রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন সামনে রেখে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গত রবিবার রাতে দুটি আবাসিক হলে তল্লাশিও চালানো হয়।
সোমবার (১৩ অক্টোবর) বেলা ৩টার দিকে নিরাপত্তার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি), র্যাব ও বিজিবির প্রতিনিধিদের মধ্যে এক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভা শেষে আরএমপি কমিশনার আবু সুফিয়ান জানান, নির্বাচন উপলক্ষে ক্যাম্পাসে দুই হাজারের বেশি পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি ছয় প্লাটুন বিজিবি ও ১২ প্লাটুন র্যাব মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা, বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যরাও নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশ নেবেন।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘ভোটের দিন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ভোট গ্রহণ থেকে ফলাফল ঘোষণার পুরো প্রক্রিয়া পর্যন্ত আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখব। বিশ্ববিদ্যালয়ের খোলা জায়গা ও কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও বিশেষভাবে আলোচনা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে কিছু বস্তি এলাকা রয়েছে, যেখানে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে আমরা মনে করছি। সেই এলাকাগুলোতেও তল্লাশি চালানো হবে। এ ছাড়া আবাসিক হলে যেন কোনো বহিরাগত অবস্থান না করে, সে বিষয়ে হল প্রশাসন নজরদারি করছে।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. এফ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন বাহিনীর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনেরও একটি বিশেষ টিম মাঠে কাজ করবে। কোনো প্রার্থী বা প্যানেল আচরণবিধি ভঙ্গ করলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জানা গেছে, রবিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ ও মতিহার হলে যৌথ অভিযান চালায় পুলিশ, প্রক্টরিয়াল বডি ও হল প্রশাসন। এ সময় দুই হলে মোট পাঁচজন অনাবাসিক শিক্ষার্থীকে অবস্থান করতে দেখা গেছে। তাদের গতকাল সোমবারের মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘মতিহার হলে অভিযান চালিয়ে তিনজন এবং বিজয়-২৪ হলে দুজন অনাবাসিক শিক্ষার্থীকে পাওয়া গেছে। তারা সবাই সংশ্লিষ্ট হলেরই ছাত্র। অনাবাসিক হওয়ায় তাদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছি। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা খুবই দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন। এখন হলের পরিবেশ অনেক ভালো আছে।’
এদিকে আবাসিক হলে পুলিশের তল্লাশি চালানোর ঘটনায় সমালোচনা করেছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র গণমঞ্চের আহ্বায়ক নাসিম সরকার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘যেভাবে তল্লাশি হচ্ছে, মনে হয় হলগুলোতে শিক্ষার্থী থাকেন না, সন্ত্রাসী থাকে। পুলিশকে হলে ঢুকিয়ে নরমালাইজ করার চেষ্টা বিশেষ ভালো লক্ষণ নয়। আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে মনে করিয়ে দিচ্ছে।’
গতকাল ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের ফটকগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
উৎসবের আমেজে মুখরিত ক্যাম্পাস
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে নবীন শিক্ষার্থীদের ফুল ও শিক্ষাসামগ্রী দিয়ে বরণ করে নেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব।
নবীনবরণ অনুষ্ঠানেও নির্বাচনের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। দেখা গেছে, মিলনায়তনের আশপাশে বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা নবীন শিক্ষার্থীদের হাতে লিফলেট ও শুভেচ্ছা কার্ড তুলে দিচ্ছেন। কেউ হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, কেউবা নিজের ইশতেহার ব্যাখ্যা করছেন। এতে নবীনবরণ পরিণত হয় নির্বাচনি রঙে রাঙানো এক উৎসবে।
‘লিফলেট মাটিতে ফেললেই জন্মাবে গাছ’
ভিন্ন আঙ্গিকে লিফলেট তৈরি করে ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলেছেন শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত বিজয়। তিনি ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে কেন্দ্রীয় সংসদে ক্রীড়া সম্পাদক পদে নির্বাচন করছেন।
বিজয় জানান, বনকাগজের থেকে এই লিফলেট বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করতে হয়। এটি মাটিতে ফেললেই জন্মাবে গাছের চারা। বনকাগজ মূলত হাতে তৈরি রিসাইকেল করা বিশেষ ধরনের একটি কাগজ, যার ভেতর থাকে গাছের বীজ। এই লিফলেট ছিঁড়ে মাটিতে ফেললেই ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে জন্মাবে চারা, ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই পরিণত হবে গাছে। প্রত্যেকটি লিফলেটে ১৫ থেকে ২০ ধরনের বীজ রয়েছে। এর মধ্যে বেশি রয়েছে ফুল গাছ, লাল শাক ও মরিচ।
বিজয় বলেন, ‘এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ খুবই ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন শিক্ষার্থীরা। ১৬ অক্টোবরের পর নির্বাচনের এই উন্মাদনা হয়তো আর থাকবে না। কিন্তু আমি থেকে যাব কারও টেবিলের কোনায়, কারও ফুলের টবে। নির্বাচন শেষে গাছ হয়ে থেকে যাব ৭৫৩ একরে। এটা আমার কাছে একটা বড় পাওয়া।’
ললনগীতি পরিবেশন করে প্রচারে অথী
ছাত্রদল মনোনীত সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদপ্রার্থী শাহরিয়ার আলম অথী প্রচারে এনেছেন সংগীতের ছোঁয়া। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থান ঘুরে শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবেশন করছেন লালনগীতি।
অথী বলেন, ‘আমি সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদের প্রার্থী, তাই চেষ্টা করেছি একটি ভিন্ন আঙ্গিকে প্রচার চালানোর। বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতির প্রতীক লালন ফকিরকে কেন্দ্র করে আমি আমার প্রচার শুরু করেছি। শিক্ষার্থীরাও উৎসাহ দিচ্ছেন, আশ্বস্তও করছেন।’