‘দুই দিন ধরে সব ধরনের খেজুরের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। বেশি দাম বেড়েছে কম দামের জাহিদি খেজুরের। এ জন্য বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে বাড়েনি ধনী লোকের মেডজুল খেজুরের দাম।’ রমজান উপলক্ষে এভাবে খেজুরের দাম বাড়ার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কারওয়ান বাজারের আল্লাহর দান ফল বিতানের বিক্রয়কর্মী মো. পারভেজ। তবে আমদানিকারকরা বলছেন, এবার রমজান উপলক্ষে চাহিদার তুলনায় দেড় গুণের বেশি খেজুর আমদানি হয়েছে। বাদামতলীর আড়তে পাইকারি পর্যায়ে খেজুরের কোনো দাম বাড়েনি। বরং মরিয়ম ও মেডজুল খেজুরের দাম কিছুটা কমেছে। পাইকারি ও খুচরায় কেজিতে পার্থক্য দেখা গেছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত।
দামের ব্যাপারে কারওয়ান বাজারের বিক্রমপুর ভ্যারাইটি স্টোরের মো. জাহিদ ও ফল বিক্রেতা মো. পারভেজ খবরের কাগজকে বলেন, খুচরা পর্যায়ে নিম্ন আয়ের কাছে প্রিয় খোলা জাহিদি খেজুর প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায়। এর পরই বরই খেজুর ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা, দাবাস ৫২০ থেকে ৫৫০, আলজেরিয়ান ও মাশরু ৬০০, সুক্কারি খেজুর ৮০০ টাকা। তবে উচ্চবিত্তের কাছে প্রিয় মরিয়ম ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, আজওয়া ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ ও মেডজুল ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। তারা আরও বলেন, রমজান ঘনিয়ে আসায় দাম কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে।
মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের আফজাল ফল ভান্ডারের মো. আনোয়ারসহ অন্য ফল বিক্রেতারাও একই তথ্য জানান। তারা বলেন, ‘পাইকারিতে বাড়লেই আমাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। আর না বাড়লে আগের মতোই দাম স্থিতিশীল থাকবে। কাজেই বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে। তাহলে পাইকারি বিক্রেতারা দাম বাড়াতে পারবেন না।’
পাইকারি বিক্রেতারাও বলছেন, এরই মধ্যে জাহিদি (প্যাকেটজাত) ও দাবাস কার্টনে (৫ কেজি) ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়ে ৪০০ ও ৪৬০ টাকা কেজি হয়েছে। তবে মরিয়ম ও মেডজুল খেজুরের দাম বাড়েনি, বরং কিছুটা কমতির দিকে।
এ ব্যাপারে বাদামতলীর আহসান উল্লাহ রোডের আল্লাহর দান ট্রেডার্সের বিক্রয়কর্মী মো. আনোয়ার খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগে পাঁচ কেজির জাহিদি খেজুরের কার্টন (৫ কেজি) ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করা হতো। বর্তমানে তা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। আমদানি কমেছে এমন খেজুরের দাম এখনই বাড়তি দাম। তবে মরিয়ম খেজুরের দাম কমে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা কার্টন বিক্রি হচ্ছে।’
এই বাজারের মেসার্স মুক্তা এন্টারপ্রাইজের দেলোয়ার, মেসার্স শিকদার এন্টারপ্রাইজের বিক্রয়কর্মী আবু সাইদসহ অন্য পাইকারি খেজুর বিক্রেতারা খবরের কাগজকে বলেন, আগে জাহিদি খেজুরের দাম বেশি ছিল। কয়েক দিন ধরে আরও বেড়েছে। তবে অন্য খেজুরের দাম বাড়নি। এক প্রশ্নের উত্তরে তারা আরও বলেন, ‘আড়তে দাম না বাড়ালে আমরাও বাড়াতে পারব না।’
এ সময় মোহাম্মদপুর এলাকার মো. শরিফুল নামে এক খুচরা ফল বিক্রেতা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা এই বাজার থেকে ফল কিনে খুচরা বাজারে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করি। যখন যে দামে কিনতে পারি সঙ্গে গাড়ি ভাড়া যোগ করে কিছু লাভ করে বিক্রি করি। কাজেই কম দামে কিনতে পারলে কম দামে বিক্রি করতে পারি। পাইকাররা বেশি দাম নিলে তখন বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।’
