নীলগিরি পাহাড়ের কোলঘেঁষে ছোট্ট একটা বাংলো। নাম ‘নীলকুঠি’। সেখানে গরমের ছুটি কাটাতে শহর থেকে এসেছে ১০ বছরের অয়ন আর তার প্রিয় বন্ধু টিটো। অয়ন একটু শান্ত প্রকৃতির হলেও টিটো ছিল মহাবীর। গোয়েন্দাগিরি আর রহস্যঘেরা কাজকর্ম ছিল তার পছন্দের। তার পকেটে সব সময় একটা আতশি কাচ আর একটা ছোট নোটবুক থাকত। সে নিজেকে মনে মনে ফেলুদা বা শার্লক হোমসের উত্তরসূরি ভাবত।
নীলকুঠির মালিক অয়নের দাদু, অবিনাশ বাবু। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক। বাংলোর একপ্রান্তে ছিল পুরোনো একটা লাইব্রেরি। লাইব্রেরি ঘরটা রহস্যে ঠাসা। সেখানে ছিল পুরোনো বইয়ের গন্ধ আর ধুলোমাখা নানা ধরনের কাগজপত্রের ছড়াছড়ি।
সেদিন বিকেলের আকাশটা ছিল অদ্ভুত রকম লাল। দাদু লাইব্রেরিতে বসে প্রাচীন তাম্রলিপি পড়ছিলেন। হঠাৎ ফোন এল আর তিনি গম্ভীর মুখে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, ‘লাইব্রেরি ঘরের নীল ড্রয়ারটা কেউ যেন না খোলে।’
টিটো ভীষণ অবাক হলো তার চোখে দেখা দিল রহস্যের ঝিলিক। সে ফিসফিস করে বলল, ‘অয়ন, কোনো কিছু বারণ করা মানেই সেখানে দারুণ কিছু লুকিয়ে আছে। চল তো গিয়ে দেখি ব্যাপারাট আসলে কী! দাদু কেন আমাদের নিষেধ করল।’
অয়ন ভয় পেলেও কৌতূহলী হয়ে উঠল। ড্রয়ারটা লক করা ছিল না। খুলতেই দেখা গেল ভেতরে কিছুই নেই, শুধু একটা ছোট রুপার কৌটা। কৌটাটি খুলতেই বেরিয়ে এল একটা চিরকুট। তাতে কাঁপাকাঁপা হাতে লেখা–
‘সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে, ছায়া পড়ে ওই বুড়ো বটের মূলে। সাত কদম ডাইনে গিয়ে দেখবে যা, নীলমণি হারানো সে যে অমূল্য ছায়া।’
টিটো উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘এটা তো একটা ধাঁধা! নীলমণি? দাদুর কাছে শুনেছিলাম রাজবাড়ির একটা নীলকান্তমণি অনেক বছর আগে চুরি হয়ে গিয়েছিল। এটা কি তবে তারই খোঁজ?’
দুই বন্ধু বেরিয়ে পড়ল বাংলোর পেছনের বড় বাগানে। বাগানের এক কোণে একটা বিশাল পুরোনো বটগাছ। তখন ঠিক সূর্যাস্ত হচ্ছে। পশ্চিমের সূর্য দিগন্তে হেলে পড়তেই বটগাছের লম্বা ছায়া মাটিতে পড়ল। টিটো কম্পাস বের করে ঠিক সাত কদম মেপে হাঁটল। সেখানে একটা বড় পাথর পড়ে আছে।
পাথরটা সরাতেই দেখা গেল একটা মাটির গর্ত। আর সেই গর্তের ভেতর একটা কাঠের বাক্স। কিন্তু বাক্সটা খুলতেই দুজনেই অবাক! ভেতরে কোনো মণি নেই, আছে একটা পুরোনো চাবি আর একটা স্কেচ ম্যাপ। ম্যাপে নির্দেশ করা আছে নীলকুঠির ঠিক নিচের মাটির ঘর বা বেজমেন্টের দিকে।
বেজমেন্টের দরজাটা সব সময় বন্ধ থাকে। অয়ন আর টিটো চুপিচুপি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। চাবিটা পুরোনো মরিচা ধরা তালায় লাগাতেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। টিটো তার টর্চটা জ্বালাতেই চারপাশটা ঝকঝক করে উঠল।
সেখানে সারি সারি কাঠের আলমারি। হঠাৎ একটা খসখস শব্দ শোনা গেল। কেউ কি আছে এখানে? অয়ন টিটোর হাত শক্ত করে চেপে ধরল। টর্চের আলোয় দেখা গেল একটা ছায়া দেয়ালের ওপর দিয়ে সরে যাচ্ছে।
‘কে ওখানে?’ টিটো সাহসের সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল।
কোনো উত্তর নেই। কিন্তু দেয়ালের এক জায়গায় একটা অদ্ভুত ছবি আঁকা–একটা নীল রঙের চোখ। ঠিক সেই চোখের মণির জায়গায় একটা গর্ত। টিটো বুঝল, তাদের খুঁজে পাওয়া রুপার কৌটাটির আকার আর এই গর্তের আকার এক। সে পকেট থেকে কৌটাটি বের করে গর্তে বসিয়ে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে একটা যান্ত্রিক শব্দ হলো। দেয়ালের একটা অংশ আলত করে সরে গেল। ভেতরে দেখা গেল ছোট একটা কুঠুরি। আর সেখানে রাখা একটা ভেলভেটের বাক্স। বাক্সটা খুলতেই সারা ঘর নীল আলোয় ভরে গেল। ওটাই সেই হারিয়ে যাওয়া ‘নীলমণি’!
ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে কেউ হাততালি দিয়ে উঠল। অয়ন আর টিটো চমকে ফিরে তাকাতেই দেখল দাদু দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখে রহস্যময় হাসি।
‘দারুণ কাজ করেছ তোমরা!’ দাদু বললেন।
অয়ন অবাক হয়ে বলল, ‘দাদু! তুমি এখানে? তুমি কি সব জানতে?’
দাদু হেসে বললেন, ‘আসলে এই নীলমণিটা আমাদের পূর্বপুরুষদের সম্পদ। কিন্তু এটা পাওয়ার জন্য তোমাদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর সাহস পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম আমি। ওই চিরকুট আর চাবি আমিই রেখেছিলাম তোমাদের গোয়েন্দাগিরি পরীক্ষা করার জন্য। তবে হ্যাঁ, বাগানের ওই ছায়া আর ম্যাপের হিসাবটা মেলাতে তোমাদের যে বুদ্ধি কাজ করেছে, তাতে আমি মুগ্ধ।’
টিটো টুপ করে তার পকেট থেকে নোটবুক বের করে বড় বড় করে লিখল– ‘অপারেশন নীলমণি: সফল।’
নীলগিরির পাহাড়ে তখন রাত নেমেছে। ঝিঁঝিঁপোকার ডাক আর পাহাড়ের ঠাণ্ডা হাওয়ায় দুই খুদে গোয়েন্দার রোমাঞ্চকর দিনটি শেষ হলো এক চরম তৃপ্তিতে। তারা বুঝতে পারল, রহস্য শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না, সাহস আর বুদ্ধি থাকলে তাকে জয় করা যায় যেকোনো জায়গায়।