ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ইসলামী ব্যাংকের কারণেই আরেকটি ৫ আগস্ট ঘটে যেতে পারে বায়ুদূষণে বদলে যাচ্ছে ভ্রূণের জিন জলাবদ্ধতা ও দুর্গন্ধে নাকাল ঘিওর বাজার ছায়ানটে শুরু হলো দুই দিনের নজরুল উৎসব রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে ৬ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ৬ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল মে মাসে মব হামলায় নিহত ৩২: এমএসএফ ‘নতুন পুরাতন মিলিয়ে ভালোই বোর্ড হবে’ শাহজালালের কার্গো শেডে আগুন শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন শিকলবাহায় হত‍্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মরদেহ নিয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম ০২০৪ ব্যাচের বন্ধুদের ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী মায়ানমারে পাচারকালে দেড় হাজার বস্তা সিমেন্ট আটক ৫২ মরুভূমিতে বিকল ট্রাক, পানির অভাবে ৪৯ জনের মৃত্যু মেধা ও ক্রীড়াবান্ধব জাতি গঠনে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের শোডাউন সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের প্রথমবার এআই তৈরি করল ‘সুপার-ভ্যাকসিন’ হাদি হত্যা মামলার বাদীকে নিয়ে বোনের প্রশ্ন? জয়পুরহাট সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির টহল জোরদার রাজনীতি এক ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে: মির্জা ফখরুল হজ শেষে দেশে ফিরলেন ২৯৬৯৪ হাজি নারায়ণগঞ্জে ১৭ বন্যপাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত হান্নানের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির তথ্য ফাঁস, ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ নায়িকা মিমির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট, শেষ দেখে নেওয়ার হুমকি! দোয়া গুরুত্বপূর্ণ এক ইবাদত সংসদ ভবন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র বহনসহ মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা কটাক্ষের শিকার আনুশকা
Nagad desktop

২০২৫ সালে রিউমর স্ক্যানারের যে কাজগুলো জনমনে প্রভাব ফেলেছে

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম
২০২৫ সালে রিউমর স্ক্যানারের যে কাজগুলো জনমনে প্রভাব ফেলেছে
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

২০২৫ সালজুড়ে বাংলাদেশে নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনা ঘিরে ছড়িয়েছে অসংখ্য গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য। এসব অপতথ্য অনেক সময় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে, আবার কখনও সমাজে উত্তেজনাও ছড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে রিউমর স্ক্যানার বছরের বিভিন্ন সময়ে এমন কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা শুধু ভুল তথ্য রোধেই নয়, বরং জনসচেতনতা তৈরিতেও রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ২০২৫ সালে রিউমর স্ক্যানারের যে কাজগুলো অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি ও তথ্যের প্রতি বিশ্বাস বদলে দিয়েছে সেগুলো প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।

সরকারকে জড়িয়ে ক্রমাগত অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই 
বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারকে নিয়ে অপপ্রচার একটি সাধারণ ঘটনা। গত কয়েক বছর ধরেই এই রীতি চলে আসছে। বর্তমানে ক্ষমতায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণের পর এই সরকারকে জড়িয়ে ক্রমাগত ভুয়া তথ্যের প্রবাহ দেখা গেছে। গেল বছর সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের জড়িয়ে ৪৬৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত করে রিউমর স্ক্যানার। 

এর মধ্যে এপ্রিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি শিশুর হাতকড়া পরা ছবি ভাইরাল হয়। বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বাবাকে না পেয়ে পুলিশ শিশুটিকে গ্রেপ্তার করেছে। কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র না থাকলেও ছবিটি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রমাণ হিসেবে সরকারের তীব্র সমালোচনা করে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। 

ভাইরাল ছবিটির বিষয়ে অনুসন্ধান করে রিউমর স্ক্যানার জানায়, ছবিটি বাস্তব কোনো ঘটনার নয়। এটি ছিল একটি শিশুর প্রতীকী অভিনয়ের ছবি, যেখানে খেলনার হাতকড়া ব্যবহার করা হয়েছে। ছবিটি প্রথমে এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতার আইডি থেকে পোস্ট করা হয়েছিল এবং পরে সরিয়ে ফেলা হয়। তবে স্ক্রিনশট ও বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে ছবিটি পুনরায় ছড়ানো হয়। ফ্যাক্টচেকটি প্রকাশের পর দাবিটির বিশ্বাসযোগ্যতা ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশ পুলিশ তাদের পেজে রিউমর স্ক্যানারের উদ্ধৃতি দিয়ে এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট প্রকাশ করে। রিউমর স্ক্যানারের এ বিষয়ে ফেসবুকে প্রকাশিত পোস্টটি প্রায় দেড় লক্ষাধিক বার দেখা হয়েছে। পোস্টটি মোট ১ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছেছে। 

গত বছরের জুনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার (গত বছরের ১০ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন) বাড়ি থেকে ১২০০ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়েছে এবং এ নিয়ে তার বাবা পুলিশকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। 

রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে জানায়, আলোচিত ভিডিওটি ভিন্ন ঘটনার এবং এতে ১২০০ নয়, মাত্র ১৬ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়েছে; উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বা তার বাবার সঙ্গে ঘটনার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ফেসবুকে প্রকাশিত ফ্যাক্টচেক পোস্টটি প্রায় দেড় লক্ষাধিক বার দেখা হয় এবং ১ লাখের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। আসিফ নিজেও ফ্যাক্টচেকটি তার ফেসবুক পেজে শেয়ার করেন।  

আগস্টে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয় আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া একটি হোটেল রুমে এক নারীর সঙ্গে অবস্থান করছেন। ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল এই দাবি দ্রুত ভাইরাল হয় এবং অনেকেই যাচাই না করেই ছবিটিকে সত্য ধরে নিয়ে মন্তব্য ও শেয়ার করতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে দেখানো হয়, আলোচিত ছবিটি দুটি আলাদা ছবিকে জুড়ে এআই দিয়ে তৈরি। রিউমর স্ক্যানারের এ সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্টটি ৬৩ লক্ষাধিক বার দেখা হয় এবং পৌনে ৩৫ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছায়। 

নারীরা ছিলেন আলাদা টার্গেটে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাত্তর টিভির সংবাদ পাঠিকা সারাহ মেহজাবিনের নাম ও ছবি ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া ফেসবুক ও এক্স অ্যাকাউন্ট-পেজ থেকে নিয়মিত বিতর্কিত ও ভুয়া দাবি ছড়াচ্ছিল। এসব পোস্টে রাজনৈতিক অপতথ্য, পুরোনো বা ভিন্ন দেশের ভিডিও, এমনকি এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবিও ব্যবহার করা হচ্ছিল। এর ফলে সারাহ মেহজাবিনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পরিচিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল। 

রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে অনুসন্ধান চালায়। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে রিউমর স্ক্যানার জানায়, সারাহ মেহজাবিনের পরিচয় ব্যবহার করে অন্তত তিনটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, একটি ফেসবুক পেজ ও একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে মাসের পর মাস ক্রমাগত অপতথ্য ছড়ানো হয়। 

