দেশি, মোজাফফর ও চায়না জাতের লিচুর পাশাপাশি বাজারে উঠতে শুরু করেছে ঈশ্বরদীর বিখ্যাত ও সুস্বাদু বোম্বে লিচু। লাল লাল লিচুতে হাটবাজার এখন মুখর হয়ে উঠেছে। লিচুবাগান মালিক, ক্রেতা ও বিক্রেতারা ব্যস্ত সময় পার করছেন লিচু কেনাবেচায়। যার ফলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, ৭০০ কোটি টাকা বিক্রি হবে। লিচুচাষিরা বলছেন, এবার যত লিচু হয়েছে গত এক দশকে এমন ফলন দেখা যায়নি।
লিচুর জন্য সারা দেশেই পাবনার ঈশ্বরদীর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। চলতি মে মাসের শুরু থেকে হাটবাজারে লিচু বিক্রির মৌসুম শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ী ও চাষিদের ধারণা, জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে এ মৌসুমের লিচু বেচাকেনা।
স্থানীয় কয়েকজন লিচুচাষির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার ছলিমপুর ইউনিয়নে প্রথম লিচুর আবাদ শুরু হয়। পরে তা দাশুড়িয়া, সাহাপুরসহ অন্যান্য ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়ে। মৌসুম থেকে মৌসুমে গাছের সংখ্যা ও উৎপাদন বাড়তে থাকে। একসময় লিচু চাষ বাণিজ্যিক রূপ নেয়, যা বর্তমানে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
চাষিরা জানান, এখনো এলাকায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী অনেক লিচুগাছ রয়েছে। এসব গাছে আগের মতোই ফলন হয়। লিচুর প্রতি ভালোবাসা ও আবেগের কারণে লাভ-লোকসান যা-ই হোক না কেন, প্রতি মৌসুম শেষে নতুন মৌসুমের অপেক্ষায় থাকেন তারা।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার উপজেলায় ৩ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। লিচুবাগানের সংখ্যা ১২ হাজার ৩৬০টি। গাছ রয়েছে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০টি। প্রতিটি গাছে গড়ে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার লিচু ধরে।
উপজেলার ছলিমপুর, সাহাপুর, পাকশী, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি ও লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় রয়েছে শত শত লিচুবাগান। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাগান রয়েছে ছলিমপুর ও সাহাপুর ইউনিয়নে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ঈশ্বরদীতে মোজাফফর ও বোম্বাই জাতের লিচুর আবাদই বেশি।
ফল ব্যবসায়ীরা জানান, পাকিস্তান আমল থেকেই ঈশ্বরদীতে লিচুর আবাদ শুরু হয়। তখন গাছের সংখ্যা ছিল খুবই কম। হাটবাজারও এত বিস্তৃত ছিল না। গরু কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে করে লিচু এনে ঈশ্বরদী বাজারে বিক্রি করা হতো। সময়ের সঙ্গে উৎপাদন ও গাছের সংখ্যা বেড়েছে। মিষ্টি ও সুস্বাদু হওয়ায় ঈশ্বরদীর লিচু এখন সারা দেশে পরিচিত।
লিচুর মৌসুমে ছলিমপুরের শিমুলতলা ও সাহাপুরের আওতাপাড়া হাট হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল। ফজরের নামাজের পর থেকেই লাখ লাখ লাল লিচুতে ভরে যায় দুই হাট। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা চাষিদের কাছ থেকে লিচু কিনে ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যান।
আওতাপাড়া হাটের ফল ব্যবসায়ী মেসার্স রনি ট্রেডার্সের মালিক ইন্তাজ আলী প্রামাণিক বলেন, পাকিস্তান আমল থেকেই এ অঞ্চলে লিচুর আবাদ শুরু হয়। ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়লেও স্বাধীনতার পর লিচুর বাণিজ্যিক বিক্রি শুরু হয়। তখন জনসংখ্যা কম ছিল, বাজারও ছিল সীমিত। ঘোড়ার গাড়িতে করে ঈশ্বরদী বাজারে লিচু এনে বিক্রি করা হতো। এখন ঈশ্বরদীর লিচু সারা দেশে সরবরাহ করা হয়।
তিনি বলেন, দেশি ও চায়না লিচুর পাশাপাশি সুস্বাদু বোম্বে লিচু বাজারে উঠতে শুরু করেছে। প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। মাত্র আট ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ লিচু বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা। মধ্য জুন পর্যন্ত এ বেচাকেনা চলবে।
আওতাপাড়ার তুলনায় ছলিমপুরের শিমুলতলা হাটে আরও বেশি লিচুর আমদানি হয়। এ হাটের বাপ্পি ফল ভান্ডারের মালিক মো. আবুর আলী বলেন, গত ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি লিচুর উৎপাদন হয়েছে। প্রচুর সরবরাহ থাকায় দামও তুলনামূলক কম। বোম্বে লিচু ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা ও অন্য লিচু ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ লিচু কিনে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি জানান, রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর, পটুয়াখালী, খুলনা, বাগেরহাট, নেত্রকোনা, যশোর, কুষ্টিয়াসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা লিচু কিনতে আসছেন। শিমুলতলা হাটে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সাহাপুর ইউনিয়নের মহাদেবপুর এলাকার ৫০০ লিচুগাছের মালিক আশরাফ আলী জানান, তার সব গাছেই এবার লিচু ধরেছে। বোম্বে লিচুর পরিমাণ বেশি। মুকুল আসার পর থেকেই অন্য ভাইয়েরা মিলে পরিচর্যা করেছেন। এখন বিক্রি শুরু করেছেন এবং ভালো দাম পাচ্ছেন। এ মৌসুমে ৩০ লাখ টাকার লিচু বিক্রি হবে বলে তিনি জানান।
ছলিমপুরের চরমিরকামারী গ্রামের লিচুচাষি ও জাতীয় পদকপ্রাপ্ত কৃষক আব্দুল জলিল মণ্ডল যিনি ‘লিচু কিতাব’ নামে পরিচিত। তিনি বলেন, গাছের সংখ্যা, উৎপাদন ও চাহিদা বাড়ার কারণে ১৯৮০-এর দশকে ঈশ্বরদীতে লিচুর বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়। লাখ টাকার লেনদেন থেকে তা কোটিতে পৌঁছে এখন প্রতি মৌসুমে শত শত কোটি টাকার লিচু কেনাবেচা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার লিচুর উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। রোদে ফল ফেটে যাওয়া, পোকার আক্রমণ ও ঝরে পড়ার হারও ছিল খুব কম। ফলে লিচুর আকার বড় হয়েছে এবং স্বাদও ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, মুকুল আসা থেকে ফল পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত গাছের পরিচর্যায় চাষিদের সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়েছেন। এর ফলে উৎপাদন ও অর্থনৈতিক মূল্য দুটি বৃদ্ধি পেয়েছে।
আব্দুল মমিন জানান, চলতি মৌসুমে লিচু খাত থেকে ৬০০ কোটি টাকার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। তবে উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বছর ঈশ্বরদীর লিচু অর্থনীতি ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।