পাহাড় ও সবুজের ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসটা যেন সকাল থেকে নানা রঙ্গে রঙিন। শিক্ষার্থীদের কলতানে ভোরের সূর্যালোকের ছায়া সবুজ ঘাসে পড়ার আগেই শিশির বিন্দু মিশে গেছে মাটিতে। শুরু হয়ে গেছে প্রার্থী ও ভোটারদের দৌড়ঝাঁপ। আজ (১৫ অক্টোবর) ঐতিহাসিক চাকসু নির্বাচন। সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়েছে ভোট গ্রহণ, চলবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত।
আজ থেকে ৩৫ বছর আগে ১৯৯০ সালে হয়েছিল সর্বশেষ এ নির্বাচন। যিনি সর্বশেষ ভিপি হয়েছিলেন তিনিও মারা গেছেন এক বছর আগে।
চাকসু নির্বাচনে মোট প্রার্থী হয়েছেন ৯০৮ জন। যার মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদে ২৬টি পদে লড়বেন ৪১৫ জন প্রার্থী।
এদের মধ্যে সহসভাপতি (ভিপি) পদে ২৪ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ২২ জন, সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ২১ জন, খেলাধুলা ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১২ জন, সহ খেলাধুলা ও ক্রীড়া সম্পাদক ১৪ জন, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ১৭ জন, সহসাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ১৫ জন, দপ্তর সম্পাদক পদে ১৭ জন, সহ-দপ্তর সম্পাদক পদে ১৪ জন, ছাত্রীকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক পদে ১৩ জন, সহ-ছাত্রীকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক পদে ১০ জন, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ১১ জন, গবেষণা ও উদ্ভাবনবিষয়ক সম্পাদক পদে ১২ জন, সমাজসেবা ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক ২০ জন, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ১৫ জন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ১৭ জন, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ১৬ জন, যোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক ১৭ জন, সহ-যোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক ১৪ জন, আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ৯ জন, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়াবিষয়ক সম্পাদক ২০ জন। এ ছাড়া নির্বাহী সদস্য পদে ৮৫ জন।
আজ সকালে ভোট কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইয়াহইয়া আখতার। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ভোটের আগে সব কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। সার্বিক পরিস্থিতি ভাল আছে। আশা করছি সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দিতে পারব।
তবে ভোট গ্রহণের শুরুতে দেখা যায়, ভোটারদের উপস্থিতি খুবই কম। শহরের ভোটাররা ট্রেনে করে ক্যাম্পাসে গেলেই উপস্থিতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং এতে বোঝা যাচ্ছে, এবারের চাকসু নির্বাচনে বিশাল প্রভাব রাখবে শহরের ভোটাররা।
সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের কেন্দ্রে বাইরে চারটি লাইন করা হয়েছে। কিন্তু লাইনে ভোটার নেই।
এক শিক্ষার্থী মুহাম্মদ হাসান জানান, ট্রেন না আসায় ভোটাররাও পৌঁছাননি ক্যাম্পাসে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারও বাড়তে পারে। তিনি ক্যাম্পাসে থাকেন বলে আগে গেছেন।
অন্যদিকে, ১৪টি হল সংসদে লড়বেন ৪৭৩ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে ছাত্রদের ৯টি হল ও ১টি হোস্টেল মিলে ৩৫০ জন এবং ছাত্রীদের ৫টি হলে ১২৩ জন। যার মধ্যে ছেলেদের হলগুলোতে রয়েছে- এএফ রহমান হলে ৩৮, আলাওল হলে ৩২, অতীশ দীপংকর হলে ৩৭, শাহ আমানত হলে ৪৩, শহীদ ফরহাদ হোসেন হলে ৪৫, মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ৩৭, শহীদ আব্দুর রব হলে ৩১, শাহজালাল হলে ৩৪, সোহরাওয়ার্দী হলে ৫৩। এ ছাড়া শিল্পী রশিদ চৌধুরী হোস্টেলে ২০ জন।