এসবের পেছনে মো. শিলন রেজা বিশ্বাস নামের একজন ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে রিউমর স্ক্যানার। প্রতিবেদন প্রকাশের পর ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও পেজগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। রিউমর স্ক্যানারের এই অনুসন্ধানের ফলে ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলোর নেটওয়ার্ক ভেঙে যায় এবং ভুক্তভোগী সারাহ মেহজাবিন দীর্ঘদিনের হয়রানি থেকে মুক্তি পান। 

গেল বছর জাতীয় ও রাজনৈতিকসহ নানা অঙ্গনের পরিচিত নারীরা আলাদাভাবে টার্গেট ছিলেন অপতথ্যের। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. মাহমুদা মিতুকে ঘিরে একের পর এক বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচার ছিল এর মধ্যে অন্যতম ঘটনা। মিতুকে জড়িয়ে শুরুতে ভুয়া স্ক্রিনশটের মাধ্যমে তার নামে আপত্তিকর মন্তব্য প্রচার করা হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই তাকে জড়িয়ে গণমাধ্যমের আদলে তৈরি একাধিক ভুয়া ফটোকার্ড, এআই দিয়ে তৈরি আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ছড়ানো হয়। ব্যক্তিগত চরিত্র হনন ও রাজনৈতিক অপপ্রচারের এই ধারাবাহিকতা দ্রুত অনলাইনে বিস্তার লাভ করে। 

রিউমর স্ক্যানার বিষয়টি নিয়ে সম্মিলিত অনুসন্ধানের পর জানায়, মিতুর নামে প্রচারিত আপত্তিকর মন্তব্যগুলো তিনি করেননি, গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করা ফটোকার্ডগুলো ভুয়া, ছড়ানো আপত্তিকর ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি এবং ভাইরাল ভিডিওটিও কৃত্রিমভাবে বানানো। একইসঙ্গে অপপ্রচারের পেছনে থাকা অ্যাকাউন্টগুলোর অসংগতি ও মিথ্যা পরিচয় তুলে ধরা হয়। 

ফ্যাক্টচেক প্রকাশের পর মিতুকে জড়িয়ে অপপ্রচারের এই ধারাবাহিকতা থেমে যায় এবং বিষয়টি নিয়ে এনসিপি ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা জোরদার হয়। এনসিপি বিষয়টি নিয়ে ফেসবুক পেজেও পোস্ট করে। রিউমর স্ক্যানারের এ সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্টটি প্রায় পৌনে ৬ লাখ বার দেখা হয়।

২০২৫ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী তারকাদের নাম-ছবি ব্যবহার করে সম্পাদিত/এআইনির্ভর ভুয়া কনটেন্ট ছড়ানোর প্রবণতা আরও সংগঠিত রূপ নেয়। রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষণে ‘চলো বদলে যাই’ নামে একটি ফেসবুক পেজে নিয়মিতভাবে সেলিব্রিটি নারীদের নামে ছবি-ভিডিও সম্পাদনা করে প্রচারের ধারাবাহিক প্রমাণ মেলে, যার ফলে সংশ্লিষ্ট নারীরা অনলাইনে ক্রমাগতভাবে বডি শেমিং, স্লাটশেমিং ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের শিকার হতে থাকেন। 

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে পেজটির সঙ্গে গাজীপুরের কালীগঞ্জের ইমরান মিয়া নামের এক ব্যক্তির সংযোগের তথ্য উঠে আসে, তিনি নিজেও পেজটি নিজের বলে দাবি করেন এবং ছবি-ভিডিও সম্পাদনা করে প্রকাশের বিষয়টি স্বীকার করেন। পেজটির এ সংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। 

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে উঠে আসে দেশে ছড়ানো অপতথ্যের একটি বড় অংশই নারীদের কেন্দ্র করে প্রচার হচ্ছিল, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়, ছবি, বক্তব্য ও চরিত্রকে টার্গেট করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছিল। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং রাজনীতি ও জনপরিসরে নারীর অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করার একটি কাঠামোগত ডিজিটাল ঝুঁকি হিসেবে সামনে আসে। 

রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শনাক্ত হওয়া অপতথ্যের ২১ শতাংশ ঘটনাতেই নারীদের জড়ানো হয়েছে। এই সময়ে ২৭৬ জন নারীকে জড়িয়ে ৫৬৭টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ২৫ জন নারী রাজনীতিবিদকে জড়িয়ে ২৩৭টি অপতথ্য এবং বিনোদন জগতের ২৯ জন নারী তারকাকে নিয়ে অপতথ্যের প্রচার ছিল। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর প্রতিবেদনে থাকা তথ্য-উপাত্তগুলো আলোচনা হয় বিভিন্ন সেমিনার-ওয়ার্কশপে। 

এআই: বিভ্রান্ত হয়েছেন দায়িত্বশীলরাও
২০২৫ সালের মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশংসা করেছেন। ভিডিওটিতে ট্রাম্পকে ড. ইউনূসকে ‘মহান ব্যক্তি’ ও ‘বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করতে শোনা যায়। ভিডিওটি সরকারের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ফেসবুকে শেয়ার করার পরপর তা রীতিমতো ভাইরাল হয়ে যায়। একটি পোস্টে ১৭ হাজারের বেশি রিয়্যাকশন এবং প্রায় ১ হাজার শেয়ার পাওয়া যায়, যা গুজবটির বিস্তারের মাত্রা নির্দেশ করে। 

রিউমর স্ক্যানার অনুসন্ধানে দেখে, ভিডিওটি একটি আসল ক্যাবিনেট বৈঠকের হলেও ট্রাম্পের কথিত বক্তব্যটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার করে যুক্ত করা নকল অডিও। রিউমর স্ক্যানারের এ সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্ট পৌনে ৬ লাখ বার দেখা হয়েছে। পোস্টটি প্রায় পৌনে চার লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছেছে। রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক প্রকাশের পর ড. আসিফ নজরুল ভিডিওটি সরিয়ে নেন।

গত বছরের ৮ অক্টোবর গাজা অভিমুখী ‘কনশেনস’ নৌবহরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের খবর ছড়ায়। এই বহরে ছিলেন বাংলাদেশের আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম। এর প্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শহিদুল আলমের গ্রেপ্তারের দৃশ্য দাবিতে একটি ছবি দ্রুত ভাইরাল হয়। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, ছবিটি এআই জেনারেটেড। রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক ফেসবুকে প্রকাশের পর তা প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার বার দেখা হয় এবং প্রায় সমপরিমাণ মানুষের কাছে পৌঁছায়। 

২০২৫-পুরো বছরজুড়েই আতঙ্কের এক নাম ছিল এআই। নানা ঘটনায় বাস্তব দৃশ্য দাবিতে এআই জেনারেটেড ছবি বিভ্রান্ত করেছে সাধারণ মানুষ থেকে দায়িত্বশীল ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকেও। 

২১ জুলাই ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ঘটনাস্থলের দৃশ্য দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ছবি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই অন্তত সাতটি ভিন্ন ছবি ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়ায়, যেগুলো অনেকেই সত্য ঘটনা ভেবে শেয়ার করতে শুরু করেন। এমনকি কিছু অনলাইন পোর্টাল ও গণমাধ্যমেও এসব ছবি ব্যবহার করা হয়।

রিউমর স্ক্যানার বিশ্লেষণ করে দেখে, ছবিগুলোর আগুন, ধোঁয়ার গঠন, ভবনের অবকাঠামো ও লেখার অসংগতি বাস্তব ঘটনার সঙ্গে মেলে না। এআই শনাক্তকারী টুলে যাচাই করে ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ পাওয়া যায়। রিউমর স্ক্যানারের এ সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্টটি ৩ লক্ষাধিক বার দেখা হয় এবং প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষের কাছে পৌঁছায়। 

গেল বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধের ঘটনার প্রেক্ষিতে শনাক্ত সন্দেহভাজন ব্যক্তির সঙ্গে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের চা পানের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিটিকে আসল দাবিতে সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। 

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে জানা যায়, ভাইরাল ছবিটি এআই জেনারেটেড। এ বিষয়ে রিউমর স্ক্যানারের ফেসবুকে প্রকাশিত পোস্টটি সাড়ে ২৫ লাখ বার দেখা হয়েছে। রুহুল কবীর রিজভী ভুয়া ফটোকার্ডটি নিয়ে তার মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেন।

তরুণ রাজনীতিবিদরাও শিকার অপতথ্যের
২০২৫ সালের নভেম্বরে ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমার নামে ‘DU Insiders’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে প্রচারিত একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফটোকার্ডে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে জড়িয়ে জুমা ‘হলের মোটামুটি সবাই চলে গেছে। পুরো হল ফাঁকা শুনশান নিরবতায় ভয় পাচ্ছিলাম এজন্য সাদিক কাইয়ুম ভাইয়াকে কল দিয়ে গল্প করার জন্য রুমে আসতে বল্লাম। এখন একটু শান্তি পাচ্ছি।’ মন্তব্য করেছেন দাবিতে প্রচার করা হয়। 

রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, আলোচিত ফটোকার্ডে ব্যবহৃত মন্তব্যটি ভুয়া। জুমার ভিন্ন পোস্টের বক্তব্য বিকৃত করে তা প্রচার করা হয়েছে। ফ্যাক্টচেক প্রকাশের পর সাদিক কায়েম বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেন উক্ত পেজের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের সাইবার বুলিং ও অপতথ্য প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা যায়।

নির্বাচন ঘিরে অপতথ্য শনাক্তে জোরালো ভূমিকা
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গত মাসে এ সংক্রান্ত তফসিল ঘোষণা হলেও রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট মহলে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রম দেখা যায় গত বছরের শুরু থেকেই। নির্বাচন সংক্রান্ত অপতথ্যের প্রচারও দেখা গেছে বছরের শুরু থেকেই। পুরো বছরে প্রায় তিন শতাধিক নির্বাচন সংক্রান্ত অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।

গেল বছরের নভেম্বরে নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ফেসবুকে বিএনপির পেজের একটি পোস্টে কিছু ছবি যুক্ত করে দাবি করা হয়, কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার উপস্থিতিতে সে সময়ের একটি নির্বাচনি জনসভার ছবি এগুলো। রিউমর স্ক্যানার অনুসন্ধানে জানায়, ছবিগুলো ২০২৫ সালের নয়। ২০২৪ সালের ২৩ নভেম্বর নাঙ্গলকোটের দোলখাড় ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত একটি জনসভার দৃশ্য এটি। 

ফ্যাক্টচেকটি রিউমর স্ক্যানারের ফেসবুক পেজে পোস্ট করার পর তা প্রায় ৭ লাখ বার দেখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি তাদের অফিশিয়াল পেজ থেকে পোস্টটি সরিয়ে নেয় এবং প্রার্থী আব্দুল গফুর ভূঁইয়া বিষয়টি নিয়ে একটি ভিডিও বক্তব্য দেন।

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে পাবনার ঈশ্বরদীতে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ থেকে জামায়াত প্রার্থীর গাড়িতে হামলার ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে অস্ত্র হাতে এক যুবকের ছবি ও ভিডিও বিভিন্ন দাবিতে প্রচার করা হয়। অনেকে ওই যুবককে পাবনা শহিদ বুলবুল কলেজ ছাত্রদল নেতা কিংবা বিএনপি কর্মী হিসেবে এবং অনেকে জামায়াত কর্মী হিসেবে প্রচার করেন। ফলে, অস্ত্র হাতের ওই যুবকের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত সেই যুবক ওই আসনের জামায়াত প্রার্থীর কর্মী। জামায়াত প্রার্থীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে অংশ নিতে দেখা গেছে। এ সংক্রান্ত রিউমর স্ক্যানারের ফেসবুক পোস্টটি ৪ লক্ষাধিক বার দেখা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সরাসরি এই ফ্যাক্টচেককে উদ্ধৃতি দিয়ে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তেও অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাকে আটক করা হয়।

গণমাধ্যমের ভুল তথ্য প্রচার মোকাবিলায় নিরন্তর চেষ্টা 
গেল বছরের ৮ জানুয়ারি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ডেইলি বাংলাদেশ একটি প্রতিবেদনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহ-সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফির বিরুদ্ধে ৩২ কোটি টাকার তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ তোলে। প্রতিবেদনে একটি নির্দিষ্ট বিকাশ নম্বর ও লেনদেনের সময়কাল উল্লেখ থাকায় তা দ্রুত ভাইরাল হয় এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। রিউমর স্ক্যানার দাবিটির উৎস, লেনদেন তথ্য ও বিকাশের নীতিমালা বিশ্লেষণ করে। পরদিনই রিউমর স্ক্যানার বিষয়টি যাচাই করে জানায়, দাবি করা লেনদেন বিকাশের নীতিমালার আলোকে অবাস্তব। একইসঙ্গে, এটি নতুন কোনো অভিযোগ নয়। এই ঘটনার দুই মাস আগেই একটি ফেসবুক পেজ থেকে এই ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট বিকাশ স্টেটমেন্ট ও ভিডিও বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায়, অভিযোগটি ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ফ্যাক্টচেকটি প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাদের দাবি সরিয়ে নেয় এবং ভুল তথ্যটির বিস্তার বন্ধ হয়। পরবর্তী সময়ে মিডিয়া হাউজটির কার্যক্রম‌ই বন্ধ হয়ে যায়। ফেসবুকে এ বিষয়টি নিয়ে রিউমর স্ক্যানারের প্রকাশিত ফ্যাক্টচেক পোস্টটি চার লক্ষাধিক বার দেখা হয়েছে। পোস্টটি ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছেছিল। 

২০২৫ সালের শুরুতে দেশের একাধিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি ছড়িয়ে পড়ে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় চার নেতার মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিল করে তাদের ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে সংবেদনশীল এই দাবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জনমনে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ তৈরি করে। 

রিউমর স্ক্যানার সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের পূর্ণ পাঠ, সরকারি নথি, বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের প্রকাশনা এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করে জানায়, মুজিবনগর সরকারের সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই স্বীকৃত থাকবেন; ‘সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটি প্রযোজ্য কেবল অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে। ফ্যাক্টচেকটি প্রকাশের পর গণমাধ্যমগুলো তাদের প্রকাশিত ভুল সংবাদ সরিয়ে নেয় বা সংশোধন করে, ফলে বিভ্রান্তিকর দাবির প্রচার কমে আসে। ফেসবুকে রিউমর স্ক্যানারের এ সংক্রান্ত পোস্টটি প্রায় তিন লাখ বার দেখা হয় এবং প্রায় দুই লাখ মানুষের কাছে পৌঁছায়। 

২০২৪ সালে গণমাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল লক্ষণীয়। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়াও জনকল্যাণমুখী তথ্য দেওয়ায়ও প্রথম সারির গণমাধ্যমের ভুলের প্রবাহ মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে বিভ্রান্তি। গত বছরের ৫ নভেম্বর ‘সেবা ফাউন্ডেশনের শিক্ষাবৃত্তি, প্রতি মাসে পাবে ৩ হাজার টাকা’ শিরোনামে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। 

রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, প্রথম আলো যে শিক্ষাবৃত্তির বিজ্ঞপ্তিকে সত্য ধরে সংবাদ করেছে, সেটি আসলে প্রতারক চক্রের ভুয়া ওয়েবসাইট/সার্কুলার। ভুয়া ওয়েবসাইটটি আবেদনকারীদের ‘নির্বাচিত’ দেখিয়ে বিকাশ নম্বর নিশ্চিত করতে বলে এবং পরে নির্দিষ্ট নম্বরে ২০০ টাকা পাঠাতে প্ররোচিত করে, যা প্রতারণামূলক। এ সংক্রান্ত ফ্যাক্টচেক প্রকাশের পর প্রথম আলো তাদের সংবাদ সংশোধন করে সতর্কবার্তা যুক্ত করে। ভুয়া চক্রকে কোনো টাকা না দিতে অনুরোধ জানায়, ভুলভাবে ব্যবহৃত ছবি সরিয়ে নেয়। এ বিষয়ে রিউমর স্ক্যানারের ফেসবুক পোস্টটি ১ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি বার দেখা হয়। 

ভারতীয় মিডিয়ার অপপ্রচারের বিরুদ্ধে লড়াই
বাংলাদেশকে জড়িয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের অপপ্রচার গেল কয়েক বছর ধরেই আলোচনায় রয়েছে। গত বছরও অন্তত ৩৭টি ঘটনায় দেশটির গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে অপপ্রচার শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। গত বছরের ৩ মে ভারতীয় গণমাধ্যম আজতক বাংলার একটি ভিডিও প্রতিবেদনে একটি ছবি দেখিয়ে দাবি করা হয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূস যাদের সঙ্গে করমর্দন করছেন তারা বাংলাদেশি নন, বরং পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা হতে পারেন। শুধু পোশাকের ধরন দেখেই এই দাবি তোলা হয়। 

রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, এটি ‘পুলিশ সপ্তাহ–২০২৫’-এর একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের ছবি, যেখানে ড. ইউনূস বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে করমর্দন করেন। ছবিতে থাকা ব্যক্তিরা পাকিস্তানি সেনা নন, তারা সবাই বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তা। রিউমর স্ক্যানারের এ সংক্রান্ত ফ্যাক্টচেক পোস্ট ফেসবুকে প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া ফেলে। পোস্টটি প্রায় পৌনে ৬ লাখ বার দেখা হয় এবং সাড়ে ৩ লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছায়। 

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অপপ্রচার মোকাবিলা
২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকার শাহবাগে বুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর একটি ছবি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। ছবিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের ডিসি মো. মাসুদ আলমকে এক আন্দোলনকারীর মুখ চেপে ধরতে দেখা যায়। ঘটনার পরদিন ডিএমপি দাবি করে, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি এবং সেটি ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। রিউমর স্ক্যানার ফ্যাক্টচেক করে জানায়, ছবিতে এআই-তৈরির কোনো লক্ষণ নেই এবং একই মুহূর্তের দৃশ্য বিভিন্ন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের সংরক্ষিত ছবিতেও পাওয়া যায়। এই ফ্যাক্টচেকটি দেখিয়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যও যাচাইয়ের ঊর্ধ্বে নয়।

ফেসবুকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত ফ্যাক্টচেক পোস্টটি ৭ লক্ষাধিক বার দেখা হয় এবং ৩ লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছায়। 

দুর্যোগের দিনগুলোতেও থেমে থাকেনি ভুয়া তথ্যের প্রচার
২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর দেশে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। দাবি করা হয়, ঢাকার নিউমার্কেটের রাফিন প্লাজা ভূমিকম্পে হেলে পড়েছে। ভূমিকম্প-পরবর্তী আতঙ্কের মধ্যে ভিডিওটি দ্রুত ছড়ায় এবং অনেকেই যাচাই না করেই বিষয়টি সত্য ধরে নেন। এমনকি একাধিক গণমাধ্যমেও একই দাবি প্রচারিত হয়। রিউমর স্ক্যানার গুগল ম্যাপের স্ট্রিট ভিউ বিশ্লেষণ, ভবনের অবস্থান শনাক্তকরণ, স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই করে জানায়, রাফিন প্লাজা ভূমিকম্পের কারণে হেলে পড়েনি। এটির নকশাগত বৈশিষ্ট্যই এমন। রিউমর স্ক্যানারের এ সংক্রান্ত ফ্যাক্টচেক ফেসবুকে প্রকাশের পর পোস্টটি প্রায় ৪৭ লাখ বার দেখা হয়। 

ভুয়া ফটোকার্ড ভুগিয়েছে রাজনীতিবিদদেরও
১২ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ফেসবুকে একটি পেজ থেকে আরটিভির আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘ডিএমপি কমিশনার জানিয়েছেন, ওসমান হাদির ওপর গুলি বর্ষণকারী জামায়াত–শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।’ 

একই দাবিতে সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপি নেতা রুহুল কবীর রিজভী। রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে জানা যায়, ভাইরাল ফটোকার্ডটি নকল। ডিএমপি কমিশনার এমন কোনো তথ্য জানাননি। আরটিভিও ওই ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। রুহুল কবীর রিজভী ভুয়া ফটোকার্ডটি নিয়ে তার মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেন।  

এসজি/

বাংলাদেশ-ভারতে সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের অভিন্ন ছক

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
বাংলাদেশ-ভারতে সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের অভিন্ন ছক
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাসাবাড়ি ও স্থাপনাও হামলার শিকার হয়। পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় রিউমর স্ক্যানার বেশ কিছু এক্স অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে, যেগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে প্রচার করেছে।

প্রায় দুই বছর পর, চলতি বছরের মে মাসে ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনাকে ঘিরেও একই ধরনের অপতথ্য ছড়াতে দেখা যায়। তবে এবার মূল প্ল্যাটফর্ম ছিল ফেসবুক এবং অপপ্রচারে সক্রিয় ছিল বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলো। চলতি মাসের প্রথম ২১ দিনে রিউমর স্ক্যানারের শনাক্ত করা সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই বাংলাদেশি অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে- ভারতীয়দের পূর্ববর্তী অপপ্রচারের প্রতিক্রিয়ায় কি এবার বাংলাদেশিরাও ‘পাল্টা বয়ান’ তৈরিতে নেমেছে?

রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সাম্প্রদায়িক বয়ান: ২০২৪-এর এক্স ট্রেন্ড

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র নয় দিনে অন্তত ৫০টি এক্স অ্যাকাউন্ট বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে অপতথ্য প্রচার করেছে। শনাক্ত হওয়া কনটেন্টগুলোর ৮০ শতাংশই ছিল ভিডিওভিত্তিক। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ভিডিও ছিল পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার, আর বাকি ভিডিওগুলো সরকার পতনের পর সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাকে ধর্মীয় নিপীড়নের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে। শনাক্ত হওয়া অ্যাকাউন্টগুলোর প্রায় ৭২ শতাংশ নিজেদের ভারতভিত্তিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, পুরোনো, ভিন্ন দেশের বা অপ্রাসঙ্গিক ছবি-ভিডিওকে ‘বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন’ দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। কোথাও রাজনৈতিক সহিংসতাকে ধর্মীয় নিপীড়ন হিসেবে দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও ভুল পরিচয় ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হয়েছে। ‘গণহত্যা’ বা ‘পরিকল্পিত হামলা’র মতো উসকানিমূলক শব্দও ব্যবহার করা হয়। শুধু বেনামি অ্যাকাউন্ট নয়, ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যম, ভেরিফায়েড প্রোফাইল ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় কিছু পরিচিত অ্যাকাউন্ট থেকেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর নজির পাওয়া যায়।

বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও বাংলাদেশি প্রোফাইলের অপতথ্য

ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে মে মাসজুড়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়ায়। রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক বিশ্লেষণে অন্তত ২৮টি অপতথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশি প্রোফাইলের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে ১৩টি কনটেন্টে ভিন্ন ঘটনার ভিডিও বা ছবি সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দাবি করে প্রচার করা হয়। এছাড়া পাঁচটি ছিল ভিন্ন দেশের কনটেন্ট এবং দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘটনার ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। অন্তত পাঁচটি কনটেন্টে সাজানো বা স্ক্রিপ্টেড ঘটনার উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।

প্ল্যাটফর্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম ছিল ফেসবুক। শনাক্ত হওয়া ২৮টি অপতথ্যই এই প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো হয়। পাশাপাশি ১১টি ইনস্টাগ্রামে, পাঁচটি ইউটিউবে, দুটি করে এক্স ও থ্রেডসে এবং একটি টিকটকে প্রচারিত হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমেও ভুয়া দাবি ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্যাক্টচেক অনুযায়ী, কোথাও পুরোনো সহিংসতার ভিডিওকে ‘নির্বাচনের পর মুসলিমদের ওপর হামলা’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, আবার কোথাও বিদেশি ঘটনার ফুটেজকে ভারতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলে চালানো হয়েছে। বেশিরভাগ পোস্টেই ধর্মীয় পরিচয় ও আবেগনির্ভর ভাষা ব্যবহার করে ঘটনাগুলোকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে।

বাংলাদেশ থেকে ভারত: সংকটকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের অভিন্ন কৌশল

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ‘Akshit Singh’ নামের একটি ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে ১০ হাজারের বেশি হিন্দু নিহত হয়েছে। পরে যাচাই করে দেখা যায়, এ দাবির কোনো ভিত্তি নেই। একইভাবে চলতি মে মাসে বাংলাদেশি কিছু ফেসবুক প্রোফাইল ও পেজ দাবি করে, ভারতে সহিংসতায় ‘৭২ ঘণ্টায় ৪৮৭ মুসলিম নিহত’ হয়েছে। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, ৪ থেকে ১৩ মে পর্যন্ত সহিংস ঘটনায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে মাত্র একজন মুসলিম।

দুই ক্ষেত্রেই বাস্তব ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে ধর্মীয় আবেগ উসকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। একদিকে “১০ হাজার হিন্দু নিহত”, অন্যদিকে “৭২ ঘণ্টায় ৪৮৭ মুসলিম নিহত”- উভয় দাবিই ছিল ভিত্তিহীন। অর্থাৎ, বাস্তব ঘটনার সঙ্গে অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য যুক্ত করে ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ভয়, ক্ষোভ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

২০২৪ ও ২০২৬ সালের অপতথ্য প্রচারণার মধ্যে আরও বেশ কিছু মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সহিংসতা বা অস্থিরতাকে ধর্মীয় নিপীড়নের রূপ দেওয়া হয়েছে। পুরোনো বা প্রসঙ্গবহির্ভূত ছবি-ভিডিও ব্যবহার, ভুল পরিচয় আরোপ এবং আবেগনির্ভর ভাষা ছিল অপপ্রচারের প্রধান কৌশল। ‘গণহত্যা’, ‘পরিকল্পিত হামলা’, ‘মুসলিম নিধন’ বা ‘হিন্দু নির্যাতন’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে জনমনে ক্ষোভ ও ভয় তৈরির প্রবণতাও ছিল স্পষ্ট।

তবে প্রচারণার ধরনে কিছু পার্থক্যও দেখা গেছে। বাংলাদেশকে ঘিরে ২০২৪ সালের অপতথ্যে এক্স ছিল প্রধান প্ল্যাটফর্ম এবং ভারতীয় ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট ও গণমাধ্যমের সক্রিয়তা বেশি ছিল। অন্যদিকে ভারতের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ে বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলোর অপপ্রচারে ফেসবুকভিত্তিক নেটওয়ার্কের ভূমিকা বেশি দেখা গেছে। পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, থ্রেডস ও টিকটকেও একই বয়ান ছড়ানো হয়।

পাল্টা প্রোপাগান্ডার চক্র

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতকে ঘিরে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রবণতা মূলত এক ধরনের পাল্টা প্রোপাগান্ডার ধারাবাহিকতা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাঈদ আল-জামান একে ‘ডিজিটাল প্রতিশোধপরায়ণতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 

তার ভাষায়, “এক দেশের ব্যবহারকারীরা অন্য দেশের ঘটনাকে রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে।”

ভারতীয় সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ীর পর্যবেক্ষণও একই ধরনের। তার মতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ঘটনাকে ঘিরে ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্টগুলোর অপপ্রচার এবং ২০২৬ সালে ভারতের সহিংসতাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলোর অপতথ্য- দুটিই একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি। তিনি বলেন, বাস্তব সংকটকে ভিত্তি করে দুই দেশেই অর্ধসত্য, বিকৃত তথ্য ও মিথ্যা নির্মাণ করে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো ভিডিও, ভিন্ন দেশের ছবি বা প্রসঙ্গবহির্ভূত কনটেন্ট ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। ‘ভুক্তভোগী বনাম নির্যাতনকারী’ ধরনের আবেগনির্ভর কাঠামো তৈরি করে মানুষের অনুভূতিকে প্রভাবিত করা হচ্ছে।

সাঈদ আল-জামানের ভাষায়, “পুরোনো ভিডিও বা প্রসঙ্গবহির্ভূত ছবি হলেও সেটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, যদি তা নিজের গোষ্ঠীর বয়ানের সঙ্গে মিলে যায়।”

অর্ক ভাদুড়ীর মতে, বাংলাদেশে ইসলামপন্থি এবং ভারতে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর ‘মোডাস অপারেন্ডি’ অনেকটাই একই ধরনের। 

তার ভাষায়, “ফেক নিউজ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও আমরা দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত ঐক্য দেখছি।”

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক মেরুকরণ, আবেগনির্ভর কনটেন্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম- এই তিনটি উপাদান অপতথ্য ছড়ানোর গতি বাড়িয়ে দেয়। ধর্মীয় উত্তেজনামূলক কনটেন্ট বেশি প্রতিক্রিয়া পায় বলেই অ্যালগরিদমও সেগুলো আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।

তাদের সতর্কবার্তা, অনলাইন গুজব কেবল ভার্চুয়াল জগতের সমস্যা নয়; এটি বাস্তবেও সংঘর্ষ ও সহিংসতার কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের অপতথ্য বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অবিশ্বাস, ঘৃণা ও বিভাজন তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক ও তথ্য-পরিবেশের জন্য এটি এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

থালাপতি বিজয়ের নামে মিথ্যা প্রচার

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
থালাপতি বিজয়ের নামে মিথ্যা প্রচার
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় ওরফে থালাপতি বিজয়

ভারতের তামিলনাড়ুর নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় ওরফে থালাপতি বিজয়ের নামে প্রচারিত ‘আমার রাজ্যে যদি কোনো হিন্দু মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করে, তাহলে এর ফল বিশ্বে ইতিহাস হয়ে যাবে। কাউকে ছাড় দেবো না কে কোন ধর্মের সেটা বড় কথা নয় নাগরিকের অধিকার সবার’ শীর্ষক মন্তব্যটি মিথ্যা বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার।

এই দাবিতে দেশের একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কালবেলা, চ্যানেল আই, ডিবিসি নিউজ, আমার দেশ, এনটিভি, ইত্তেফাক, মানবজমিন, মাছরাঙা টিভি, জাগোনিউজ২৪, সময়ের আলো, খবরের কাগজ, নয়া দিগন্ত, গ্লোবাল টিভি, এনপিবি নিউজ, দৈনিক সংগ্রাম, বার্তা বাজার, বাংলা টিভি, আমার সংবাদ, টাইমস টুডে, ঢাকা প্রকাশ, বায়ান্ন টিভি, বাংলাদেশ টাইমস, জনবাণী, বিডি২৪রিপোর্ট, দ্য নিউজ, সুখবর।

রিউমর স্ক্যানার জানায়, থালাপতি বিজয় এই মন্তব্য করেননি। প্রকৃতপক্ষে, ফেসবুকের অসমর্থিত পেজ থেকে অন্তত ৯ মে থেকে দাবিটি ছড়ানোর পর, যাচাই ছাড়াই গণমাধ্যমেও সেটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।

থালাপতি বিজয় আলোচিত দাবি সংক্রান্ত কোনো মন্তব্য করেছেন কিনা তা জানতে কিওয়ার্ড সার্চ করে ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটে ১১ মে ভোরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শপথের পর দেওয়া বক্তব্যে সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে বিজয় বলেছেন, তার সরকার তাদের পাশে থাকবে। তিনি বলেন, ‘আপনারা বিজয়কে শতভাগ বিশ্বাস করতে পারেন। আমি হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান-সবারই সমান।’ 

তার এমন বক্তব্যে আলোচিত দাবি সংক্রান্ত কোনো তথ্য মেলেনি।

অমিয়/

এসএসসির ভুয়া প্রশ্ন বিক্রির ফাঁদ: টেলিগ্রাম চক্রে পরীক্ষার্থীর নাম

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
এসএসসির ভুয়া প্রশ্ন বিক্রির ফাঁদ: টেলিগ্রাম চক্রে পরীক্ষার্থীর নাম
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

প্রতিবছরের মতো এবারও এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এবার প্রতারণার ধরনে এসেছে নতুন মাত্রা। ফেসবুক গ্রুপ ও টেলিগ্রাম চ্যানেলকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষার্থীদের কাছে ‘ফাঁস হওয়া প্রশ্ন’ বিক্রির প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে এআই প্রযুক্তিতে সম্পাদিত প্রশ্নপত্রের ছবি। এরপর টেলিগ্রাম বটের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে টাকা।

রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই প্রতারণাচক্রে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর, টেলিগ্রাম বটের ইউজারনেম এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তারিখ ২৯ এপ্রিল, ২০২৬। চলমান এসএসসি পরীক্ষার মাঝেই পরদিনের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পরীক্ষাকে ঘিরে শুরু হয় নতুন ধরনের প্রতারণার তৎপরতা। ২৮ এপ্রিল দুপুর থেকেই ফেসবুকে ‘Ssc 2026 প্রশ্ন ফাঁস গ্রুপ’ নামের একটি গ্রুপে আইসিটি প্রশ্ন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শেয়ার করা হচ্ছিল টেলিগ্রামের লিংক।

‘Raja Roy’ নামের একটি ভুয়া ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ২৯ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত এ–সংক্রান্ত মোট ১৭টি পোস্ট করা হয় গ্রুপটিতে। পোস্টগুলোতে দাবি করা হচ্ছিল, টেলিগ্রাম চ্যানেলে যোগ দিলেই পাওয়া যাবে পরীক্ষার প্রশ্ন।

তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রচারিত প্রশ্নের ছবিটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। ছবির বানান ভুল ও অস্বাভাবিক লেখার ধরন বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। আরও যাচাই করে রিউমর স্ক্যানার দেখতে পায়, ২০২৫ সালের এসএসসির আইসিটি প্রশ্নপত্রের ছবিকে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনা করেই নতুন এই ভুয়া প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে।

ফেসবুকের পোস্টগুলোতে টেলিগ্রামের যে লিংক দেওয়া ছিল সেটি মূলত একটি চ্যানেল। টেলিগ্রাম চ্যানেলটির নাম SSC Question Sell। সাবস্ক্রাইবার ৩৮০০-এর বেশি। গত ২৭ এপ্রিল এটি খোলা হয়। সেদিনই ‘Ssc 2026 প্রশ্ন ফাঁস গ্রুপ’ নামের ফেসবুক গ্রুপটিতে চ্যানেলটির প্রচারণা শুরু হয় Raja Roy নামের ভুয়া প্রোফাইলটি থেকে। কিছুটা কৌশল নিয়ে প্রথমে প্রশ্ন চেয়ে পোস্ট করা হয় প্রোফাইলটি থেকে। কয়েক ঘণ্টা পর একই প্রোফাইল থেকে টেলিগ্রামের আলোচিত চ্যানেলটি থেকে প্রশ্ন পাওয়া গেছে জানিয়ে পোস্ট করা হয়। এরপর থেকে নিয়মিত এই প্রোফাইল টেলিগ্রাম চ্যানেলটির প্রচারণা চালিয়ে আসছে এই গ্রুপে। 

২৭ এপ্রিল থেকেই সংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম চ্যানেলে বিভিন্ন বার্তার মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন পাওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছিল। বিশেষ করে ২৯ এপ্রিল, আইসিটি পরীক্ষার আগের পুরো দিনজুড়ে সেখানে ধারাবাহিকভাবে ‘প্রশ্ন দেওয়া হবে’ দাবি করে বার্তা প্রকাশ করা হয়।

এসব পোস্ট ও মেসেজে আইসিটি বিষয়ের এআই-সম্পাদিত ভুয়া প্রশ্নপত্রের ছবির একটি অংশ ব্যবহার করা হয়, যাতে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। একই সঙ্গে জানানো হয়, প্রশ্ন পেতে হলে ১০০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে এবং যোগাযোগ করতে হবে @Joyesh_Bot ইউজারনেমযুক্ত ‘Redwan’s_Method_Crackers’ নামের একটি টেলিগ্রাম বট আইডিতে।

রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের একজন প্রতিনিধি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ওই বট আইডিতে যোগাযোগ করলে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয়- কোন শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্ন প্রয়োজন। প্রতিনিধি ঢাকা বোর্ডের কথা জানালে প্রতারক পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেদিন রাত ১০টায় একটি আলাদা প্রাইভেট গ্রুপে প্রশ্ন সরবরাহ করা হবে। এর বিনিময়ে দাবি করা হয় ৯০০ টাকা।

নম্বর চাওয়ার পর এই বিকাশ নম্বর (01718974531) দেওয়া হয়। রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট নম্বরটি বিভিন্ন মাধ্যমে যাচাই করে দেখেছে। ট্রু কলারে নম্বরটির বিপরীতে ‘Gour Sundor Kaku’ নাম পাওয়া যাচ্ছে। বিকাশে একই নম্বরের পরিচয়ধারী হিসেবে ‘Gour Sundar Biswas’ নাম রয়েছে। নিকনেম ব্যবহার হচ্ছে ‘Scammer 1’। সার্চ ইঞ্জিন গুগলের বদৌলতে একই নম্বর বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের ওয়েবসাইটে যশোরের সিদ্দিপাশা ইউনিয়নের পেজেও পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে এই নম্বরের বিপরীতে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা পদে থাকা গৌর সুন্দর বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে। 

প্রাথমিক অনুসন্ধানে মোবাইল নম্বরটির বিপরীতে সম্ভাব্য মাধ্যমগুলোয় একই নাম পাওয়ার প্রেক্ষিতে নম্বরটি ফেসবুকে সার্চ করে এই নামে একটি প্রোফাইল খুঁজে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। 

যাচাই করে দেখা যায়, ‘গৌর সুন্দর বিশ্বাস’ নামের এই প্রোফাইলটি অন্তত ২০২২ সাল থেকে সক্রিয় রয়েছে ফেসবুকে। ওই বছর বিভিন্ন টিভি সিরিয়ালের লিংকের একটি গ্রুপের এডমিন হয়ে নিয়মিত সেখানে পোস্ট করা হতো। 

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে বিভিন্ন শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় দেখা যায় প্রোফাইলটিকে, নিয়মিত পোস্ট করা হতো পড়াশোনা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান চেয়ে।

এই প্রোফাইল থেকে শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্ম টেন মিনিট স্কুলের একটি ফেসবুক গ্রুপে ২০২৪ সালের এপ্রিলে করা একটি পোস্ট নজরে আসে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের, যাতে বলা হয়, পোস্টদাতার নাম জয়েশ বিশ্বাস (Joyesh Biswas)। তিনি নোয়াপাড়া শংকরপাশা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। ওই সময়ে সে নবম শ্রেণিতে পড়ছিল। এই পোস্টেও একই মোবাইল নম্বরটি দেওয়া ছিল। 

নোয়াপাড়া শংকরপাশা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি যশোরের অভয়নগরে অবস্থিত। বিদ্যালয়টির ওয়েবসাইট থেকে তার পরিচয় নিশ্চিত হতে পেরেছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট।  

টেন মিনিট স্কুলের গ্রুপটি এবং আরেক শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্ম Redwan’s Method-এর একটি গ্রুপে গত বছরের ডিসেম্বরে জয়েশ তার এসএসসির টেস্ট পরীক্ষার একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টের ছবি পোস্ট করে। এসব পোস্ট থেকে জানা যায়, জয়েশ এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে।  

জয়েশের বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ফলাফল পর্যালোচনায় বোঝা যায়, সে মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। তার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল ঘেঁটে গেমিংয়ের নেশা থাকার বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে। তার সঙ্গে গৌর সুন্দর বিশ্বাসের সম্পর্কের বিষয়ে ওপেন সোর্স অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, টেলিগ্রামে বট প্রোফাইলটির ইউজার নেম তারই নামে এবং বটের নাম রাখা অনলাইনের একটি শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্মের নামে যেখানে সে নিজেও শিক্ষার্থী ছিল। যদিও এই অনুসন্ধান চলাকালীন এই নাম বদলে ফেলা হয়। বর্তমান নাম, ‘বাংলাদেশ শিক্ষাবোর্ড (Payment)।’

আজ রবিবার সকাল পর্যন্ত টেলিগ্রামের চ্যানেলটিতে এসএসসির ছয়টি বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁসের ভুয়া দাবি ছড়ানো হয়েছে। এসব প্রশ্ন পেতে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩০০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, একই বিষয়ের প্রশ্নের জন্য তিনবার তিন পরিমাণ (প্রথমে ২০০০, পরে ১২০০, সবশেষে ১০০০) অর্থ চাওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত মেসেজগুলোয় ব্যবহার করা হচ্ছে এআই দিয়ে সম্পাদনা করে তৈরি ভুয়া প্রশ্ন। 

এসএসসির প্রশ্নফাঁসের গুজবকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার নতুন ও উদ্বেগজনক এই প্রবণতা দুশ্চিন্তার তৈরি করছে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে। এআই দিয়ে ভুয়া প্রশ্নের ছবি তৈরি, টেলিগ্রাম বট ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত প্রচারণা-সব মিলিয়ে প্রতারকরা এখন আরও কৌশলী ও সংগঠিত হয়ে উঠছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে পরীক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিতও মিলছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা ও অনলাইন প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিকে সামনে আনছে। পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগকে পুঁজি করে পরিচালিত এসব কার্যক্রম শুধু আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিই তৈরি করছে না, বরং শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষাপদ্ধতির প্রতি আস্থাও দুর্বল করে দিচ্ছে।

শেখ হাসিনার হজে যাওয়ার ভিডিও প্রচার, যা জানা গেল ফ্যাক্ট চেকে

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম
শেখ হাসিনার হজে যাওয়ার ভিডিও প্রচার, যা জানা গেল ফ্যাক্ট চেকে
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয়ে নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লি বিমানবন্দর হয়ে পবিত্র হজ পালন করতে সৌদি আরব যাচ্ছেন, এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।

ভিডিওতে বিমানবন্দরের ভেতরের দৃশ্য দেখে বোঝা যাচ্ছে, এটি হজযাত্রীদের যাত্রার জন্য নির্ধারিত একটি টার্মিনাল। ছবির কেন্দ্রে সাদা শাড়ি ও মাথায় ওড়না পরা শেখ হাসিনা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তার গলায় একটি আইডি কার্ড ঝুলছে এবং হাতে তসবিহ ধরা। হাতে ঝোলানো একটি ছোট ব্যাগ, যেখানে ‘Hajj 2024’ লেখা দেখা যায়। এটি ইঙ্গিত করে তিনি হজ পালনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করছেন। কিন্তু ২০২৪ লেখা দেখে খটকা লাগা স্বাভাবিক।

আরেকটি ভিডিওতে শেখ হাসিনাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছেন চারজন সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী, পেছনের দিকে আরও কয়েকজন হজযাত্রী দেখা যাচ্ছে, যারা সাদা ইহরাম পোশাক পরা এবং লাগেজসহ এগোচ্ছেন। সবমিলিয়ে, হজযাত্রার একটি পরিবেশ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিটিতে। ফেসবুকে ‘শেখ হাসিনা জয় বাংলা’ নামের একটি পেজে ছবিটি রিলস আকারে পোস্ট করে ক্যাপশনে বলা হচ্ছে, ‘দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে হজ্ব করার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’।

এসব ভিডিও যাচাই করতে গিয়ে রিউমর স্ক্যানার গুগলের বিশেষ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির শরণাপন্ন হয়। ছবিটি সিন্থআইডি দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই ছবিটির পুরো অংশ বা অনেকটা অংশই গুগল এআই ব্যবহার করে তৈরি বা এডিট করা হয়েছে।

শুধু এই ছবিই নয়, শেখ হাসিনার হজযাত্রা দাবিতে আরও দুইটি ছবি এবং একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে আসল দাবিতে ছড়িয়েছে আওয়ামীপন্থি বিভিন্ন পেজে।

এসব কনটেন্ট যে এআই দিয়ে বানানো তা প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণে সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, অসংখ্য মানুষ এসব কনটেন্টকে বাস্তব ধরে নিয়ে মতামত দিচ্ছেন।

এ বছর প্রথম হজ ফ্লাইট যাত্রা করে গত ১৭ এপ্রিল। ভারতে পরদিন ১৮ এপ্রিল সে দেশের প্রথম হজ ফ্লাইট ছেড়ে গেছে দিল্লি থেকে। সেদিনই দুপুরে শেখ হাসিনার আলোচিত ছবিটি ছড়াতে দেখা যায়। 

১৯ এপ্রিল সকালে আরেকটি ছবি প্রচার করা হয়। দাবি করা হয়, শেখ হাসিনা সৌদি বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। বিশ্লেষণ বলছে, এটিও এআই দিয়ে তৈরি হওয়া ছবি। 

সফরের ধারাবাহিক কার্যক্রম হিসেবে এরপর সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণে শেখ হাসিনার ভোজের দৃশ্য ‘সৌদি বাদশার বিশেষ আমন্ত্রণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শেখ হাসিনা।’ শিরোনাম দিয়ে পোস্ট করা হয়েছে পেজে। এই পোস্টটি ভাইরাল হয়েছে অবশ্য ভিন্ন ক্যাপশনে। একাধিক পেজে ছবিটি দিয়ে বলা হচ্ছে, “সৌদী জুবরাজের আমন্ত্রণে একসঙ্গে খাবার খাচ্ছেন শেখ হাসিনা ! জুবরাজ বলেছেন হাসিনাকে সম্মানের সাথে বাংলাদেশে না ফিরতে দিলে কঠিন পদক্ষেপ দিবে সৌদি সরকার!” 

গুগল জেমিনি জানাচ্ছে, এআই দিয়ে তৈরি ছবিটি বিশ্লেষণে প্রেক্ষাপট, ব্যক্তিদের মুখাবয়ব ও অঙ্গভঙ্গি এবং খাবার ও টেবিলের ডিটেইলস সংক্রান্ত অসঙ্গতি চোখে পড়ে। এ ধরনের এআই-তৈরি কনটেন্টকে সাধারণ মানুষ সত্য ধরে নেওয়ার ফলে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

অমিয়/

হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য মিথ্যা: রিউমর স্ক্যানার

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৪:১১ পিএম
হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য মিথ্যা: রিউমর স্ক্যানার
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

গত আট বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে সাংবাদিকদের কাছে যে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, তা ভুল বলছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার।

অনুসন্ধান করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশব্যাপী হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল। ইউনিসেফের প্রবন্ধ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হয় এই তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানটি। 

গতকাল (২৯ মার্চ) সাংবাদিকদের কাছে এক বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। এরপর আর এই ভ্যাকসিন কোনো গভর্নমেন্ট দেয় নাই। আমরা কিন্তু এর মধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। পারচেজ কমিটি পাশ হয়েছে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একাধিক প্রবন্ধ সামনে আসে।

২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হামের টিকাদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশে।

ইউনিসেফের প্রবন্ধে জানানো হয়, ‘সম্প্রতি দেশজুড়ে ৩ কোটি ৬০ লক্ষ শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়ার বিশাল কাজটি যারা সম্পন্ন করেছেন এমন হাজার হাজার বাংলাদেশি স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে ইয়োচুঙ্গু একজন। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার এই টিকা অভিযানটি সম্পন্ন করে।’

সেখানে আরও বলা হয়, ‘২০২০ সালের মার্চ মাসে এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এটি স্থগিত করা হয়। এমনকি ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একবার চালু করার পরে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ছিল যে, এবারের কার্যক্রম অন্যবারের চেয়ে ভিন্নতর হবে। অবশেষে টিকা দেওয়ার জায়গাগুলিতে ভিড় এড়াতে তিন সপ্তাহের পরিকল্পিত কার্যক্রমকে ছয় সপ্তাহব্যাপী চালানো হয়।’

এ বিষয়ে ফেসবুকেই ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যে অসংখ্য পোস্ট খুঁজে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার, যেগুলোতে সেসময় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের আওতায় শিশুদের টিকা দেওয়ার সময়ের ছবিসহ আনুষ্ঠানিক তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি যে সত্য নয় তা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা একটি জাতীয় দৈনিককে জানান, এটি সত্য নয়; টিকা ইপিআইয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ এবং সব সময় দেওয়া হয়। নিয়মিত টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, তাই কয়েক বছর পরপর ক্যাম্পেইন করা হয়।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপ-পরিচালক মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘অনেক শিশু ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তাই টিকাদানের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০২০ সালে ক্যাম্পেইন চালিয়েছে; ২০২৪ সালে করার পরিকল্পনা থাকলেও তা হয়নি। এপ্রিলে নতুন ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা রয়েছে। গ্যাভির সহায়তায় সারা দেশে হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি চার বছর অন্তর ফলোআপ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়, যাতে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা যায়। 

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) বাইরেও বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে হামের টিকা পাওয়া যায়। সাধারণত বেসরকারি পর্যায়ে এমএমআর (মিজেলস, মাম্পস, রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়, যা হামের পাশাপাশি মাম্পস ও রুবেলা থেকেও সুরক্ষা দেয়। চলতি বছরও এমন টিকা দেওয়ার পোস্ট পাওয়া গেছে ফেসবুকে। 

টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা বিভাগের (ইপিআই) নিজস্ব ড্যাশবোর্ড রয়েছে, যেখানে বছরভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সংক্রান্ত ডাটাবেজ থেকে জানা যায়, অন্তত ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিবছরই এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে। এই হার কখনোই ৭০ শতাংশের নিচে নামেনি। তবে ২০২৫ সালের কোনো তথ্য এই ডাটাবেজে নেই। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা বিভাগের (ইপিআই) নিজস্ব ড্যাশবোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হামের টিকাদান হার কখনোই ৮১ শতাংশের নিচে নামেনি। তবে ২০২৫ সালে এই হার দাঁড়িয়েছে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশে। 

তবে টিকা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ড্যাশবোর্ডের তথ্য অসম্পূর্ণ।

অর্থাৎ, গত ৮ বছরে হামের টিকা সরকার দেয়নি বলে যে দাবি ছড়াচ্ছে তা সঠিক নয়। সুতরাং, গত আট বছরে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের দাবিটি মিথ্যা।

অমিয়/