২০২৬ সালের অমর একুশে বইমেলা রমজান মাসে আয়োজনের সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের সৃজনশীল প্রকাশকরা। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির বইমেলা স্ট্যান্ডিং কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তারা বলেন, এই সিদ্ধান্ত কেবল সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাতে রাজধানীর একটি রেস্তোরাঁয় এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গফুর হোসেন এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির পরিচালক আবুল বাশার ফিরোজ শেখ খবরের কাগজকে এই তথ্য জানিয়েছেন।
সভায় জানানো হয়, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালের অমর একুশে বইমেলা ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, যা কার্যত পুরো আয়োজনকে পবিত্র রমজান মাসের মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশকদের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা বলছে, রমজানে বইমেলা আয়োজন মানেই প্রকাশকদের জন্য প্রায় নিশ্চিত লোকসান।
সৃজনশীল প্রকাশকরা বলেন, তারা বইমেলার বিরোধিতা করছেন না। বরং বইমেলাকে জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক হিসেবেই দেখেন। তবে যে আয়োজন একটি পুরো শিল্পকে আর্থিকভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়, সেটি কীভাবে টেকসই হতে পারে—সে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তাদের ভাষায়, বইমেলা তখনই অর্থবহ, যখন প্রকাশকরা অন্তত টিকে থাকার সুযোগ পান।
সভায় উল্লেখ করা হয়, করোনাকালীন দীর্ঘ স্থবিরতার ধাক্কা প্রকাশনা শিল্প এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একের পর এক লোকসানি বইমেলা, পাঠকসংখ্যার উল্লেখযোগ্য হ্রাস এবং কাগজ ও মুদ্রণ ব্যয়ের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। এসব সম্মিলিত চাপের কারণে ইতোমধ্যে বহু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। যারা টিকে আছে, তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
রমজান মাসে বই বিক্রির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে প্রকাশকরা জানান, দিনের বেলায় পাঠক প্রায় অনুপস্থিত থাকেন। সন্ধ্যার পর ইফতার, তারাবি ও ধর্মীয় ব্যস্ততার কারণে বইমেলায় আসার সুযোগ ও মানসিকতা দুটোই সীমিত হয়ে পড়ে। রমজানের শেষভাগে ঈদের প্রস্তুতি ও গ্রামে ফেরার চাপ বাড়ায় ঢাকা শহর ক্রমেই ফাঁকা হতে থাকে। ফলে পরিবার নিয়ে বইমেলায় যাওয়ার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে প্রকাশকদের ব্যয় একটুও কমে না। স্টল ভাড়া, নির্মাণ ব্যয়, কর্মচারীদের বেতন, পরিবহনসহ সব আনুষঙ্গিক খরচ অপরিবর্তিত থাকে। এতে বিক্রি কমলেও ব্যয় থেকে যায় আগের মতোই, যার ফলাফল হয় নিশ্চিত লোকসান।
এছাড়া আসন্ন নির্বাচন, নতুন সরকার গঠন ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে সারাদেশে যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে, তাতেও বইমেলার প্রস্তুতি ও আয়োজন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, স্টল লটারি ও হস্তান্তরের সময়সূচি নিয়েও এখনো স্পষ্ট ধারণা নেই বলে জানান প্রকাশকরা।
এই প্রেক্ষাপটে সৃজনশীল প্রকাশকদের একমাত্র দাবি—অমর একুশে বইমেলা অবশ্যই ঈদের পর আয়োজন করতে হবে। তাদের মতে, এটি কোনো রাজনৈতিক বা আবেগী দাবি নয়; বরং একটি সৃজনশীল শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য ন্যূনতম বাস্তবসম্মত প্রস্তাব। সিদ্ধান্ত গ্রহণে এখনই বাস্তবতা বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতে এর দায় এড়ানো যাবে না বলেও সভায় সতর্ক করা হয়।
জয়ন্ত সাহা/নাঈম