আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে নতুন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ‘ক্রাউডফান্ডিং’ বলে প্রার্থীদের অর্থ সংগ্রহের একটি পদ্ধতি আলোচনায় এসেছে। ‘ক্রাউড’ বলতে সাধারণ মানুষ, আর ‘ফান্ডিং’ বলতে তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থকে বোঝানো হচ্ছে। এর সাদামাঠা অর্থ হচ্ছে, জনগণের কাছ থেকে উন্মুক্ত আহ্বানের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা। জনসম্পৃক্ততার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে চিত্তাকর্ষক মনে হলেও এ হচ্ছে একধরনের চাঁদা, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ। কোনো প্রার্থী কি এভাবে অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন?
দেখা যাচ্ছে বেশ কয়েকজন প্রার্থী, এমনকি দলগতভাবেও ক্রাউডফান্ডিং গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই প্রবণতা নিয়ে বেশ আলোচনায় আছেন দুজন প্রার্থী। এপি পার্টির আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া তাসনিম জারা প্রকাশ্যে ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের কথা জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের একাংশ একে স্বচ্ছ এবং জনসম্পৃক্ত রাজনীতির উদাহরণ হিসেবে দেখলেও, অনেকেই নানা প্রশ্ন তুলছেন। একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীর এভাবে প্রকাশ্যে অর্থ চাওয়া যৌক্তিক কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন রয়েছে। তাসনিম জারা তো তার হলফনামাতেই উল্লেখ করেছেন তার নির্বাচনি ব্যয়ের সম্ভাব্য উৎস হবে ক্রাউডফান্ডিং। এই প্রেক্ষাপটে প্রার্থীরা ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন কি না, এর আইনি বৈধতা কতটুকু, নির্বাচনি বিধিতে সে সম্পর্কে কিছু বলা নেই। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, আলাদা করে কোনো বিধান না থাকায় কেউ যদি নির্বাচনি ব্যয়ের জন্য জনগণের কাছে সহায়তা চান এবং কেউ যদি স্বেচ্ছায় অর্থ দেন, সেখানে কমিশনের করার কিছু নেই। তিনি একথা বললেও, আরপিওতে অনুদান গ্রহণের নির্দিষ্ট সীমার উল্লেখ রয়েছে; তা সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্রাউডফান্ডিং নিয়ে যেহেতু আইন নেই, ফলে এই সীমা কতটা হবে, না কি তা হবে সীমাহীন? কোনা প্রক্রিয়ায় প্রার্থী এই অর্থ সংগ্রহ করবেন?
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) নির্বাচনি বিধিবিধান সংকলিত রয়েছে। নানা কারণে অনেকবার আরপিও সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনও আরপিও সংশোধন করেছে। সর্বশেষ সংশোধনের সময় ক্রাউডফান্ডিংয়ের বিষয়টি আলোচনায় ছিল না বলে, বোঝা যায়, আরপিওতে এ সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। তা সত্ত্বেও বর্তমান আরপিও অনুসারে প্রার্থীর লেনদেনে স্বচ্ছতা থাকতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী। আরপিওতে যেহেতু ক্রাউডফান্ডিয়ের কথা নেই, তাই ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে কোনো প্রার্থী অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত ব্যাখ্যা দিয়ে এ নিয়ে যে ধ্রুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করা উচিত।
নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বৈধতা ও স্বচ্ছতা। প্রার্থীদের অর্থের লেনদেন ও ব্যয়ের বিধিবিধান রয়েছে। ক্রাউডফান্ডিংয়ের নামে সেই বিধান লঙ্ঘিত হলে তা নির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ক্রাউডফান্ডিং আদতে একধরনের চাঁদায় তোলা ফান্ড। সেই ফান্ডের বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। কোন উৎস থেকে এই অর্থ আসছে, কে দিচ্ছেন, কেন দিচ্ছেন, প্রদেয় অর্থ বৈধ অর্জন কি না, এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের নিশ্চিত হওয়া দরকার।
আমাদের দেশে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার জন্য কোনো কোনো প্রার্থী নানা ধরনের অনৈতিক, অস্বচ্ছ, অবৈধ, গোপনীয় কাজে জড়িয়ে পড়েন। এটাই দীর্ঘদিনের চর্চার অংশ হয়ে আছে। নির্বাচন কমিশন সবসময় প্রার্থীদের এ থেকে বের করে আনতে চায় অথবা বলা যায়, সদিচ্ছা প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু তারা কতটা কী করতে পারে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। ক্রাউডফান্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও অর্থ সংগ্রহ, এর পরিমাণ এবং ব্যয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াগত দিক থেকে স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। যেহেতু ক্রাউডফান্ডিং নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, ফলে, দ্রুত এই বিষয়টি নির্বাচনি বিধিবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। নির্বাচন কমিশন আরপিওতে ক্রাউডফান্ডিং সংক্রান্ত আইন অন্তর্ভুক্ত করলে নির্বাচনে স্বচ্ছতা আসবে। আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে নির্বাচনে অর্থ সংগ্রহ এবং ব্যয়ের দিকটি স্পষ্ট ও স্বচ্ছ হবে।