দেশে বছরে ৩০ হাজার টন মধুর চাহিদা আছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে বাজারের চাহিদা পূরণ করেও রপ্তানি করা সম্ভব। একই সঙ্গে আমদানি-নির্ভরতা হ্রাস, নিরাপদ মধুর বাজার সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ আয়ের নতুন উৎস সৃষ্টি করা সম্ভব।
‘ইনসাইট অব বি কিপিং ইন নর্দান রিজিয়ন’ শিরোনামের গবেষণা থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
এখান থেকে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে কৃষি, বন ও মৎস্য খাতের জিডিপিতে অবদান ছিল প্রায় ১১.১৬ শতাংশ। মৌমাছির পরাগায়ন সরিষা, সূর্যমুখি, লিচু, কালোজিরা, ধনিয়া ও ফল-ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। মৌচাষকে এই বৃহত্তর কৃষি অর্থনীতির পরোক্ষ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
আজ বিশ্ব মৌমাছি দিবস। গবেষক ড. মনিরুল ইসলাম মৌচাষকে ক্ষুদ্র পেশা নয়, বরং কৃষি-শিল্প, আমদানি বিকল্প, নিরাপদ খাদ্য এবং গ্রামীণ জিডিপি বৃদ্ধির কৌশলগত খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরামর্শ দেন।
মধু উৎপাদন বাড়াতে এবং বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে সরকার একটি প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বগুড়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।
পাইলট প্রকল্পের গবেষণায় পাওয়া প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিভিন্ন উৎস থেকে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টন মধু সংগ্রহ করা হলেও ওই বছর চাহিদা ছিল প্রায় ৩৫ হাজার টন অর্থাৎ মধুর ঘটতি ছিল প্রায় ১০ হাজার টন।
‘ইনসাইট অব বি কিপিং ইন নর্দান রিজিয়ন’ শিরোনামে উত্তরাঞ্চলে ওই পাইলট প্রকল্পে গবেষণা করেন বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও বর্তমানে গোপালগঞ্জ আরডিএ মহাপরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, বগুড়া আরডিএ উপ-পরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম ও সহকারী পরিচালক অন্তরা খাতুন।
উত্তরাঞ্চলের সিরাজগঞ্জসহ ৫ জেলার ৭টি উপজেলায় এক বছরের এ প্রকল্পে মৌচাষের সমস্যা, সম্ভাবনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা করা হয়। পাইলট প্রকল্পের ওই গবেষণাটি করা হয়েছে পাবনা জেলার চাটমোহর, নাটোর জেলার গুরুদাসপুর, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া ও সদর, বিভাগীয় জেলা রাজশাহীর মোহনপুর ও সদর উপজেলা। আর দিনাজপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে।
ড. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মৌচাষ ও মধুর বাণিজ্যিক উৎপাদন আর বিপণন ঠিকভাবে করা সম্ভব হলে দেশে কর্মসংস্থান হবে কমপক্ষে ১ লাখ মানুষের। গবেষণায় দেখা গেছে, মসজিদভিত্তিক মধু বিপণন করা হলে ধর্মীয় নেতাদের বৈধ একটি রোজগারের পথও সৃষ্টি হবে।’
গবেষকরা বলছেন, মৌমাছি শুধু মধু উৎপাদন করে না: মৌমাছি কৃষি, পুষ্টি, পরিবেশ ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি জীবন্ত উৎপাদন শক্তি। এ গবেষণায় দেখা গেছে দেশে বছরের মধুর বাজার রয়েছে অন্তত ১২শ কোটি টাকার।
উপ-পরিচালক ড. মুনিরুল জানান, জলবায়ু সহনশীল মৌচাষ ও মৌমাছিভিত্তিক জীবিকা উন্নয়ন-বিষয়ক ৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলতি বছরের জানুয়ারিতে অনুমোদন করা হয়েছে। এ তহবিল দেবে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হলে একদিকে যেমন মানসম্মত মধু উৎপাদন সম্ভব হবে, তেমনি মধুর বাজারও সম্প্রসারণ হবে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে দেশে যে পরিমাণ মধু উৎপাদন হয়েছে তার ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই এসেছে চাষভিত্তিক মধু থেকে। মোট চাহিদার ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ মধুর চাহিদা এখনো পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