এ ছাড়া মেয়েদের হলগুলোতে রয়েছে- বিজয় ২৪ হলে ২৮, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হলে ৩০, নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে ১৭, প্রীতিলতা হলে ২৬, শামসুন্নাহার হলে ২২।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি অনুষদ ভবনের ১৫টি কেন্দ্রে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে চাকসু ভবনে ১টি অতিরিক্ত কেন্দ্র স্থাপন করেছে নির্বাচন কমিশন। এসব কেন্দ্রের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৬৫ থেকে ৭০টি কক্ষ। প্রতিটি কক্ষে থাকবে পাঁচটি ব্যালট বাক্স এবং পাঁচ জন করে এজেন্ট। একটি কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ৫০০ ভোটার ভোট দিতে পারবেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ভোটার রয়েছেন ২৭ হাজার ৫১৮ জন। এর মধ্যে ছেলে ভোটার আছেন ১৬ হাজার ১৮৯ ও নারী ভোটার রয়েছেন ১১ হাজার ৩২৯ জন।
যার মধ্যে, প্রকৌশল অনুষদে ভোট দেবেন ৪ হাজার ৩৬ জন। তারা সোহরাওয়ার্দী হলের শিক্ষার্থী। কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের নতুন ভবন শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ভবনে ভোট দেবেন ৫ হাজার ২৬৩ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে শাহজালাল হলের ২ হাজার ৬৬৬ জন, এ এফ রহমান হলের ১ হাজার ৩০৭ ও আলাওল হলের ১ হাজার ২৯০ জন ভোটার রয়েছেন।
বিজ্ঞান অনুষদ ভবনে ভোট দেবেন ৪ হাজার ৫৩৮ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে শাহ আমানত হলের ২ হাজার ২৪৭ জন, শহীদ আবদুর রব হলের ১ হাজার ৭৭৫ ও মাস্টারদা সূর্য সেন হলের ৫১৬ জন।
সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভবনে ভোট দেবেন ৬ হাজার ৬০৬ শিক্ষার্থী। যার মধ্যে নবাব ফয়জুন্নেছা হলের ১ হাজার ১৭৯ জন, শামসুন নাহার হলের ২ হাজার ২৯১, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হলের ২ হাজার ৪৮৭ ও অতীশ দীপংকর হলের ৬৪৯ জন।
ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ভবনে ভোট দেবেন মোট ৭ হাজার ৭৩ শিক্ষার্থী। যার মধ্যে প্রীতিলতা হলের ২ হাজার ৫৫৫ জন, বিজয়–২৪ হলের ২ হাজার ৬০৪, শহীদ ফরহাদ হোসেন হলের ১ হাজার ৭৬০ ও শিল্পী রশিদ চৌধুরী হোস্টেলের ১৫৪ জন।
এদিকে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।
নির্বাচন কমিশনার ড. মনির উদ্দিন জানান, ৫ জন ডিন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ১৫ জন বিভাগের চেয়ারম্যান প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া ৬০টি ভোটকক্ষের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা, কর্মচারী ও নিরাপত্তা সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি দায়িত্বপ্রাপ্তকে প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ৩০০টি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ৭০০টি গোপন ভোটকক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছি। নির্বাচনে পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বাহিনী, বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট সদস্যরাও দায়িত্বে থাকবে। এ ছাড়া স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী প্রস্তুত থাকবে, যারা প্রয়োজনে তিন মিনিটের মধ্যে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবে। ‘১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত পুরো ক্যাম্পাস সিল্ড থাকবে। আইডি কার্ড ছাড়া কেউ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবেন না।’
চাকসুর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ২৭ হাজার ৫১৬ জন। নির্বাচনে প্রার্থী রয়েছেন ৯০৮ জন। এর মধ্যে চাকসুর ২৬টি পদের বিপরীতে ৪১৫ জন, হল সংসদে ৪৭৩ জন এবং হোস্টেল সংসদে ২০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু খবরের কাগজকে বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকে দেড় হাজারের বেশি পুলিশ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের জন্য কাজ করবে। শান্তিপূর্ণ চাকসু নির্বাচন চলছে কোনো ধরনের শঙ্কা নেই।
মেহেদী/