দেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে ‘বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫’ পুনর্বিবেচনা, চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা উন্নয়ন ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ৩ বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) বিজিএমইএ কমপ্লেক্সের নুরুল কাদের অডিটরিয়ামে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব আহ্বান জানানো হয়।
বিজিএমইএ সভাপতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সদ্য অনুমোদিত ‘বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর কতিপয় বিধান, বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, দ্বৈত পেনশন স্কিম এবং শ্রমিক সংজ্ঞায়িত করার মতো বিষয়গুলো, দেশের বাস্তবতা ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই ধারাগুলো কার্যকর হলে শিল্পে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিজিএমইএর সভাপতি বলেন, পোশাকশিল্পসহ দেশের সমগ্র উৎপাদনমুখী শিল্প বর্তমানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে, সরকার ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধন অধ্যাদেশে’ নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছে। এখানে ভারসাম্যহীন ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত টিসিসি ও ওয়ার্কিং কমিটিতে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে ধাপে ধাপে শ্রমিকের সংখ্যা নির্ধারণে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। যেখানে প্রথম ধাপে ৫০ থেকে ৫০০ শ্রমিকের কারখানায় ন্যূনতম ৫০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ ছিল। কিন্তু পরে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় একতরফাভাবে সেটি পরিবর্তন করে ২০-৩০০ শ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ধাপ করা হয়েছে পাঁচটি।
তিনি বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত বাস্তবতা বিবর্জিত। কারণ মাত্র ২০ জন শ্রমিক দিয়ে একটি ইউনিয়ন গঠন করা হলে কারখানাগুলোতে এমন ব্যক্তিরা ট্রেড ইউনিয়ন করবেন, যারা ওই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন। এটি অন্তর্দ্বন্দ্ব ও শিল্পে অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। উৎপাদন ব্যাহত করবে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমবে এবং উদ্যোক্তারা নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পরিচালনায় নিরুৎসাহিত হবেন।’
তারা বলেন, এই মাশুল বৃদ্ধি অযৌক্তিক। কারণ ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নে গত ৪০ বছরে টাকার অঙ্কে মাশুল এরই মধ্যে ৩০৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা বন্দরের মাশুল না বাড়িয়ে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের নেতারা বলেন, বন্দরের সেবার বিপরীতে প্রায় ৪১ শতাংশ মাশুল বৃদ্ধি শিল্পের পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।
মাহমুদ হাসান খান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, গ্যাসসংকটের দ্রুত সমাধান, কাস্টমস ও এনবিআর প্রক্রিয়ার সহজীকরণ, অবকাঠামো ও লজিস্টিক উন্নয়ন এবং স্বল্প ব্যয়ে অর্থায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘আমাদের প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখতে হলে এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পথ মসৃণ করতে হলে সরকারকে সময়োপযোগী উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা অনুরোধ করছি, রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা অন্তত তিন বছর পিছিয়ে দেওয়া হোক।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার উপদেষ্টা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি স্থিতিশীল ও উন্নত অর্থনীতি উপহার দিতে হলে উৎপাদনমুখী শিল্পের বাস্তব চাহিদা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতা বিবেচনা করে দ্রুত ইতিবাচক ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।’
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তৈরি পোশাকশিল্পের সমস্যা তুলে ধরতে চার মাস ধরে সময় চেয়েও সাক্ষাৎ পাননি। কারও সঙ্গে নেগোসিয়েশন করতে হলে তার সঙ্গে বসতে হয়। তিনি যদি সময় না দেন তাহলে কীভাবে নেগোসিয়েশন করব? আমরা বারবার সময় চেয়েও সময় পাইনি।’
তিনি বলেন, ‘স্টারলিংকের কোম্পানি স্পেসএক্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট এলে তার সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা দেখা করেন। যে কোম্পানি ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। অথচ তিনি ৪০ বিলিয়ন ডলারের খাতের প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করেন না।’
সরকার ব্যবসায়ীদের চেয়ে বিদেশিদের কথায় বেশি গুরুত্ব দেয়: বিকেএমইএ সভাপতি
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ব্যবসায়ীদের চেয়ে বিদেশিদের কথায় বেশি গুরুত্ব দেয় বলে অভিযোগ করে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সমস্যাগুলো সরকারকে জানাতে চেয়েও বারবার ব্যর্থ হয়েছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর মুনাফায় রয়েছে। প্রতিবছর এই বন্দরে ভালো মুনাফা হচ্ছে। সর্বশেষ বছরে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে এই বন্দর। তার পরও সরকার বিভিন্ন পণ্য সেবার মাশুল একলাফে ৪১ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি ৫-১০ শতাংশ বাড়ানো যেত। কিন্তু একলাফে ৪১ শতাংশ বাড়ানো কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।’
তিনি বলেন, ‘বিদেশি কোনো পক্ষের কাছে বন্দর ছেড়ে দেওয়ায় পরিচালন ব্যয় যদি না কমে, তাহলে সেটি করায় আমাদের স্বার্থ কী? বিদেশি একটি পক্ষকে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, এতে খরচ তো কমার কথা। উল্টো মাশুল বাড়ানো হচ্ছে। এটি তো হওয়ার কথা নয়।’
সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সভাপতিত্ব করেন। বিজিএমইএর অন্য প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের নেতাদের মধ্য থেকে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ); বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম; বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএপিএমইএ) এর সভাপতি মো. শাহরিয়ার, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) এর সভাপতি তাসকীন আহমেদ, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি) এর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বাপি) সিইও মেজর জেনারেল (অব.) মো. মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।