বাংলাদেশ আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল (ছাত্র-ছাত্রী) প্রতিযোগিতা ২০২৬ এ মাঠের খেলা শেষ হওয়ার পর গভীর রাতে আয়োজক কমিটির সিদ্ধান্তে বদলে গেছে একটি ম্যাচের ফলাফল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার ম্যাচ ঘিরে সৃষ্ট সংঘর্ষ, পরবর্তী বৈঠক এবং সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এখন প্রশ্ন উঠেছে পুরো টুর্নামেন্টের স্বচ্ছতা ও পরিচালনা নিয়ে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) অনুষ্ঠিত ম্যাচে নির্ধারিত সময়ের শেষদিকে ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। খেলার মোট সময় ছিল ৭০ মিনিট এবং প্রায় ৭৪ মিনিট (অতিরিক্ত সময়সহ) পর্যন্ত খেলা গড়ায়। এ সময় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় একটি ফাউলের জন্য ফ্রি-কিক পায়। ফ্রি-কিকের আগে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও তর্কাতর্কির ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ ওঠে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড় অভিমালো (জার্সি নং-১১) শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড় সাব্বিরকে ঘুষি মারলে তার কপাল ফেটে যায়।
ঘটনার পর খেলা আর স্বাভাবিকভাবে এগোয়নি। তবে মাঠেই সঙ্গে সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দিয়ে বিষয়টি পরে প্রশাসনিক পর্যায়ে গড়ায়।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত পাঁচ দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে দুই দলের অফিসিয়ালদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। পরে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া উপদেষ্টা ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক কামাল উদ্দিন, খেলা পরিচালক, বিশ্ববিদ্যালয় শৃঙ্খলা কমিটি এবং টুর্নামেন্ট পরিচালনা কমিটির সদস্যদের নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক হয়। অবশেষে রাত বারোটার পর সিদ্ধান্ত আসে ১-০ গোলে এগিয়ে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে পরাজিত ঘোষণা করা হয়েছে এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
পরদিন সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাচ হওয়ার কথা থাকলেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে সেই ম্যাচ আর অনুষ্ঠিত হয়নি। পরিবর্তে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে মাঠে নামে এবং ১-০ গোলে পরাজিত হয়।
ঘটনার পর প্রকাশিত আয়োজক কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল প্রতিযোগিতা-২০২৬ এর বাইলজের ১০ ও ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দলকে অভিযুক্ত করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড় অভিমালোকে “অখেলোয়াড়সুলভ ও মারমুখী আচরণের” জন্য নিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় শান্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে শাহরুল ইসলাম (জার্সি নং-৫)-কে সতর্ক করার কথাও বলা হয়।
অন্যদিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই খেলোয়াড় ফারহান তামিম দিপ্ত (জার্সি নং-২২) এবং আসাদুল হাবিব (জার্সি নং-১১) কে টুর্নামেন্টের পরবর্তী সব ম্যাচ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ম্যাচে পরাজিত ঘোষণা করা হলেও তাদের কোনো খেলোয়াড়কে সরাসরি টুর্নামেন্ট থেকে নিষিদ্ধ না করায় প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
চাকসু ক্রীড়া সম্পাদক মোহাম্মদ শাওন বলেন, “টুর্নামেন্টের ১০ নম্বর নিয়মে বলা আছে, যদি এগিয়ে থাকা কোনো দল নিয়ম ভঙ্গ করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিপক্ষকে আঘাত করে, তাহলে প্রতিপক্ষ অ্যাডভান্টেজ পাবে।”
মাঠে সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত না দিয়ে পরে রাতে সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “রেফারি প্রথমে লিখিত রিপোর্ট দিয়েছে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া উপদেষ্টা ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রককে জানানো হয়। এরপর নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সবার আগে দুই দলের অফিসিয়ালদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়েছিল।”
