জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ১২ মে রাতে এক নারী শিক্ষার্থীর ওপর ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় অভিযুক্তের গ্রেপ্তারে বিলম্ব এবং প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগে ক্যাম্পাস ফের উত্তাল হয়ে উঠেছে।
শিক্ষার্থীরা প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলমসহ পুরো প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ দাবি করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে রাতভর অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন।
শনিবার (১৬ মে) বিকেলে জাকসু ও হল সংসদের প্রতিনিধিরা ভিসির বাসভবনের সামনে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
জাকসু ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বলেছে, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তারা জানান, ঘটনার সময় জাকসুর সদস্য চিশতী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আহত শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে প্রাথমিক সহায়তা দেন। পরে জাকসু প্রতিনিধি, নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় ভুক্তভোগীকে চিকিৎসা কেন্দ্রে নেওয়া হয় এবং প্রশাসনকে অবহিত করা হয়।
জাকসু অভিযোগ করে, সিসিটিভি ফুটেজ শনাক্তকরণ ও তদন্তে জটিলতা, সমন্বয়হীনতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। যাচাইবিহীন এআই-নির্ভর ছবি প্রচারের কারণে প্রকৃত অপরাধী শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াও বিভ্রান্তির মুখে পড়েছে।
জাকসুর দাবি
সংবাদ সম্মেলনে জাকসু নিম্নলিখিত দাবিগুলো উত্থাপন করে - অভিযুক্তকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তৎপর ভূমিকা রাখা - গ্রেপ্তারে ব্যর্থ হলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা - প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগে রেজিস্ট্রার, নিরাপত্তা দপ্তর ও প্রক্টরিয়াল বডির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের চিহ্নিত করা - ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বার্থান্বেষী মহলের অপতৎপরতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ - নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হলে প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন।
জাকসু জানায়, তারা ইতোমধ্যে প্রশাসনের কাছে এসব দাবি লিখিতভাবে উপস্থাপন করেছে।
রাতভর অবস্থান ও প্রক্টরিয়াল বডিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা
এর আগে শুক্রবার (১৫ মে) দিবাগত রাত ১টা থেকে নারী শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম পার হওয়ার পর শনিবার সকালেও তাঁরা অবস্থান চালিয়ে যান।
শনিবার সকাল ৯টার দিকে প্রেস ব্রিফিংয়ে নারী শিক্ষার্থীরা প্রক্টরিয়াল বডিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন এবং প্রক্টর অফিসের তালা ভেঙে নতুন তালা লাগিয়ে দেন। অফিসের দরজা, জানালা ও দেয়ালে ‘গেট লস্ট, অবাঞ্ছিত প্রক্টর, রাশেদ তুই ভাগ’সহ বিভিন্ন স্লোগান লেখা হয়।
তারা জানান, রবিবার থেকে রেজিস্ট্রার ভবনে সব প্রশাসনিক কার্যক্রম অবরোধ করা হবে। প্রক্টরের পদত্যাগ, অপরাধী গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন।
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী তাজনিন নাহার তাম্মি বলেন, “এই প্রক্টরের সময়ে যতগুলো ঘটনা ঘটেছে, তার কোনো সুষ্ঠু সমাধান হয়নি। এই ব্যর্থ প্রক্টরকে আমরা চাই না।”
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, “প্রক্টর পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা মেয়েরা এখানে অবস্থান করব।”
ভিসিকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলায় শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
অবস্থান কর্মসূচির এক পর্যায়ে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। এক নারী শিক্ষার্থী উপাচার্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যায়িত করলে সোশ্যাল মিডিয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী হামিদুল্লাহ সালমান বলেন, “কামরুল আহসান আমাদের সহযোদ্ধা, শিক্ষক ও বড় ভাই। কিন্তু তিনি ফ্যাসিস্ট নন। আগের ভিসি নুরুল আমাদের বাসার গেটে অপেক্ষায় রেখে পুলিশকে ‘গুলি চালাও’ বলেছিলেন। সেই ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে কামরুল আহসানকে তুলনা করা যায় না।”
চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী নরুজ্জামান খান আশিক বলেন, “যারা ভিসি স্যারকে ফ্যাসিস্ট বলছে, তারাই অতীতে ফ্যাসিস্টের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। তাদের উদ্দেশ্য কী, তা তদন্ত করে শিক্ষার্থীদের সামনে প্রকাশ করা উচিত।”
উপাচার্যের বক্তব্য
উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা আছে। তবে প্রক্টরকে অব্যাহতি দিতে হলে নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। বহিরাগত অপরাধী ধরা পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত। তিনি তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ীদের চিহ্নিত করার আশ্বাস দেন এবং শিক্ষার্থীদের কিছু সময় দেওয়ার অনুরোধ করেন।
প্রসঙ্গত, ১২ মে রাতে পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অজ্ঞাত আসামিতে মামলা করেছে। শিক্ষার্থীরা এখনও অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
আরও পড়ুন
>> জাবিতে উপাচার্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলায় তীব্র প্রতিবাদ ও মানববন্ধন
>> জাবিতে শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টায় ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
>> জাবিতে প্রক্টরিয়াল বডিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, তালা দিলেন শিক্ষার্থীরা
আমানউল্লাহ খান/আমান