জাকসু-হল সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি পদে নেই প্রতিদ্বন্দ্বী।
দীর্ঘ ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। তবে ভোটের মাঠে বিভক্ত অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো। এই বিভাজন ভোটের ফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে চলছে নানা আলোচনা।
এই নির্বাচনে দুটি প্যানেলের পাশাপাশি স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী হয়েছেন কয়েকজন বামপন্থি শিক্ষার্থী। সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, পৃথকভাবে নামার আগে ঐক্যের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি।
দুটি প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন (অদ্রি-অর্ক), বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী, ইন্ডিজেনাস স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনস এবং সাংস্কৃতিক জোটের একাংশের নেতৃত্বে ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ নামে একটি প্যানেল ঘোষণা করা হয়। এই প্যানেলে ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের ৬ জন, সাংস্কৃতিক জোটের ৭ জন, ইন্ডিজেনাস স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ৫ জন, গণকৃষ্টির ৩ জনসহ আরও কয়েকজন প্রার্থী রয়েছেন। সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি অমর্ত্য রায় জন এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে লড়বেন সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি শরণ এহসান।
অন্যদিকে ছাত্র ইউনিয়ন (ইমন-তানজিম) ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ‘সংশপ্তক পর্ষদ’। এ প্যানেল থেকে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ইমন। এ ছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে সোহাগী সামিয়া জান্নাতুল ফেরদৌস, তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে সৈয়দ তানজিম আহমেদ, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে তানজিল আহমেদ এবং সহসমাজসেবা সম্পাদক (নারী) পদে সাদিয়া ইমরোজ ইলা প্রার্থী হয়েছেন।
এ দুই প্যানেলের বাইরে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের (মার্ক্সবাদী) সংগঠক সজীব আহম্মদ জেনিচ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
কেন এই বিভক্তি
সংশপ্তক পর্ষদের জিএস প্রার্থী ইমন বলেন, ‘ঐক্য গড়ার বিষয়ে আমরা ইতিবাচক ছিলাম। কিন্তু অন্যান্য সংগঠনের নিজস্ব কারণে এক হওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আমরা এখনো ঐক্যবদ্ধ জায়গায় আছি। এ কারণে আমরা অন্য কোনো বামপন্থির বিরুদ্ধে প্রার্থী দিইনি।’
অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেনিচের অভিযোগ, ছাত্র ইউনিয়নের একটি অংশ রাজনৈতিক স্বার্থে ঐক্য চায়নি। তার ভাষায়, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম এক করার, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। শেষ পর্যন্ত আমি নির্দিষ্ট কোনো প্যানেলে গিয়ে অন্যদের মন খারাপ করতে চাইনি।’
সম্প্রীতির ঐক্যের সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক প্রার্থী ও ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের সাধারণ সম্পাদক আবরার হক অর্ক বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক সংগঠনের বদলে প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়েছি। আমাদের প্যানেলে সেই শক্তিকেই একত্র করা হয়েছে।’
ভোটের মাঠে প্রভাব
এ বিভাজন ভোটে প্রভাব ফেলবে কি না, তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। আবরার হক অর্ক মনে করেন, বিভক্তি কোনো প্রভাব ফেলবে না; শিক্ষার্থীরা দেখবে কে তাদের জন্য মাঠে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। সংশপ্তক পর্ষদের ইমনও বলেছেন, ভোটে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। কেননা অন্য বামপন্থিদের বিরুদ্ধে তাদের কোনো প্রার্থী নেই।
তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেনিচের মতে, ‘এটা অবশ্যই বড় প্রভাব ফেলবে। বিভক্তি নির্বাচনের জন্য খারাপ বার্তা।’
হল সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অর্ধেকেরও কম
