চলচ্চিত্রের ঝলমলে আলোর জগৎ থেকে একেবারে ভিন্ন এক বাস্তবতায় পা রাখা–এই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না জুয়েনা ফেরদৌসের জন্য। কিন্তু জীবনের বাঁকে দাঁড়িয়ে নেওয়া সেই কঠিন সিদ্ধান্তই আজ তাকে এনে দিয়েছে সাফল্যের স্বীকৃতি। হয়েছেন বর্ষসেরা মাইক্রো নারী উদ্যোক্তা। তার গল্প শুধু পেশা পরিবর্তনের নয়, এটি এক নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর, নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের এবং অন্য নারীদের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার গল্প।
একসময় ঢাকায় চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জুয়েনা। কাজ করেছেন প্রখ্যাত নির্মাতা তারেক মাসুদের সঙ্গে। সৃজনশীল এই জগতেই নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই ব্যক্তিগত এক কারণে তাকে ফিরে যেতে হয় নিজের শহর রংপুরে। সেই ফেরা যেন ছিল এক অনিশ্চিত যাত্রার শুরু।
‘ঢাকায় আমি যে কাজগুলো করতাম, রংপুরে এসে সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে কোনো কাজ পাচ্ছিলাম না,”—বলছিলেন জুয়েনা। চাকরির বাজারে হতাশা তাকে ভাবতে বাধ্য করে—নিজের কর্মসংস্থান নিজেকেই তৈরি করতে হবে। সেখান থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার বীজ বপন।
শুরুর দিনগুলো ছিল দিশেহারা। কখনো শতরঞ্জি বোনা শেখার চেষ্টা, কখনো গ্রাফিক্স ডিজাইনের কোর্স—সবই ছিল নিজের জন্য একটি জায়গা খুঁজে পাওয়ার প্রয়াস। কিন্তু কোনো কিছুই স্থায়ীভাবে এগোয়নি। এরই মধ্যে করোনার ধাক্কায় বন্ধ হয়ে যায় তার গ্রাফিক্স সংশ্লিষ্ট কাজটিও।
এই অনিশ্চয়তার মাঝেই আসে এক নতুন ধারণা। বিদেশে থাকা এক বন্ধুর কাছ থেকে পরামর্শ পান—পরিবেশবান্ধব ব্যাগ তৈরি করলে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। শুরুতে বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি নিশ্চিত ছিলেন না তিনি। তবে কৌতূহলবশত বাজার খুঁজতে গিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয় আগ্রহ।
‘বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে দেখলাম তারা কীভাবে ব্যাগ তৈরি করে। তখন মনে হলো—এই কাজটা আমার সঙ্গে যায়’—বলছিলেন তিনি।
এরপরই শুরু। মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে একটি সেলাই মেশিন কেনা, সঙ্গে একজন কর্মী—নিজের ঘরেই গড়ে ওঠে ছোট্ট একটি কর্মশালা। কিন্তু উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা কখনোই মসৃণ হয় না, জুয়েনার ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম ছিল না।

প্রথম এক বছর তার তৈরি পণ্য বিক্রি হয়নি বললেই চলে। কোথাও সাড়া পাননি। এর মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, বাজার বোঝার চেষ্টা করেছেন। যখন মনে হচ্ছিল ধীরে ধীরে এগোচ্ছেন, ঠিক তখনই আসে বড় ধাক্কা—৫০০ ব্যাগের একটি অর্ডার তৈরি করার পর ক্রেতা সেটি বাতিল করে দেন।
“ওটা আমার জন্য খুব কঠিন সময় ছিল। অনেক লোকসান হয়েছে। কিন্তু তখনই সিদ্ধান্ত নিই—এখানেই থেমে গেলে চলবে না,”—বললেন তিনি।
ব্যর্থতাকে সঙ্গী করেই আবার শুরু। এবার কৌশল বদলালেন। বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া শুরু করলেন। নানা সংগঠন ও উদ্যোক্তা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হলেন। এতে করে বাড়তে থাকে পরিচিতি, তৈরি হয় নতুন যোগাযোগ।
পাশাপাশি নিজের পণ্যের মান নিয়েও আপস করেননি তিনি। নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়ে উন্নত করেছেন ডিজাইন ও মান। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল আসে ২০২১ সালে। জার্মান কালচারাল সেন্টারের ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি বড় অর্ডার পান তিনি।
‘আমি খুব মন দিয়ে কাজটা করেছিলাম। ওটাই ছিল আমার টার্নিং পয়েন্ট’—বললেন জুয়েনা।
সেই অর্ডার শুধু ব্যবসায়িক সফলতাই এনে দেয়নি, খুলে দেয় নতুন দরজাও। কাজের মান দেখে জার্মান দূতাবাস থেকেও যোগাযোগ করা হয় তার সঙ্গে। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে অর্ডার, তৈরি হয় বাজারে তার পরিচিতি।
বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান ‘আহ্লাদ ফ্যাশনস’ শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি হয়ে উঠেছে অনেক নারীর জীবিকার উৎস। চারটি গ্রামের প্রায় ৮০ জন নারী তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পাটের হস্তশিল্প তৈরি করছেন। এছাড়া তার নিজস্ব কারখানায় কাজ করছেন আরও ১২ জন।
‘আমি চাই নারীরা নিজের পায়ে দাঁড়াক। তারা যেন নিজের আয় দিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে’—বলছিলেন তিনি।
তার তৈরি ব্যাগগুলো শুধু নান্দনিক নয়, পরিবেশবান্ধবও। পাট ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি এসব পণ্য এখন বাজারে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও তৈরি হয়েছে চাহিদা।
এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে জুয়েনা ফেরদৌস পেয়েছেন ‘জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার-২০২৫’। বর্ষসেরা মাইক্রো নারী উদ্যোক্তা হিসেবে এই অর্জন তার দীর্ঘ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বর্তমানে জুয়েনা ফেরদৌসের ব্যবসা সম্ভাবনাময় অবস্থানে থাকলেও পুঁজির সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি। চাহিদা বাড়লেও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাবে তিনি এখনো ব্যবসাকে কাঙ্ক্ষিত পরিসরে সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। তবে এই সীমাবদ্ধতাকে বাধা নয়, বরং ধাপে ধাপে এগোনোর একটি বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন তিনি।
নারীদের জন্য তার বার্তা স্পষ্ট—আত্মবিশ্বাস হারানো যাবে না। তিনি মনে করেন, অনেক সময় সামাজিক ও পারিবারিক বাধা নারীদের পিছিয়ে দেয়, কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস থাকলে সেই বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। ছোট উদ্যোগ দিয়েই শুরু করা যায়, গুরুত্বপূর্ণ হলো ধৈর্য, শেখার আগ্রহ এবং লেগে থাকার মানসিকতা। তার মতে, আত্মবিশ্বাসই একজন নারীকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় শক্তি দেয়।
জুয়েনার গল্প আমাদের এটাই শেখায় যে, জীবনের যেকোনো পর্যায়ে নতুন করে শুরু করা সম্ভব। ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু সেটাই শেষ নয়। সঠিক দিকনির্দেশনা, অধ্যবসায় এবং নিজের ওপর বিশ্বাস থাকলে পথ তৈরি হয় নিজে থেকেই।
চলচ্চিত্রের ক্যামেরার পেছন থেকে উঠে এসে আজ তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন এক অনুপ্রেরণার গল্প—যেখানে সংগ্রাম আছে, আছে সাহস, আর আছে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়।
/এসএল
.jpg)