মৌলভীবাজারে কারফিউ শিথিলের সময় বাড়ানো হলেও জনজীবন এখনো স্বাভাবিক হয়নি। প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে খুব একটা বের হচ্ছেন না। সবার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দোকানপাট খোলা হলেও ক্রেতার উপস্থিতি কম। এ ছাড়া গত ১৫ জুলাইয়ের পর থেকে জেলায় কোনো পর্যটক যাননি। এর প্রভাব পড়েছে পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টসহ স্থানীয় সব ব্যবসায়।
বেকার হয়ে শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দোকান খোলা হলেও ক্রেতা না থাকায় ব্যবসায়ীরা অলস সময় পার করছেন। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকঋণে জর্জরিত। আবার অনেকে কর্মচারীর বেতন ও দোকানভাড়া কীভাবে মেটাবেন, তা নিয়ে রয়েছেন দুশ্চিন্তায়।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে গত শুক্র ও শনিবার ১২ ঘণ্টা কারফিউ শিথিল করা হয়। রবিবার ও সোমবার তা বাড়িয়ে ১৫ ঘণ্টা করা হয়। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বাকি সময়ে কারফিউ চলমান থাকবে।
গতকাল সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, কাঁচা বাজার, মাছ, মাংস, ফল ও মুদি দোকানে ভিড় থাকলেও বিভিন্ন বিপণিবিতান ও মার্কেটগুলোর কাপড়, জুতা ও কসমেটিকসের দোকানগুলো ক্রেতাশূন্য। দোকানমালিক ও কর্মচারীরা গল্পগুজব করে অলস সময় কাটাচ্ছেন।
এদিকে পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের জায়গা ‘চায়ের রাজ্য’ মৌলভীবাজার। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে ভরা মৌসুমেও এখানে পর্যটকের দেখা নেই। ফলে ধস নেমেছে পর্যটন খাতে।
বাতিল হয়ে গেছে অনেক হোটেলের আগাম বুকিং। পর্যটন ব্যবসার স্থবিরতায় হোটেল ও পরিবহন শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন। চলতি জুলাইয়ের মধ্যবর্তী সময়েও শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জে পর্যটকদের কোলাহল ছিল, এখন সেখানে সুনসান নীরবতা।
শ্রীমঙ্গলের চাঁন্দের গাড়ির মালিক সবুজ মিয়া বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে উপজেলা থেকে প্রতিদিন ২০-৩০টি চাঁন্দের গাড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকায় পর্যটক নিয়ে বের হয়। কিন্তু এ সপ্তাহে একটি গাড়িও যায়নি। গাড়ির শ্রমিকরা বেকার হয়ে গেছেন। স্বাভাবিক অবস্থা না ফিরলে শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা থমকে যাবে।’
দিনমজুর মইন আলী বলেন, ‘কয়েক দিন ঘর থেকে বের হইনি, কাজও পাইনি। দুদিন ধরে কাজে যাচ্ছি, এভাবে চললে খাব কি?’ সবজি বিক্রেতা রুবেল মিয়া বলেন, ‘এখন সবজির আমদানি (সরবরাহ) কম, ক্রেতাও নেই। তাই আয়-রোজগার কমে গেছে।’ পৌর শহরের সেন্ট্রাল রোডের কাপড় ব্যবসায়ী সঞ্জিত দাস বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে যে সহিংসতা ও জ্বালাও-পোড়াও হয়েছে, তাতে মানুষ এখনো আতঙ্কে রয়েছেন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ যাচ্ছে।’
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, জুলাই মাসের শুরু থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত সব হোটেল রিসোর্টে পর্যাপ্ত পর্যটক ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে দেশে ছাত্র আন্দোলনে নিমিষেই সব শেষ হয়ে যায়। এ কারণে অনেক পর্যটক বুকিং বাতিল করে দিয়েছেন। এতে করে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
জেলা বিজনেস ফোরামের সদস্য সচিব শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে কয়েক দিন দোকানপাট বন্ধ ছিল। এখন পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এলেও মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাই ক্রেতা মিলছে না। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বেশি চাপে আছেন। অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকঋণে জর্জরিত। আবার অনেকেই কর্মচারীদের বেতন ও দোকানভাড়া কীভাবে মেটাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।’
জেলা প্রশাসক ড. ঊর্মি বিনতে সালাম জানান, মৌলভীবাজার জেলায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। জেলার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় ভোর ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ চলমান থাকবে। কারফিউ শিথিলের নির্ধারিত সময়ে ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে পারবেন বলে জানান তিনি।
আমাদের শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি জানিয়েছেন, কারফিউয়ের কারণে পর্যটক না আসায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ট্যুর গাইডরা বিপাকে পড়েছেন। সাজু মারছিয়াং নামে এক গাইড বলেন, ‘আমরা পর্যটকদের বিভিন্ন স্পট ঘুরিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। পর্যটক না আসায় এখন আমরা বেকার হয়ে গেছি।’
শ্রীমঙ্গলের পাঁচতারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট ও গলফের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান বলেন, ১৯ জুলাই কারফিউ জারির পর থেকে আর কোনো পর্যটক এখানে আসতে পারেননি। বিদেশি পর্যটকরাও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। এই কয়েক দিনেই আমাদের কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।