সম্প্রতি দেশে বেশ কিছু মৃত্যু নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে যে বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টি করে তা হলো মিরপুরের ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মৃত্যু। তার সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত হলেও তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তে ছিলেন নিঃসঙ্গ। তার মৃত্যুর কয়েক দিন পরই একই এলাকার ৫৫ বছর বয়সী আফরোজা নামের আরেক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানও জীবনের শেষ মুহূর্তে ছিলেন নিঃসঙ্গ। মৃত্যুর পর কয়েক দিন ধরে বন্ধ ঘরে পড়ে থাকা কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার মরদেহ শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি সমাজের মূল্যবোধ ও মানবিকতার জন্য এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। এ ঘটনাগুলো শুধু কয়েকজন মানুষের মৃত্যুর গল্প নয়। এগুলো এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে, জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪ লাখেরও বেশি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দশকে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সাড়ে তিন থেকে চার কোটিরও বেশি হবে। তখন দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশই হবেন প্রবীণ। আমাদের দেশে অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা একাকী জীবন কাটান। অনেক বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সন্তান বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু অনেকেই আছেন, যারা বাবা-মায়ের দায়িত্বে অবহেলা করেন। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের খোঁজ না রাখা যতটা অমানবিক ততটা সামাজিক অন্যায়ও। বিশ্বায়নের প্রভাবে নগরজীবনের যেমন ব্যস্ততা বাড়ছে, সেই সঙ্গে দায়িত্ববোধের ঘাটতি, সম্পর্কের দূরত্বও সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃদ্ধ বয়সে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল অর্থ নয়, দরকার মানসিক নিরাপত্তাও।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনজুমান আরা বলেন, আধুনিক সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জাপান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে ওল্ড হোম বা বৃদ্ধাশ্রম খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যবস্থা। আমাদের দেশেও এখন অনেক আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে। সন্তানরা কর্মজীবন বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতেই পারেন, সেটা অপরাধ নয়। তবে বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা চাকরিজীবনের শুরু থেকেই ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে পারেন। পেনশন বা আয়ের একটি অংশ প্রবীণ বয়সে নিরাপদ আবাসনের জন্য সঞ্চয় করা যেতে পারে।
পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, আগামী বাংলাদেশ হবে বয়স্ক মানুষের বাংলাদেশ। সে কারণে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন-২০১৩ অনুযায়ী সক্ষম সন্তানদের বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে শাস্তির বিধানও রয়েছে। আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা চান না সন্তানরা শাস্তি পাক। তারা ভালোবাসার এক নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন। আমাদের বাব-মায়েরা নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে ডুবে না যাক, সন্তানদের কাছেই হোক তাদের শেষ আশ্রয়। আমরা সবাই চাই এমন এক মানবিক ও নিরাপদ সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে বৃদ্ধাশ্রম নয়, প্রত্যেক বাবা-মা তার সন্তানের কাছে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাবেন।