নেদারল্যান্ডস উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশ এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে আন্তজার্তিক শিক্ষার্থীরা দেশটিকে বেছে নেয় উচ্চশিক্ষার জন্য।
ভর্তির যোগ্যতা
নেদারল্যান্ডসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একটি জাতীয় মান নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হয়। ফলে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান অত্যন্ত ভালো। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় এবং কোর্সের ধরন অনুযায়ী এসব প্রোগ্রামের চাহিদাও ভিন্ন হয়ে থাকে।
দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হতে হলে আপনাকে উচ্চ মাধ্যমিক বা স্কুল ডিপ্লোমা পাসের সনদ দেখাতে হবে। যদি আপনি ডাচ ভাষায় কোর্স করতে চান, তাহলে অবশ্যই ‘ডাচ এনটি টু’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আর স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তি হতে হলে ব্যাচেলর ডিগ্রি থাকতে হবে। সেই সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে।
আইইএলটিএস পরীক্ষায় কমপক্ষে ৬.৫ স্কোর প্রয়োজন।
অথবা টোফেল পরীক্ষায় পেতে হবে ৫৫০ (পেপার ভিত্তিক) বা ২১৩ (কম্পিউটার ভিত্তিক) স্কোর।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়
নেদারল্যান্ডসের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছরে দুবার অর্থাৎ দুটি সেশনে আবেদন করার সুযোগ থাকে। একটি সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর/জানুয়ারি আর অপরটি ফেব্রুয়ারি-জুলাই/আগস্ট পর্যন্ত। ভর্তির ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ঘুরে দেখলে সেখানে সব তথ্য পেয়ে যাবেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইট সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সোর্স।
কাগজপত্র সত্যায়ন
ইউরোপীয় অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নেদারল্যান্ডসে আবেদন করতে ডকুমেন্টস সত্যায়নের প্রয়োজন পড়ে। আর সত্যায়নের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব পোর্টালে বলা থাকে। আপনার ডকুমেন্টস কার মাধ্যমে সত্যায়ন প্রয়োজন সেটা সম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত।
ভর্তির আবেদন, অফার লেটার ও টিউশন ফি
নেদারল্যান্ডসের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন আবেদন পোর্টাল ব্যবহার করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যাচেলর ফলাফল, সিভি, আইইএলটিএস পরীক্ষার স্কোর, জিআরই/জিম্যাট স্কোর, প্রেরণাপত্র, সুপারিশপত্র, ব্যাচেলর থিসিস বা ইন্টার্নশিপ রিপোর্ট ইত্যাদির ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করে থাকে। এগুলোর ভিত্তিতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয় অথবা ছয় মাসের বা এক বছরের প্রি-মাস্টার্স কোর্স অফার করে থাকে। প্রি-মাস্টার্স কোর্স করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়া আপনি রিসার্চ ভিত্তিক মাস্টার্স প্রোগ্রামে আবেদন করতে পারেন। এই প্রোগ্রামের সুবিধা হলো আপনার পিএইচডি প্রোগ্রামে আবেদন করার পথ অনেকটা প্রশস্ত হয়ে যাওয়া। আর নেদারল্যান্ডসে রিসার্চভিত্তিক মাস্টার্স প্রোগ্রামে প্রচুর রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে আবেদনের সুযোগ আছে। এ ছাড়া রিসার্চভিত্তিক মাস্টার্স প্রোগ্রামে ফুল স্কলারশিপও পাওয়া যায়। দেশটিতে পড়তে বছরে খরচ হতে পারে প্রায় ৮ থেকে ২০ হাজার ইউরো। তবে পোস্ট ডক্টরাল প্রোগ্রামে মাসে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ইউরো বেতন হিসেবে পাওয়া যায় এবং পোস্ট ডক্টরাল প্রোগ্রামে টিউশন ফি দিতে হয় না।
আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ
আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ স্বরূপ আপনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার ইউরো ট্রান্সফার করতে হবে অথবা খরচ করার ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হতে পারে। তবে চিন্তার কিছু নেই- নেদারল্যান্ডসে বসবাসের জন্য আপনার খরচ এই অঙ্কের অনেক কম। আর চাইলে এই অর্থ আপনি পরে তুলে নিতে পারবেন।
ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া
প্রথমত নেদারল্যান্ডসে ভিসা আবেদনের সময় আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ থাকতে হবে এবং পাসপোর্ট ১০ বছরের পুরোনো হলে চলবে না। এ ছাড়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট থাকতে হবে। জন্মসনদ, ভোটার আইডি থেকে শুরু করে অন্যান্য সব ডকুমেন্টসের সমন্বয়ে আপনাকে আবেদন করতে হবে।
খণ্ডকালীন চাকরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়
নেদারল্যান্ডসের খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ খুব কম এবং বেশির ভাগ কাজ রেস্টুরেন্টেই সীমাবদ্ধ। তবে কর্তৃপক্ষ আপনাকে সপ্তাহে ১৬ ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ দেবে। কাজ করে পড়াশোনার ব্যয় চালানো কষ্টকর। তবে পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরি খোঁজার জন্য নেদারল্যান্ডস কর্তৃপক্ষ আপনাকে এক বছরের ভিসা দেবে। আপনি যদি প্রযুক্তিগত শিক্ষা লাভ করেন কিংবা আইটিবিষয়ক দক্ষতা থাকে তবে নেদারল্যান্ডসে আপনার সুযোগ অনেক। দেশটিতে একজন শিক্ষার্থী শেয়ার ফ্ল্যাট নিলে প্রতি মাসে খরচ পড়বে ২৬০ থেকে ৩৫০ ইউরো। খাওয়া-দাওয়া বাবদ ৩০০ ইউরোর মতো খরচ হতে পারে। তবে চেষ্টা করলে থাকার জন্য ভার্সিটির মাধ্যমে হোস্টেল অথবা বাসা পাওয়া সম্ভব।
কোর্স শেষে চাকরি ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগ
নেদারল্যান্ডসে কোর্স শেষ করার পর শিক্ষার্থীরা এক বছরের ভিসার মাধ্যমে চাকরি খুঁজতে পারেন। এই সময়ের মধ্যে চাকরি পেলে ওয়ার্ক পারমিটে রূপান্তর সম্ভব। স্থায়ী বসবাসের (PR) জন্য অন্তত পাঁচ বছর নেদারল্যান্ডসে থাকতে হয়। তবে এই সময়ে টানা ছয় মাসের বেশি দেশের বাইরে থাকলে আবেদন যোগ্যতা হারাতে পারেন। দেশটিতে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যায় আট বছর থাকার পর। তবে শিক্ষার্থী হিসেবে কাটানো সময়ের অর্ধেক গণনা হবে যেমন- পাঁচ বছর পড়াশোনা করলে ২.৫ বছর ধরা হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
/রিয়াজ