নীলক্ষেতে ব্যালট ছাপানো কোনোভাবেই ভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান।
তিনি জানান, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন গত ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হলেও অভিযোগ যেন পিছু ছাড়ছে না। ব্যালট রাজধানীর নীলক্ষেতে ছাপানো হলেও পরবর্তীতে চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তার সীলমোহরসহ কয়েক ধাপ অনুসরণ করে ব্যালট প্রস্তুত করা হয়। জানানো হয়েছে, ব্যালট পেপার ছাপানোর স্থান বা সংখ্যা সুষ্ঠু ভোটকে প্রভাবিত করে না। ডাকসু নির্বাচনে মোট ব্যালট ব্যবহার করা হয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯২৬টি এবং অবশিষ্ট ব্যালট ৬০ হাজার ৩১৮টি। এ ছাড়া সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভোটারদের স্বাক্ষরিত তালিকা আবেদন সাপেক্ষে দেখানো হবে।’
রবিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ভবনের অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা জানান।
এ সময় ঢাবি উপাচার্য বলেন, ‘সমস্ত নিয়ম মেনে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে একটি অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে ব্যালট পেপার ছাপানোর দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। রেকর্ড সংখ্যক ভোটার ও প্রার্থীর বিবেচনায় দ্রুততম সময়ে নির্ধারিত পরিমাণ ব্যালট ছাপানোর স্বার্থে আমাদের মূল ভেন্ডরের সঙ্গে আলোচনা করে সমযোগ্য একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে একই টেন্ডারের অধীনে কাজে সম্পৃক্ত করার অনুমতি দেওয়া হয়।’
নীলক্ষেতে ব্যালট ছাপানোর তথ্যটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে উক্ত সহযোগী ভেন্ডর অবহিত করেনি বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান।
তিনি বলেন, ‘সহযোগী ভেন্ডরের তথ্য অনুযায়ী, সহযোগী প্রতিষ্ঠান নীলক্ষেতে ২২ রিম কাগজ দিয়ে ৮৮ হাজার ব্যালট ছাপায়। যা থেকে প্রিন্টিং, কাটিং, প্রি-স্ক্যান পর্ব শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণে ব্যালট প্যাকেটে সিলগালা করে ৮৬ হাজার ২৪৩টি ব্যালট সরবরাহযোগ্য করা হয় এবং অতিরিক্ত ব্যালটগুলো প্রচলিত পদ্ধতিতে নষ্ট করে ফেলা হয়। ভেন্ডর আরও জানায় যে, নীলক্ষেতে কাটিং শেষে প্রি-স্ক্যান ও পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য তারা তাদের মূল অফিসে এনে প্রি-স্ক্যান সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট পরিমাণে প্যাকেটে ভরে সিলগালা করে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরবরাহ করে। তারা আরও জানায় যে, ব্যালট প্রস্তুতকরণ প্রক্রিয়ায় ও আনা–নেওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তি মোতাবেক সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। ব্যস্ততার কারণে কর্তৃপক্ষকে তারা নীলক্ষেতে ব্যালট প্রিন্টিং ও কাটিংয়ের বিষয়টি জানাতে ভুলে যায় বলে স্বীকার করে।’
নীলক্ষেতে ব্যালট ছাপানো কোনোভাবেই ভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে না এবং ছাপানোর পর কয়েক ধাপে সবশেষ রিটার্নিং কর্মকর্তার সীলসহ স্বাক্ষরের মাধ্যমে একটি ব্যালট প্রস্তুত করা হয়েছিল বলে জানিয়ে উপাচার্য বলেন, ‘এটা পরিষ্কারভাবে অনুধাবনযোগ্য যে, ব্যালট পেপার ছাপানোর স্থান বা সংখ্যা সুষ্ঠু নির্বাচনকে কোনোভাবে প্রভাবিত করে না। কারণ, ব্যালট পেপার ভোটের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করতে কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। ব্যালট পেপারটি ছাপানোর পর তা নির্দিষ্ট পরিমাপে কাটিং করতে হয়। তারপর সুরক্ষা কোড আরোপ করে ওএমআর মেশিনে প্রি-স্ক্যান করে তা মেশিনে পাঠযোগ্য হিসেবে প্রস্তুত করতে হয়। এরপর চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তার সীলসহ স্বাক্ষর ও কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত হলেই তা ভোট গ্রহণের জন্য উপযুক্ত হয়। এ সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই পূর্ণ সতর্কতার সঙ্গে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে।’
সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চূড়ান্তভাবে ২ লাখ ৩৯ হাজার ২৪৪টি ব্যালট ভোট গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা হয়। মোট ভোটার ৩৯ হাজার ৮৭৪—প্রতি ভোটারের জন্য ৬টি ব্যালট। মোট ভোট দিয়েছেন ২৯ হাজার ৮২১ জন ভোটার। মোট ব্যালট ব্যবহার করা হয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯২৬টি, অবশিষ্ট ব্যালট ৬০ হাজার ৩১৮টি বলে উল্লেখ করেন উপাচার্য।
আবেদন সাপেক্ষে সিসিটিভি ফুটেজ ও স্বাক্ষরযুক্ত ভোটার উপস্থিতি দেখতে পারবেন জানিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, ‘অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভোটারদের স্বাক্ষরিত তালিকার বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। এ বিষয়ে ইতোপূর্বে আমরা বিস্তারিত জানিয়েছি যে, কোনো প্রার্থী যদি সুনির্দিষ্ট কোনো সময়ের বা প্রাসঙ্গিক কোনো ঘটনা পর্যালোচনা করার জন্য সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চান, তারা যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মনোনীত বিশেষজ্ঞ বা মনোনীত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নির্ধারিত কোনো স্থানে তা দেখতে বা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। ভোটারদের স্বাক্ষরযুক্ত ভোটার তালিকা দেখানোর বিষয়ে আমরা পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ আইনজীবীদের সঙ্গে অধিকতর আলোচনা করেছি। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী যদি নির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণে নির্দিষ্ট কারও স্বাক্ষর পর্যবেক্ষণ করতে চান, সেক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মনোনীত বিশেষজ্ঞ বা মনোনীত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে তা দেখানো যেতে পারে।’
পদ্ধতিগত নানারকম প্রশ্ন তুলে ডাকসু নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা চলছে উল্লেখ করে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, ‘বিভিন্ন পর্যায়ে যে অভিযোগ পেয়েছি, প্রত্যেকটির জন্য ব্যবস্থা নিয়েছি। ৪৮টি অভিযোগের সাধারণ বিষয়গুলোর জবাব দিয়েছি। ১৬টি অভিযোগ ৬৯ ধারায় ব্যক্তি পর্যায়ে অফিসিয়াল চিঠির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছি। এরপরও আমরা লক্ষ্য করেছি, নির্বাচনকে পদ্ধতিগত নানারকম প্রশ্ন তুলে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা চলছে। বিশেষ করে সর্বশেষ কয়েক সপ্তাহ পরে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা চলছে। নির্বাচনের দিন দুটি অভিযোগ উঠেছিল, বিশেষ করে একুশে হলে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছি। টিএসসিতে একজন ভোটার আগে ব্যালটে মার্ক ছিল বলে অভিযোগ করেছিলেন। পরীক্ষা করে দেখেছি, ভোটার নিজেই একাধিকবার প্রবেশ করেছিলেন। অভিযোগ তার দিকেই গেছে।’
এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, উপউপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন, প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ, চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, গত ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে শীর্ষ তিনটি পদসহ ২৩টি পদে জয়ী হয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট এবং বাকি পাঁচ পদে জয় পান স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নির্বাচনের দিনই ভোটকে ঘিরে কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বয়কট ও প্রত্যাখ্যান করেন সরে দাঁড়ানো অনেক প্রার্থী।
আরিফ/মেহেদী/