২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাসাবাড়ি ও স্থাপনাও হামলার শিকার হয়। পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় রিউমর স্ক্যানার বেশ কিছু এক্স অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে, যেগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে প্রচার করেছে।
প্রায় দুই বছর পর, চলতি বছরের মে মাসে ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনাকে ঘিরেও একই ধরনের অপতথ্য ছড়াতে দেখা যায়। তবে এবার মূল প্ল্যাটফর্ম ছিল ফেসবুক এবং অপপ্রচারে সক্রিয় ছিল বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলো। চলতি মাসের প্রথম ২১ দিনে রিউমর স্ক্যানারের শনাক্ত করা সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই বাংলাদেশি অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে- ভারতীয়দের পূর্ববর্তী অপপ্রচারের প্রতিক্রিয়ায় কি এবার বাংলাদেশিরাও ‘পাল্টা বয়ান’ তৈরিতে নেমেছে?
রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সাম্প্রদায়িক বয়ান: ২০২৪-এর এক্স ট্রেন্ড
রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র নয় দিনে অন্তত ৫০টি এক্স অ্যাকাউন্ট বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে অপতথ্য প্রচার করেছে। শনাক্ত হওয়া কনটেন্টগুলোর ৮০ শতাংশই ছিল ভিডিওভিত্তিক। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ভিডিও ছিল পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার, আর বাকি ভিডিওগুলো সরকার পতনের পর সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাকে ধর্মীয় নিপীড়নের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে। শনাক্ত হওয়া অ্যাকাউন্টগুলোর প্রায় ৭২ শতাংশ নিজেদের ভারতভিত্তিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, পুরোনো, ভিন্ন দেশের বা অপ্রাসঙ্গিক ছবি-ভিডিওকে ‘বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন’ দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। কোথাও রাজনৈতিক সহিংসতাকে ধর্মীয় নিপীড়ন হিসেবে দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও ভুল পরিচয় ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হয়েছে। ‘গণহত্যা’ বা ‘পরিকল্পিত হামলা’র মতো উসকানিমূলক শব্দও ব্যবহার করা হয়। শুধু বেনামি অ্যাকাউন্ট নয়, ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যম, ভেরিফায়েড প্রোফাইল ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় কিছু পরিচিত অ্যাকাউন্ট থেকেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর নজির পাওয়া যায়।
বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও বাংলাদেশি প্রোফাইলের অপতথ্য
ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে মে মাসজুড়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়ায়। রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক বিশ্লেষণে অন্তত ২৮টি অপতথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশি প্রোফাইলের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে ১৩টি কনটেন্টে ভিন্ন ঘটনার ভিডিও বা ছবি সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দাবি করে প্রচার করা হয়। এছাড়া পাঁচটি ছিল ভিন্ন দেশের কনটেন্ট এবং দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘটনার ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। অন্তত পাঁচটি কনটেন্টে সাজানো বা স্ক্রিপ্টেড ঘটনার উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।
প্ল্যাটফর্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম ছিল ফেসবুক। শনাক্ত হওয়া ২৮টি অপতথ্যই এই প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো হয়। পাশাপাশি ১১টি ইনস্টাগ্রামে, পাঁচটি ইউটিউবে, দুটি করে এক্স ও থ্রেডসে এবং একটি টিকটকে প্রচারিত হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমেও ভুয়া দাবি ছড়িয়ে পড়ে।
ফ্যাক্টচেক অনুযায়ী, কোথাও পুরোনো সহিংসতার ভিডিওকে ‘নির্বাচনের পর মুসলিমদের ওপর হামলা’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, আবার কোথাও বিদেশি ঘটনার ফুটেজকে ভারতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলে চালানো হয়েছে। বেশিরভাগ পোস্টেই ধর্মীয় পরিচয় ও আবেগনির্ভর ভাষা ব্যবহার করে ঘটনাগুলোকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে।
বাংলাদেশ থেকে ভারত: সংকটকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের অভিন্ন কৌশল
