গত পরশু ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৩তম দিন। এদিন মুক্তিযুদ্ধ ও রাজাকার ইস্যুতে জাতীয় সংসদ বেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সংসদ উত্তপ্ত হওয়ার সূচনা ঘটে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্যকে ঘিরে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের তুলনা করাকে ‘অন্যায়’ বলে উল্লেখ করেন। এ আলোচনায় পরে আরও অংশগ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান তার তীব্র আবেগপ্রবণ জ্বালাময়ী বক্তব্যে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ প্রশান্ত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে ডোবার তুলনা করা যেমন, হিমালয় পর্বতের সঙ্গে টিলার তুলনা করা যেমন, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের তুলনা করা ঠিক তেমনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলার পাল শাসনামল থেকে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখের সংগ্রামী জীবনের কথা এনে মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে বেশ জোরালো কণ্ঠে বলেন, এ দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ সত্য, ৩০ লাখ লোক জীবন দিয়েছে, এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যখন এক মাসের গণ-আন্দোলনকে তুলনা করা হয়, তখন মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করা হয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধই, মুক্তিযুদ্ধকে রিপ্লেস (প্রতিস্থাপন) করা যায় না। ভবিষ্যতের যেকোনো আন্দোলনের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের তুলনা করা ঠিক নয়। পরে সংসদের উত্তপ্ত পরিস্থিতি প্রশমনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে জাতিকে বিভক্ত না করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলকে জাতীয় স্বার্থে একযোগে কাজ করার তাগিদ দেন তিনি। তার বক্তব্যে সংসদের মর্যাদা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। স্পিকারও কয়েকবার এই যুক্তি দিয়ে অন্যের বক্তব্য খণ্ডনের আহ্বান জানান। তিনি সংসদ সদস্যদের সংসদীয় রুলস অব প্রসিডিউর পড়তে বলেন। এ সময় টেলিভিশনে স্পিকারকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি সংসদীয় বিধিবিধান মানা হচ্ছে না বলে কিছুটা বিরক্ত। বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত বক্তব্যকে ঘিরে সংসদে যে বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে, তা কিছুতেই কাম্য নয়। কারও বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে যদি অন্য কোনো সংসদ সদস্যের কিছু বলার থাকে, তাহলে তিনি বিধি মেনে পাল্টা বক্তব্য রাখতে পারেন। এটাই সংসদীয় রীতি। কারও বক্তব্যের মাঝে হই-হট্টগোল করে তাকে থামিয়ে দেওয়া শোভন নয়। এ জন্য স্পিকারকে একবার বলতে শোনা যায়, ‘আপনাদের এ ধরনের আচরণে শিশুরাও লজ্জা পাবে।’ স্পিকার যে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, সেটা সংসদ সদস্যদের মেনে চলা উচিত। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বিষয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হোক, সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসুক, দেশবাসী সেটাই চায়। অহেতুক হইচই বা হট্টগোল নয়।
এ কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশ একটা স্বাধীন রাষ্ট্র। এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা ৯ মাস পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। একই সঙ্গে পাকিস্তানের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধেও তাদের সে সময় লড়তে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত। মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশের অস্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সমার্থক। এই স্বাধীনতাই আমাদের শীর্ষ ও শ্রেষ্ঠ অর্জন। এটা মীমাংসিত সত্য। এর সঙ্গে অন্য কোনো আন্দোলনের তুলনা হয় না। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান শামা ওবায়েদের এই কথাগুলো প্রণিধানযোগ্য। এ নিয়ে বাদানুবাদ, বিতর্ক অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয়। দেশের অস্তিত্বকে বাদ দিয়ে অন্য কিছুকে গুরুত্ব দেওয়া হলে দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বের ওপরই তা আঘাতস্বরূপ। কোনো দল বা সংসদ সদস্য স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চব্বিশের গণ-আন্দোলনকে প্রাধান্য দেবেন, সংবিধানও তা অনুমোদন করে না। চব্বিশের গণ-আন্দোলনের গুরুত্ব আছে। কারণ এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছেন। অনেক অন্যায় দূর হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। একে ইতিবাচক অর্থে গ্রহণ করে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণই হওয়া উচিত আমাদের জাতিগত অঙ্গীকার।
আমরা মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের মতো মীমাংসিত বিষয় নিয়ে বিতর্ক অপ্রয়োজনীয় আর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ারও প্রয়োজন রয়েছে। এটাই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ভাবগত ও জাতিগত আকাঙ্ক্ষার নির্যাস। সবারই মনে রাখা দরকার, মুক্তিযুদ্ধের ঊর্ধ্বে কিছুই নয়, পরিপূরক মাত্র।