সংঘর্ষের পর মাঠে কোনো কার্ড দেখানো হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কার্ড প্রদর্শনের জন্য শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়কে মাঠে থাকতে হতো। তারা মাঠ ছেড়ে চলে যায়। রেফারি খেলা স্থগিত করে দিয়েছিল।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জুবায়ের বলেন, “ম্যাচের শুরু থেকেই তারা সময় নষ্ট করছিল। আমরা রেফারির কাছে অভিযোগ জানালে তারা আক্রমণাত্মক হয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে একটি ফাউলের পর ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে ফ্রি-কিকের সময় ওদের একজন খেলোয়াড় আমাদের প্লেয়ারকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। তখন আমাদের খেলোয়াড় হাত সরালে সে আঘাত পায়। এটি কোন উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে আঘাত ছিল না তিনি দাবি করেন, “ঘটনার পর শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় মাঠ ছেড়ে চলে যায়। আমরা মাঠে ছিলাম। রেফারি কোনো কার্ড দেয়নি। আমরা যদি দোষী হতাম তাহলে মাঠেই লাল কার্ড দিতে পারত।”
তিনি আরও বলেন আমাদের উপরে এ সিদ্ধান্ত চাপে দেওয়া হয়েছে। আমরা এ সিদ্ধান্ত মেনে নেইনি আমরা প্রতিবাদ লিপি দিয়েছি।
অন্যদিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনায়ক শাকিল অভিযোগ করেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক খেলছিল। আমাদের গালাগালি করেছে, বাজেভাবে ট্যাকেল করেছে। ফ্রি কিকের সময় একজনকে কিল মেরে চোখের উপরের অংশ ফাটিয়ে দেয়। চারটি সেলাই লেগেছে।”
তিনি আরও বলেন, “রেফারি যদি আগে থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নিত তাহলে হয়তো এমন ঘটনা ঘটতো না। আমরা রাত দুইটার দিকে জানতে পারি যে আমাদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।”
আজকের ম্যাচে হারের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা ১০ জন নিয়ে খেলেছি। পেনাল্টির মাধ্যমে আমাদের হারানো হয়েছে।”
এ ঘটনায় উপস্থিত থাকা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক খেলোয়াড়ও প্রশ্ন তুলেছেন সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে। তিনি বলেন, “রেফারি বাঁশি দিয়ে খেলা শেষ করার পর কীভাবে ফল পরিবর্তন হয়? শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ই মাঠ ছেড়ে গিয়েছিল।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু ফাইনালে উঠেছে, তাই বড় দলগুলো যেন না উঠতে পারে সে ধরনের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।”
একই খেলোয়াড় যিনি উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও চুয়েটের ম্যাচে তিনি সে ঘটনাও তুলে ধরেন। তার দাবি, ওই ম্যাচে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলকিপার চুয়েটের এক খেলোয়াড়কে ঘুষি মারার অভিযোগে চুয়েট মাঠ ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
এ বিষয়ে চাকসু ক্রীড়া সম্পাদক মোহাম্মদ শাওন বলেন, “চুয়েটের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আমাদের গোলকিপারের সংঘর্ষ হয়েছিল। রেফারি কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। পরে চুয়েট মাঠ ছেড়ে চলে যায়। রেফারি ও লাইনম্যান কেউই ঘুষির ঘটনা দেখেনি।”
চুয়েটের অধিনায়ক সাযীম চৌধুরী তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই তাদের গোলকিপার ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে ঘুষি মারে। রেফারির পক্ষ থেকে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত আসে নি । তাই আমরা মাঠ ছেড়ে চলে আসি ।সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল, তিনজন রেফারিই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।”তিনি আরও অভিযোগ করেন, “চুয়েট টেন্টকে চাপে রাখতে অতিরিক্ত একজন ‘পঞ্চম রেফারি’ রাখা হয়েছিল, যা কোনো নিয়মের মধ্যেই পড়ে না।”
ঘটনার পর থেকে টুর্নামেন্টজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। মাঠের খেলা শেষ হওয়ার পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ফল পরিবর্তন হওয়ায় অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আল আরাফ/এসএন