঘটনার পরদিন অভিযুক্ত তাসলিমা, তার বান্ধবী হেলেনা, হেলেনার মেয়ে রাতে ‘পার্টিও’ করেন। পরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের খবরে পুলিশ গিয়ে গত রবিবার বিকেলে মরদেহের সাতটি টুকরো উদ্ধার করে।
পরে জড়িত সন্দেহভাজন হেলেনা ও তার কিশোরী মেয়েকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে নিহতের পরিচয় জানিয়ে খুনের বিষয়ে তারা নানা তথ্য দেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে রাতেই ওই বাসা থেকে এক কিলোমিটার দূরের একটি স্থান থেকে নিহতের বিচ্ছিন্ন মাথার অংশটি উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমেও নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মোকাররমের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ গতকাল নিহতের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে ফায়েজুল আরেফীন বলেন, মোকাররমের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একই গ্রামের সৌদিপ্রবাসী সুমনের সুসম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রে সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনার সঙ্গে মোকাররমের পরিচয় হয়।
মোকাররম সৌদিতে থাকা অবস্থায় একপর্যায়ে তাসলিমার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। এ সম্পর্কের সূত্র ধরে মোকাররম বিভিন্ন সময় তাসলিমাকে পাঁচ লাখের বেশি টাকা দেন।
গত ১৩ মে মোকাররম সৌদি থেকে দেশে ফিরে ঢাকার কমলাপুর এলাকায় তাসলিমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখান থেকে তাসলিমা মোকাররমকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মান্ডা এলাকায় তার বান্ধবী হেলেনার ভাড়া বাসায় গিয়ে ওঠেন। তাসলিমা ও হেলেনা দুজনের বাবার বাড়িই নরসিংদী জেলায়। দুই কক্ষের ওই বাসায় বান্ধবী হেলেনা তার দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন।
হেলেনার সেই বাসায় গিয়ে তাসলিমাকে বিয়ের জন্য চাপ দেন মোকাররম। কিন্তু রাজি হচ্ছিলেন না প্রেমিকা তাসলিমা। তখন মোকাররম তার দেওয়া সব টাকা ফেরত দিতে বললে এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়।
ঝগড়ার একপর্যায়ে মোবাইলে থাকা তাদের দুজনের বিভিন্ন আপত্তিকর ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন মোকাররম। তার মাঝেই সে রাতে মোকাররম তাসলিমার বান্ধবী হেলেনার কিশোরী মেয়ের সঙ্গেও অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। সেটি দেখে হেলেনাও ক্ষুব্ধ হন।
সব মিলিয়ে তাসলিমা-হেলেনা মোকাররমকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরদিন সকালে পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয় মোকাররমকে। পরে ঘুমের প্রভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে হেলেনা বালিশচাপা দিয়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করেন। এ সময় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাসলিমা হাতুড়ি দিয়ে আঘাতের চেষ্টা করলে মোকাররম সেটি ধরে ফেলেন। তখন হেলেনা বঁটি দিয়ে মোকাররমের গলায় কোপ দেন। মোকাররম হাতুড়ি ছেড়ে মেঝেতে পড়ে যান।
তখন হেলেনার কিশোরী মেয়ে সেই হাতুড়ি নিয়ে মোকাররমের মাথায় আঘাত করেন। একপর্যায়ে মোকাররমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে বাথরুমে নিয়ে মরদেহ টুকরো করে আলাদা পলিথিনে ভরেন তারা। হত্যার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর গভীর রাতে মরদেহের সাতটি খণ্ড বাসার নিচে বেজমেন্টে এবং মাথার অংশ প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ফেলে দেন তারা।
ঘটনা নিয়ে অন্যদের সন্দেহ এড়াতে হেলেনা ও তাসলিমাসহ তারা সবাই পরদিন বাইরে ঘুরতে যান, হোটেলে বিরিয়ানি খান এবং রাতে বাসার ছাদে গান-বাজনার পার্টি দেন। পর দিন তাসলিমা তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীতে চলে যান।