কেন্দ্রীয় জাকসুতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও হল সংসদ নির্বাচনের চিত্র ভিন্ন। ২১টি আবাসিক হলের ৩১৫টি পদের মধ্যে অন্তত ১০২টি পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় নিশ্চিত হয়ে গেছে। অন্যদিকে ৬৩টি পদে কোনো প্রার্থীই নেই। ফলে, কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ১৫০টি পদে; যা মোট আসনের প্রায় ৪৮ শতাংশ।
হলভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়, নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে ভিপি-জিএসসহ ৬টি পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় নিশ্চিত, ৯টি পদ শূন্য রয়েছে। একইভাবে আরও অন্তত ৪টি ছাত্রী হলে ভিপিসহ একাধিক পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে না। এতে অনেক হলে নির্বাচনি আমেজ অনুপস্থিত।
কারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়
বেগম সুফিয়া কামাল হলে ১০ জন, বীরপ্রতীক তারামন বিবি হলে ৪ জন, রোকেয়া হলে ৪ জন, প্রীতিলতা হলে ১০ জন, নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে ৬ জন, ফজিলাতুন্নেছা হলে ৯ জন, ১৩ নম্বর ছাত্রী হলে ১ জন, বেগম খালেদা জিয়া হলে ৬ জন, ১৫ নম্বর ছাত্রী হলে ৬ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করতে যাচ্ছেন।
ছাত্রদের ১১টি হলের মধ্যে আ ফ ম কামালউদ্দিন হলে ৫ জন, আল-বেরুনী হলে ৫ জন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে ৮ জন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে ১ জন, মওলানা ভাসানী হলে ৩ জন, মীর মশাররফ হোসেন হলে ২ জন, শহিদ রফিক-জব্বার হলে ৩ জন, শহিদ সালাম-বরকত হলে ৯ জন, শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ হলে ৪ জন, ১০ নম্বর ছাত্র হলে ৩ জন ও ২১ নম্বর ছাত্র হলে ৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন।
এ ছাড়া ২১টি হলের মধ্যে ১৬টি হলে শূন্য পদ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শূন্য রয়েছে ১৩ নম্বর ছাত্রী হলে ১২টি এবং নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে ৯টি, বেগম খালেদা জিয়া হলে ৭টি, বীরপ্রতীক তারামন বিবি হল ও রোকেয়া হলে ৬টি করে পদ শূন্য রয়েছে।
হল সংসদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্বাচনের পর হল সংসদের সভায় কোরাম পূরণ করতে হলে নির্বাচিত অন্তত ৪ জন সদস্যের প্রয়োজন হবে। কিন্তু ১৩ নম্বর ছাত্রী হলে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন ৩ জন। সে ক্ষেত্রে ওই হলে আবার শূন্য পদগুলোতে নির্বাচন হবে।
এ প্রসঙ্গে জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার বলেন, ‘যেসব হলে শূন্য পদ রয়েছে ওই পদগুলোতে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের সময় বাড়ানোর বিষয়ে প্রস্তাবনা এলেও মতানৈক্যের কারণে তা হয়নি। এমতাবস্থায় নির্বাচনের পর আবারও নির্বাচন দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে কমিশন।’
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে লড়াই জমজমাট। শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে প্রচারণা। বিশ্ববিদ্যালয় জনাকীর্ণ এলাকায় চলছে রমরমা প্রচার। এবারের নির্বাচনে ২৫টি পদে ১৭৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ভিপি পদে ১০ জন, জিএস পদে ৯ জন, বিভিন্ন সম্পাদকীয় ও কার্যকরী সদস্য পদেও একাধিক প্রার্থী রয়েছে।
জাকসু নির্বাচনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) সমর্থিত তিন সদস্যবিশিষ্ট প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।
গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্যানেল ঘোষণা করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির স্কুলবিষয়ক সম্পাদক দীপা মজুমদার।
দর্শন বিভাগের সজীব আহম্মদ জেনিচ এজিএস পদে, চারুকলা বিভাগের রোকেয়া আমিন অনুসূয়া কার্যকরী সদস্য নারী ও দর্শন বিভাগের মো. সুমন হোসেন কার্যকরী সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানানো হয়েছে। তারা তিনজনই সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সক্রিয় সংগঠক এবং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন। প্যানেল ঘোষণা শেষে এজিএস পদপ্রার্থী সজীব আহম্মদ জেনিচ দীর্ঘ ইশতেহার পাঠ করেন।