নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে এই মুহূর্ত থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা পালনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। গত মঙ্গলবার যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ আহ্বান জানান। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে এই মুহূর্ত থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে নিতে হবে। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে ভূমিকা, সে ভূমিকায় তাদের যেতে হবে। সে জন্য প্রথমে প্রশাসনকে পুরোপুরি নিরপেক্ষ করতে হবে, যাতে জনগণের মধ্যে একটা আস্থা তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলো এমন একটি সরকার, যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে এবং নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকে, যাতে এ সরকারের কার্যাবলি নির্বাচনের ফলাফলে কোনো প্রভাব সৃষ্টি না করে। এ সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করার জন্য নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকায় যেতে হবে। নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনিক রদবদল ও নিয়োগ নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক হলো। গত ১৩ অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বক্তব্য, কর্মকাণ্ড সাম্প্রতিক প্রশাসনিক রদবদল নিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উদ্বেগ তৈরি করে। দলের স্থায়ী কমিটির সভায় বিষয়টি ছিল প্রধান আলোচ্য। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিনরদবদল ও নতুন পদায়ন হয়েছে, সেখানে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এমনকি মাঠপর্যায়ের ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরিতেও ওই দলের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ অক্টোবর জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া আসে। ওই দলের নায়েবে আমির বলেন, ‘সরকারের কিছু উপদেষ্টা একটি বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করছেন।’ তাদের নাম ও কণ্ঠের রেকর্ড জামায়াতের হাতে আছে বলে তিনি দাবি করেন। এতে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই বলে তারা মনে করেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, প্রশাসনকে জনগণের কাছে পুরোপুরি নিরপেক্ষ করে তৈরি করতে হবে। সচিবালয়ে যারা এখনো আছেন, তাদের চিহ্নিত ফ্যাসিস্টের দোসর বলা হয়, তাদের সরিয়ে সেখানে নিরপেক্ষ কর্মকর্তা দেওয়ার জন্য বিএনপি বলেছে। পুলিশে নিরপেক্ষ লোক নিয়োগ করতে হবে। বিচার বিভাগে বিশেষ করে উচ্চ আদালতে এখনো ফ্যাসিস্টের যেসব দোসর আছে তাদের সরিয়ে নিরপেক্ষ বিচারক নিয়োগের ব্যবস্থা করার কথা বলেছে বিএনপির প্রতিনিধিদল। সরকারের মধ্যে দলীয় লোক থাকলে তাদের অপসারণের দাবিও জানান তারা। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমাদের দায়িত্ব নিরপেক্ষ থাকা। নির্বাচন একটি যুদ্ধক্ষেত্র। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, আমরা তা করব। রাজনৈতিক সংলাপের অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির প্রতিনিধিদল বৈঠক করে। অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের বৈঠকের উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মতানৈক্যের ভিত্তিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে আপিল শুনানি উচ্চ আদালতে চলমান। একটি নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য করতে হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারকে তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকায় আসতে হবে, যাতে করে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করা যায়। বিগত বছরগুলোতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ধারা উপেক্ষিত হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ নিতে হবে এ সরকারকেই।