গবেষণায় তালিকাভুক্ত ৪শ মৌচাষির মধ্যে ৬০ জনকে নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়েছে, যা মোট মৌচাষির ১৫ শতাংশ। মোট মৌচাষির ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জ কেন্দ্রীভূত। এ তথ্য প্রমাণ করে, উত্তরাঞ্চল ইতোমধ্যে মৌচাষের বাস্তব কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে মৌচাষ এবং মধু উৎপাদন শিল্প ভিত্তিক করা সম্ভব।
গবেষণায় সুপার বক্স মধুর গুণাগুণ বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। সুপার বক্স ব্যবহারে ব্রুড বা বাচ্চা মৌমাছির অংশ থেকে মধু আলাদা রাখা যায়। এতে মৌমাছির ডিম ও লার্ভা নষ্ট হয় না, কলোনির স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং মধুর মান উন্নত হয়।
গবেষণার ল্যাব বিশ্লেষণে সুপার বক্সের সরিষা মধুতে আর্দ্রতা ২০ শতাংশের নিচে, পটেনশিয়াল অব হাইড্রোজেন (পিএইচ) কম এবং টোটাল সলিবল সলিড (টিএসএস) বেশি পাওয়া গেছে, যা ভালো মানের মধুর সূচক। একই সঙ্গে পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড ও প্রোলিনের উপস্থিতি মধুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণাগুণকে নির্দেশ করে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় সংকটও রয়েছে। গবেষকরা দেখেছেন, রানী মৌমাছির ইনব্রিডিং, মানসম্মত রানী মৌমাছির অভাব, স্বল্প কার্যকর জীবনকাল, দ্রুত দলত্যাগ, ব্রিডিং বিশেষজ্ঞের ঘাটতি, ফুলহীন মৌসুমে খাদ্য সংকট এবং চিনির উচ্চমূল্য মৌচাষিদের উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে। দেশে এখনো খরা বা ফুলহীন সময়ের জন্য মানসম্মত প্রি-মিক্স মৌমাছির খাদ্য সহজলভ্য নয়। আবার ফুডগ্রেড কন্টেইনারের অভাবে নিরাপদ সংরক্ষণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরিপক্ক মধু সংগ্রহের কারণে মধুর ঔষধি গুণাগুণ ও বাজারমান কমে যায়।
মৌজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও বড় সম্ভাবনা অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। পোলেন, প্রোপোলিস, রয়েল জেলি ও বি-ভেনম আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্য হলেও দেশে এগুলো সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণের পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। ফলে মৌচাষিরা শুধু কাঁচা মধু বিক্রিতে সীমাবদ্ধ থাকছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজার সিন্ডিকেট; মৌচাষিরা উৎপাদন করলেও ন্যায্যমূল্য অনেক সময় পান না।
আরডিএ গবেষকরা মনে করেন, কৃষকদের অংশগ্রহণে বগুড়াকে কেন্দ্র করে দেশের বৃহৎ মৌমাছি পালন ও মৌজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। এতে নিরাপদ মধু উৎপাদন, মাননিয়ন্ত্রণ, ফুডগ্রেড সংরক্ষণ, সরাসরি বাজার সংযোগ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যাবে। এই শিল্প যদি সমবায়ভিত্তিক কৃষক-উদ্যোক্তা মডেলে পরিচালিত হয়, তবে বাজার সিন্ডিকেট কমবে এবং ‘বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্য নিরাপদ মধু ও মৌজাত পণ্যের বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড’ তৈরি করা সম্ভব হবে।
সরকার ইতোমধ্যে সরিষা ও সূর্যমুখির মতো তেলবীজ ফসল সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই কর্মসূচির সঙ্গে মৌচাষ যুক্ত করা গেলে একই জমি থেকে তেলবীজ উৎপাদন, মধু উৎপাদন এবং পরাগায়ন সুবিধা—তিনটি লাভ একসঙ্গে পাওয়া যাবে।