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আড়তে দাম বাড়লেই পাইকারিতে বাড়ে। তখন আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। কাজেই ভোক্তাদের কম দামে খেজুর খাওয়াতে হলে সরকারকে নজরদারি বাড়াতে হবে। দরকার হলে মেমো চেক করতে হবে। কত দামে কিনে কত দামে বিক্রি করছে তা দেখতে হবে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, খেজুরকে বিলাসী পণ্য হিসেবে গণ্য করে গত অর্থবছরে সরকার খেজুরে বেশি করে শুল্ক আরোপ করে। এর ফলে দাম অনেক বেড়ে যায়। ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকার খেজুর ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় ঠেকে। এ নিয়ে দেশে হইচই পড়ে। আমদানি অনেক কমে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার গত ২১ নভেম্বর আসন্ন পবিত্র রমজান সামনে রেখে খেজুরের আমদানি শুল্ক কমিয়েছে। পাশাপাশি রোজার ইফতারির অন্যতম অনুষঙ্গ এই পণ্যটির অগ্রিম কর পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্দেশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করে। পবিত্র রমজান মাসে খেজুরকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য খেজুর আমদানির ওপর বিদ্যমান কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ এবং বিদ্যমান ৫ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে অর্থাৎ মোট করভার ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৮ দশমিক ৭০ শতাংশ নির্ধারণ করে। যাতে কেজিতে ৬০ থেকে ১০০ টাকা কমতে পারে।
ব্যবসায়ীরা জানান, উচ্চ শুল্ক আরোপ ও ডলার সংকটের কারণে এটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। আমদানিকারকরা বলছেন, আগে থেকে এটা শুল্কমুক্ত থাকলেও গতবারের বাজেটে বিলাসবহুল আইটেম হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। এর ফলে প্রতি কেজি খেজুরে সব মিলিয়ে প্রায় ৬৫ শতাংশ বাড়তি কর দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ ১০০ টাকার খেজুর কিনতে ১৬৫ টাকা লাগছে। এই বাড়তি শুল্কের প্রভাবে কার্টনে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা বেড়ে গেছে। গত অর্থবছরে হঠাৎ করে সিডি, ভ্যাট, আরডি, এআইটি, এটি মিলে প্রায় ৬৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়।
আমদানিকারকরা আরও জানান, গত রমজানে যে দামে খেজুর বিক্রি হয় ঈদের পর আর দাম বাড়েনি। বরং এবারে দামি খেজুরের দাম কিছুটা কমেছে। এ ব্যাপারে ফল আমদানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার খেজুরকে বিলাসী পণ্য হিসেবে গণ্য করে বেশি করে কর বাড়ায়। এ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করা হলে ট্যাক্স কমানোর কারণে খেজুরের মানভেদে কেজিতে ৩৫ থেকে ২০০ টাকা দাম কমে। রমজান উপলক্ষে খেজুরের শুল্ক আরও কমালে ভোক্তারা কম দামে সুস্বাদু এই ফল খেতে পারবেন।’
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, ‘রমজানে কমবেশি ৫০ হাজার টন খেজুর লাগে। এবার রমজান উপলক্ষে ৮০ হাজার টন আমদানি হয়েছে। এটা চাহিদার দেড় গুণের বেশি। আমদানি করা খেজুরের অর্ধেক ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছে গেছে। বাকি অর্ধেক জাহাজে রয়েছে। দাম আগের মতোই আছে। বন্দরের কোনো সমস্যা না হলে দাম বাড়বে না। বর্তমানে গরিবের খেজুর নামে পরিচিত মানভেদে জাহিদি খেজুরের কেজি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি, তিউনিসিয়ার খেজুর ৩০০, দাবাস ৪৩০, বরই ৪২০, শুক্কারি ৫৫০ থেকে ৫৭০, শাফারি ৪৮০, আজওয়া ৮০০ থেকে ৯৫০, মরিয়ম ৯৪০ থেকে ৯৫০ ও মেডজুল খেজুর ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।’
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই থেকে জানানো হয়েছে, বছরে খেজুরের বার্ষিক চাহিদা ৯০ হাজার মেট্রিক টন থেকে এক লাখ টন। এর মধ্যে রমজান মাসে লাগে ৫০ হাজার টন। অন্যান্য মাসে ছয় হাজার টন করে লাগে। এসব খেজুর ইরাক, ইরান, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, সৌদি আরব, আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে সস্তা খেজুর আনা হয় ইরাক থেকে। আর দামি খেজুর সৌদি আরব থেকে। সবচেয়ে ভালো কোয়ালিটির খেজুর হচ্ছে মরিয়ম ও মেডজুল। এ জন্য দামও বেশি বাজারে।