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ‘Akshit Singh’ নামের একটি ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে ১০ হাজারের বেশি হিন্দু নিহত হয়েছে। পরে যাচাই করে দেখা যায়, এ দাবির কোনো ভিত্তি নেই। একইভাবে চলতি মে মাসে বাংলাদেশি কিছু ফেসবুক প্রোফাইল ও পেজ দাবি করে, ভারতে সহিংসতায় ‘৭২ ঘণ্টায় ৪৮৭ মুসলিম নিহত’ হয়েছে। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, ৪ থেকে ১৩ মে পর্যন্ত সহিংস ঘটনায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে মাত্র একজন মুসলিম।
দুই ক্ষেত্রেই বাস্তব ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে ধর্মীয় আবেগ উসকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। একদিকে “১০ হাজার হিন্দু নিহত”, অন্যদিকে “৭২ ঘণ্টায় ৪৮৭ মুসলিম নিহত”- উভয় দাবিই ছিল ভিত্তিহীন। অর্থাৎ, বাস্তব ঘটনার সঙ্গে অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য যুক্ত করে ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ভয়, ক্ষোভ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
২০২৪ ও ২০২৬ সালের অপতথ্য প্রচারণার মধ্যে আরও বেশ কিছু মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সহিংসতা বা অস্থিরতাকে ধর্মীয় নিপীড়নের রূপ দেওয়া হয়েছে। পুরোনো বা প্রসঙ্গবহির্ভূত ছবি-ভিডিও ব্যবহার, ভুল পরিচয় আরোপ এবং আবেগনির্ভর ভাষা ছিল অপপ্রচারের প্রধান কৌশল। ‘গণহত্যা’, ‘পরিকল্পিত হামলা’, ‘মুসলিম নিধন’ বা ‘হিন্দু নির্যাতন’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে জনমনে ক্ষোভ ও ভয় তৈরির প্রবণতাও ছিল স্পষ্ট।
তবে প্রচারণার ধরনে কিছু পার্থক্যও দেখা গেছে। বাংলাদেশকে ঘিরে ২০২৪ সালের অপতথ্যে এক্স ছিল প্রধান প্ল্যাটফর্ম এবং ভারতীয় ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট ও গণমাধ্যমের সক্রিয়তা বেশি ছিল। অন্যদিকে ভারতের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ে বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলোর অপপ্রচারে ফেসবুকভিত্তিক নেটওয়ার্কের ভূমিকা বেশি দেখা গেছে। পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, থ্রেডস ও টিকটকেও একই বয়ান ছড়ানো হয়।
পাল্টা প্রোপাগান্ডার চক্র
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতকে ঘিরে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রবণতা মূলত এক ধরনের পাল্টা প্রোপাগান্ডার ধারাবাহিকতা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাঈদ আল-জামান একে ‘ডিজিটাল প্রতিশোধপরায়ণতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তার ভাষায়, “এক দেশের ব্যবহারকারীরা অন্য দেশের ঘটনাকে রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে।”
ভারতীয় সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ীর পর্যবেক্ষণও একই ধরনের। তার মতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ঘটনাকে ঘিরে ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্টগুলোর অপপ্রচার এবং ২০২৬ সালে ভারতের সহিংসতাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলোর অপতথ্য- দুটিই একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি। তিনি বলেন, বাস্তব সংকটকে ভিত্তি করে দুই দেশেই অর্ধসত্য, বিকৃত তথ্য ও মিথ্যা নির্মাণ করে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো ভিডিও, ভিন্ন দেশের ছবি বা প্রসঙ্গবহির্ভূত কনটেন্ট ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। ‘ভুক্তভোগী বনাম নির্যাতনকারী’ ধরনের আবেগনির্ভর কাঠামো তৈরি করে মানুষের অনুভূতিকে প্রভাবিত করা হচ্ছে।
সাঈদ আল-জামানের ভাষায়, “পুরোনো ভিডিও বা প্রসঙ্গবহির্ভূত ছবি হলেও সেটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, যদি তা নিজের গোষ্ঠীর বয়ানের সঙ্গে মিলে যায়।”
অর্ক ভাদুড়ীর মতে, বাংলাদেশে ইসলামপন্থি এবং ভারতে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর ‘মোডাস অপারেন্ডি’ অনেকটাই একই ধরনের।
তার ভাষায়, “ফেক নিউজ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও আমরা দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত ঐক্য দেখছি।”
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক মেরুকরণ, আবেগনির্ভর কনটেন্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম- এই তিনটি উপাদান অপতথ্য ছড়ানোর গতি বাড়িয়ে দেয়। ধর্মীয় উত্তেজনামূলক কনটেন্ট বেশি প্রতিক্রিয়া পায় বলেই অ্যালগরিদমও সেগুলো আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।
তাদের সতর্কবার্তা, অনলাইন গুজব কেবল ভার্চুয়াল জগতের সমস্যা নয়; এটি বাস্তবেও সংঘর্ষ ও সহিংসতার কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের অপতথ্য বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অবিশ্বাস, ঘৃণা ও বিভাজন তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক ও তথ্য-পরিবেশের জন্য এটি এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।