বর্তমান সমাজে ‘নারীবাদ’ শব্দটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের মনে এক ধরনের ভুল ধারণা তৈরি হয়। যেন নারীবাদ মানেই পুরুষদের বিরোধিতা, তাদের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া কিংবা পুরুষদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার আন্দোলন। কিন্তু বাস্তবে নারীবাদ বা ফেমিনিজমের মূল দর্শন তার একেবারেই উল্টো। এটি কোনো যুদ্ধ নয়, বরং মানবতার পক্ষে একটি সামাজিক ভাবনা, যেখানে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
নারীবাদের ইতিহাস যত পুরোনো, ততই বিকশিত হয়েছে এর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ। একসময় নারীরা ভোটাধিকার বা শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। সে সময় নারীবাদ মূলত ছিল সেই বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নাম। কিন্তু সময় বদলেছে। সমাজ, রাষ্ট্র ও চিন্তার কাঠামো বদলে যাওয়ায় নারীবাদের ব্যাখ্যাও বিস্তৃত হয়েছে। এখন এটি কেবল নারীর অধিকারের প্রশ্ন নয়, বরং সমতার বৃহত্তর ধারণা- যেখানে লিঙ্গ, জাতি, শ্রেণি বা যৌনতানির্বিশেষে সবার প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ফেমিনিজম বা নারীবাদের ধারণা কোনোভাবেই পুরুষের বিপক্ষে অবস্থান নেয় না। বরং এটি এমন এক চিন্তাধারা, যা পুরুষকেও এক ধরনের সামাজিক চাপ থেকে মুক্তি দিতে চায়। সমাজে পুরুষদের ওপরও অনেক অঘোষিত প্রত্যাশা থাকে। যেমন, সব সময় শক্ত হতে হবে, কাঁদা যাবে না, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হতে হবে ইত্যাদি। নারীবাদ এই রকম অনুচ্চারিত বাঁধনগুলো নিয়েও প্রশ্ন তোলে। অর্থাৎ নারীবাদ কেবল নারীর স্বাধীনতার কথা বলে না, বরং পুরুষের মানবিকতা ও আবেগ প্রকাশের স্বাধীনতাকেও স্বীকৃতি দেয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, অনেক সময় নারীবাদকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু অতিরঞ্জিত বক্তব্য বা ভুল ব্যাখ্যার কারণে অনেকেই মনে করেন, নারীবাদ মানেই পুরুষ-বিরোধিতা। অথচ বাংলাদেশেরই হাজারো নারী কর্মী, শিক্ষক, গবেষক বা শ্রমজীবী নারী প্রতিদিন নিজেদের অবস্থান থেকে নারীবাদী চেতনা বহন করছেন- তারা পুরুষের বিপক্ষে নয়, বরং একটি ন্যায্য সমাজের পক্ষে কাজ করছেন।
সমতা মানে সমান পোশাক বা সমান আচরণ নয়; বরং সমান সুযোগ, সমান সম্মান ও সমান অধিকার। যেমন, একটি মেয়েকে যদি তার যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, সেটিই সমতা। কিন্তু একইভাবে একজন পুরুষকেও যদি সন্তান লালনপালনে দায়িত্ব নিতে উৎসাহ দেওয়া হয়, তাও সমতারই প্রকাশ। এ ভারসাম্যই নারীবাদের আসল লক্ষ্য। কারও প্রতি অন্যায় না করা, বরং সবার প্রতি ন্যায্যতা নিশ্চিত করা।
বিশ্বব্যাপী আধুনিক নারীবাদ এখন ‘ইকুইটি’ বা ‘ন্যায্য সমতা’র ধারণা নিয়ে কথা বলে। অর্থাৎ সবাইকে এক জায়গায় দাঁড় করানো নয়, বরং যাকে যে সুযোগ প্রয়োজন, সেটি নিশ্চিত করা। একজন নারী যদি সন্তান জন্মদানের কারণে কিছু সময় কাজ থেকে বিরতি নেন, তবে তার কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসার সুযোগ ও সহায়তা দেওয়াই নারীবাদের প্রয়োগ। একইভাবে, একজন পুরুষ যদি শিশুর যত্ন নিতে ছুটি নিতে চান, তবে তাকেও সেই সুযোগ দেওয়া উচিত।
এমনকি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা যায়, ইসলামসহ বহু ধর্মেই নারী-পুরুষের মর্যাদা সমান বলে উল্লেখ আছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে নানা রকম কুসংস্কার, প্রথা ও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা নারীর অবস্থানকে দুর্বল করেছে। আধুনিক নারীবাদ সেই প্রথাগত চিন্তাধারাকে প্রশ্ন করে। যাতে পরিবার ও সমাজে নারী-পুরুষ উভয়ে একে অপরের সহযোগী হয়ে ওঠেন, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
অনেকে বলেন, নারীবাদ নাকি পরিবার ভেঙে দেয়, সম্পর্ক নষ্ট করে। বাস্তবে ঠিক উল্টোটা ঘটে। যখন পরিবারে নারীর মতামত, স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকে, তখন সম্পর্ক আরও সুস্থ হয়। কারণ, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে ভালোবাসাও দৃঢ় হয়। তাই নারীবাদ পরিবারের বন্ধন দুর্বল করে না; বরং সেটিকে আরও মানবিক ও সম্মাননির্ভর করে তোলে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু এখনো অনেক জায়গায় নারীরা হয়রানি, বৈষম্য বা নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন। এসব সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করাই নারীবাদের বাস্তব প্রয়োগ। এখানে কোনো পুরুষ-বিরোধিতা নেই; বরং নারী ও পুরুষ উভয়কেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে যেন সমাজে ন্যায় ও সম্মানের পরিবেশ তৈরি হয়।
নারীবাদ আসলে একটি সমাজের আয়না। যেখানে সমাজের অন্যায়, বৈষম্য ও বৈপরীত্য প্রতিফলিত হয়। সেই আয়না দেখে যদি কেউ অস্বস্তি বোধ করে, সেটি নারীবাদের দোষ নয়, বরং সমাজের সমস্যার প্রতিফলন। তাই নারীবাদকে ভয় নয়, বোঝার প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, আধুনিক নারীবাদ কোনো ব্যক্তিকে শত্রু বানানোর আন্দোলন নয়, বরং সবার জন্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দার্শনিক চিন্তা। এটি এমন এক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখে, যেখানে মেয়েকে নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার থাকবে, ছেলেও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারবে যেখানে মানবিকতা লিঙ্গের ঊর্ধ্বে।
/এসএল